তাকে কেন্দ্র করেই বৃত্তাকারে ঘুরছি আমরা, ঘুরব আমরা-এই আবৃত্তিই হচ্ছে শাস্ত্রটাস্ত্র পড়ার চেয়ে বেশি–মা পাড়েন : এই আবৃত্তিই তোর সর্বশাস্ত্রানা বোধদপি গরিয়সী বুঝেছিস এইবার?
হ্যাঁ মা। মার বোঝানো কেমন অবলীলায় মনের মধ্যে মিলিয়ে যায়। পান্ডিত্যের বোঝার মতন মাথার ওপর বোঝাই হয়ে চেপে বসে। ভারালো হয়ে ভারিক্কী করে তোলে না।
আর আমাদের ঠাকুর হচ্ছেন তার প্রমাণ। মা কালীর নিরক্ষর পুরুৎ ছিলেন তো তিনি। পূজা আরতি করতেন মার। আর আরতি মানেও আবৃত্তি। তাঁর সঙ্গে যুক্ত থাকা, শুধু তাকেই প্রদক্ষিণ করা ঘুরে ঘুরে। সমস্ত শাস্ত্রের পার পেয়েছিলেন তিনি ঐ করেই। মার কাছেই–নিজের মনের মধ্যে। পরে অবশ্যি তিনি পন্ডিতদের সঙ্গে শাস্ত্রালোচনায় জেনেছিলেন, মা তাকে যা যা জানিয়েছেন শাস্ত্রবাণীর সঙ্গে তা সব মিলে যায় ঠিক ঠিক। তাই না?
হ্যাঁ মা।
মা-ই নিজে জানিয়ে দেন, তা নইলে কি আমরা জানতে পারি? তিনিই প্রথমে চিনিয়ে দেন নিজেকে-তারপরে সারা জীবন ধরে চিনতে হয়, জানতে হয় আবার আমাদের বাজিয়ে নিতে হয় বার বার যা নাকি তিনি জানিয়েছেন। পদে পদে হাতে হাতে পাই যখন-তখন তখনই টের পাই, ফের বুঝতে পারি আমরা। এমন কি দেবতাদেরও তাঁকে জানাতে হয়েছিল এই করে–চেনাতে হয়েছিল নিজের থেকে। কথাটা বেদে আছে।
বেদে আছে? দেবতাদেরও চেনাতে হয়েছিল?
দেবতারাও কি তাঁর দেখা পায়? চিনতে পারে তাকে? তিনি নিজে না দেখালে না চিনিয়ে দিলে? এইজন্যেই দেবতাদের কাছে তাঁকে দেখা দিতে হয়েছিল। দেবতাদের সামনে দিব্য জ্যোতিরূপে একদিন আকাশে তিনি আবির্ভূত হলেন। দেবতারা তখন নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে লাগল, ঐ জ্যোতিস্বরূপা কে উনি? উমা হৈমবতী আকাশবাণীতে তিনি বলে দিলেন তখন তাদের। আর তাদের পথের সামনে যে তৃণখন্ড পড়েছিল, বললেন, ওটাকে দুখানা করে দেখি। ইন্দ্র চন্দ্র বায়ু বরুণ সবাই মিলে হমুদ্দ চেষ্টা করেও সেই একটা কুটোকে দুটো করতে পারলেন না। এমন কি, নাড়াতে পারলেন না একটুও। অমন প্রবলপ্ৰতাপ যে বায়ু–যার দাপটে কিনা বিশ্বব্রহ্মান্ড কাঁপে-সেও সেটাকে একটুখানিও সরাতে পারল না। মা তখন জানালেন, আমিই সেই শক্তি, যার জোরে তোমরা নড়াচড়া করো, নাড়াচাড়া করছ, নড়ছ চড়ছ।… চন্ডীতেও ঐ কথা আছে, প্রথমে উনি ওদের দেখা দিলেন, দিয়ে বললেন, ডাকো আমায়। আমার কাছে চাও। আমিই দেবো তোমাদের, আমিই দিতে পারি। বাঁচাতে পারি তোমাদের। যখন যখনই আমায় ডাকবে আমি দেখা দেবো, আপদে বিপদে সব সময় রক্ষা করব তোমাদের। করেছিলেনও রক্ষা-চন্ডীতে আছে পড়ে দেখিস। আমার শিয়রের কাছেই তো থাকে বইটা, মাথার বালিসের পাশেই। দেখিসনি? সংস্কৃতে লেখা, কিন্তু মানে করে দেওয়া রয়েছে বাংলায়। পড়লেই বুঝবি। পড়বি, বুঝলি।
বাবার গীতার মতন দেখতে, ওই চটি বইটা তো? দেখেছি। পড়বো মা।
দেবতা কি ছাড়, স্বয়ং শিবের কাছেও নিজের স্বরূপ প্রকাশ করতে হয়েছিল তাঁর। তবেই শিব চিনতে পারলেন তাকে ঠিক ঠিক। দশ মহাবিদ্যারূপে দেখা দিয়েছিলেন না তিনি একবার?
