সেদিন বাজাতে কী হয়েছিল তোর? ফাঁক খুঁজে নিতে হয়। সুযোগ কি আর আপনার থেকে আসে রে? সেটা সৃষ্টি করবার।
সেদিন আর শিঙ্গা ফুঁকবার সময় পেলাম কোথায় বাবা। তার আগেই না সমস্ত কিছু গড়বড় হয়ে প্ল্যান ভেস্তে গেল আমাদের?
.
২৫.
স্কাউটের পোশাকে কী সুন্দর দেখাচ্ছিল যে সতীশকে। সুগঠিত সুঠাম শরীরে মিলিটারি ড্রেসে সে যেন এক লহমায় যৌবনে গিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিল। তাদের সবাইকেই চমৎকার মানিয়েছিল, কী বলব!
তোকে সেই মেজর জেনারেলের মতই মনে হচ্ছে মাইরি! বললাম আমি সতীশকে। গদগদ গলায়।
সতীশ গর্বিত হাসি হাসল একটুখানি।
কী করব ভাই! নিলই না যে আমায়। আমার মতন কাউকেই নিল না তো। জেনাব্যালি মাইনরদের নেয় না যে। মেজর জেনারেল হতে পারলাম না তাই।
সতীশ আর আমায়–দুজনকেই বুঝি আমি সান্ত্বনা দিতে চাই।
শরীরটা তৈরি করে নে এর ভেতরে, তাহলেই হবি। যুদ্ধ কিছু এর মধ্যেই ফুরোচ্ছে না। যুদ্ধ আছে আরো। চিরকাল ধরে যুদ্ধ। ঢের চানস আসবে।
তোদের লীডার ভারী রাগ করছে, নয় রে? কী করতে কী হয়ে গেল যে। সত্যি। কিন্তু ভাই, আমার কোনো দোষ নেই, আমি তো মারবার জন্যে তৈরি হয়েছিলাম, এমন কি মারা যাবার জন্যেও, কিন্তু কপাল মন্দ, করব কী! রাগ করছে খুব আমাদের ওপর, তাই না?
না না, রাগ করবে কেন? খুশিই হয়েছে বরং। আমি যুদ্ধে যাবার এই সুযোগটা পেলাম। বলেই। এতে আমাদের কাজের সুবিধেই হবে আরো। সেখানে গিয়ে সৈন্য বাহিনীর মধ্যে আমি রিক্রুট করতে পারব–এনতার আসবে আমাদের এই বিপ্লবী দলে। আমাদের কাজের আরো সুসার হবে তাতে। সেই ভারই দিয়েছেন তিনি আমাদের ওপর।
ভালোই হয়ে গেছে তাহলে, কী বলিস? এই জন্যেই বুঝি বলে থাকে–ভগবান যা করেন সব ভালোর জন্যেই-না রে?
হ্যাঁ রে। এখন যদি সত্যিই আমি মেজর জেনারেল হয়ে ফিরতে পারি তবেই না! ফিরে এসে ফোট জ্বলিয়মের ভেতরে থাকব তখন, আমার দলবল নিয়ে। ভেতর থেকে, ভেতরে থেকে একদিন দখল করে নেব ফোর্ট। তারপর কেল্লার যত ফৌজ স্বদলে পেলে, আর কামান বন্দুক তামাম হাতে এলে ইংরেজ তাড়াতে কতক্ষণ লাগে রে!
পারবি পারবি। নিশ্চয় পারবি। সেইজন্যেই তোর জন্ম হয়েছে, বুঝতে পারছি আমি। নইলে এমন যোগাযোগ হয় কখনো? বল তুই?
গলার মালা দুলিয়ে ব্যান্ড বাজিয়ে মার্চ করে চলে গেল সব্বাই। আমি ফিরে এসে মার কাছটিতে বসলাম আবার।
আচ্ছা মা, যুদ্ধবৃত্তিটা কি খুব খারাপ?
না, খারাপ কিসের! যার ওদিকে ঝোঁক আছে তার পক্ষে ভালোই তো। ন্যায়যুদ্ধ তো ভালোই রে! কেন, তোর বুঝি ভারী খারাপ লাগছে যুদ্ধে যেতে পারলিনে বলে?
না, না। তা নয়। যুদ্ধ-টুদ্ধ আমার মোটেই ভালো লাগে না। মানুষরা কি মারবার? মানুষ তো ভালোবাসার জিনিস মা!
তাই নাকি রে! তুই বুঝি মানুষকে খুব ভালোবাসিস?
ঠিক তা নয়। সব মানুষকে না, তবে তার ভেতরে বেছে বেছে দুচারজনকে তো ভালোই লাগে বেশ। ভালোবাসতে ইচ্ছে করে না তাদের?
মহাপুরুষদের বুঝি? যেমন অশ্বিনী দত্ত, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, জগদীশ চন্দ্র বোস, এঁদের মত? নাকি ওই রবিঠাকুর, পরমহংসদেব…।
না না, ওদের কাউকেই। অত বড়োকে কি ভালোবাসা যায় কখনো? এই ছোট ছোট মানুষদের-মাথায় যারা আমার বড় নয়, আমার মতই…আমার মনের মতন যারা।… আচ্ছা মা, ভালোবাসাবাসিটা কি কারো বৃত্তি হতে পারে না?
বৃত্তিই তো। মানুষের স্বাভাবিক বৃত্তি। নিশ্বাস-প্রশ্বাসের মতই রে। তবে বৃত্তি বলতে যা বোঝায় তা নয় ঠিক। ওটা তো হৃদয়গত ব্যাপার। বৃত্তি হচ্ছে কর্মগত। তুই যা কাজ কবি-যে কাজটা বেছে নিবি তোর জীবনে, সেইটাই হবে গিয়ে তোর বৃত্তি। বুঝেছিস এবার?
তা তো বুঝেছি। কিন্তু কোন্ কাজটা যে আমি বেছে নেব তাই তো আমি ভেবে পাচ্ছি। কী যে আমার বাঞ্ছনীয়।
যেদিকে তোর মন যায়, যে কাজটা তোর মনের মতন কাজ। সেই কাজই হচ্ছে তোর আসল কাজ। তাই কবি তুই। তাই হবে গিয়ে তোর আসল বৃত্তি।
সেটা আমি টের পাব কি করে মা? সেই কাজটা?
মা-ই বুঝিয়ে দেবে, জানিয়ে দেবে–সে কাজে তোর মন সাড়া দেবে, মার সাড়াও পাবি। নিয়তিই পাইয়ে দেবে তোকে। যথাসময়ে পেয়ে যাবি-ভাবিসনে। মার কাছে চাইলেই পাবি, বলেছি তো তোকে, মাকে ধরতে পারছিসনে? মাকে পেলেই সব পাওয়া যায়। মিলে যায় সব কিছুই।
মাকে আমায় পেতে হবে না মা। কষ্ট করে পাকড়াতে হবে না তাকে, তুমিই বলেছ তো। মা-ই তো ধরে রয়েছে আমাদের সবাইকে? তাই না? মূলধন তো আমার হাতের মুঠোয়, কিংবা সেই কেন্দ্রমূলের মুঠোর মধ্যেই আমরা। সেজন্যে আমি ভাবিনে। আমি মাথা ঘামাচ্ছি আমার বৃত্তিটা কী হতে পারে তাই নিয়ে। আমার বৃত্তিটা কী হবে, বলো না তুমি আমায়!
প্রবৃত্ত হলেই দেখতে পাবি। বুঝতে পারবি তখন।
কিসে প্রবৃত্ত হবে তাই যে আমি জানিনে ছাই।
কাজেই প্রবৃত্ত হবি, আবার কীসে? মা বলেন, যে কোনো কাজে। মনের মত কাজ হলে তো কথাই নেই, যদি কাজের মত মন হয় তাহলেও হবে। মা তো সব কিছুর কেন্দ্রেই রয়েছেন, মনের মূলেও সেই তিনিই–তুই মন দিয়ে তোর কাজ করলেই তাঁর সঙ্গে তোর যোগাযোগ হয়ে যাবে, সহজেই হবে স্বভাবতই-সেটা তোর জাতেই হোক, অজান্তেই হোক। তখন দেখতে পাবি তোর ভেতর থেকে আরেকজন কে যেন তোর কাজে এসে হাত লাগিয়েছে, সব কাজ করে দিচ্ছে তোর, কাজটা হয়ে যাচ্ছে অবলীলায়, তখনই তুই বুঝবি। এ আর কারো কর্ম নয়, মারই কাজ।