হ্যাঁ, পড়েছি অন্নদামঙ্গলে।
কী পড়েছিস? শিব নিঃস্ব হয়ে ভিখারীর ন্যায় অন্নভিক্ষায় বিশ্বময় ঘুরেছিলেন, কোথাও খুদকুঁড়োটাও জোটেনি, এমন কি মা লক্ষীর কাছেও না–শেষটায় অন্নপূর্ণার কাছে গিয়েই তিনি তাঁকেও চিনলেন, আর অন্নও পেলেন নিজের। পরমান্ন, যা নাকি অমৃতই।
হ্যাঁ মা।
মা তাঁকে নিজেকেও চেনালেন, পরমান্ন কী, কোথায় মেলে তাও বুঝিয়ে দিলেন তিনিই। মা বলেন-প্রথমে মা-ই মিলিয়ে দেন, তারপর সেই সত্য টের পাবার পরে তাঁর কাছ থেকে চেয়ে নিতে হয়-চেয়ে চেয়ে নিতে হয় বারবার–বরাবর-জীবনভোর।
মিলিয়ে দেখি মনের মধ্যে, হ্যাঁ, মার কথাটা ঠিকই। অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায়। পরমান্ন যে কী, আমার অন্নপূর্ণাও নিজের থেকে চিনিয়ে দিয়েছিল আমায়। তার সম্মুখেই পেলাম প্রথম। তারপর আমাকে চেয়ে চেয়ে নিতে হয়েছে। খেয়ে খেয়ে পেতে হয়েছে। পেয়ে পেয়ে খেতে হয়েছে। বারবার। সত্যি! সত্যিই সত্যি!
সত্য কথাটার তত্ত্বালোচনায় মজে মনে মনে মশগুল হচ্ছি, মাঝখান থেকে সত্য এসে অন্য কথা পাড়ে। কালকের মতই জানান দিয়ে তার হানাদারি।
কী রে দাদা! যাবিনে তুই?
কোথায় যাব রে?
বাঃ, সতীশদারা আজ চলে যাচ্ছে না? ইস্কুল থেকে সভা করে বিদায় অভিনন্দন দেওয়া হচ্ছে সবাইকে। সব ছেলে যাচ্ছে, তুই যাবিনে?
যাব না কী রে! বুঝি বা জন্মের মতন চলে যাচ্ছে তারা। আবার ফিরে আসবে কিনা কে জানে! দাঁড়া।… শার্টটা আমার গায়ে চড়াই।
যাবার মুখে সাড়া পাওয়া যায় বাবার। সেদিনকার সভায় তো পড়িসনি। বলে দিলাম তোকে অতো করে আমি। আজকের সভাটায় মনে করে পড়িস যেন। হেমচন্দ্রের সেই অমর কাব্য এরকম ক্ষেত্রেই পড়বার বস্তু-বুঝলি? আবৃত্তি করিস আজ, কেমন? করবি তো? বলে বাবা নিজেই আওড়াতে শুরু করেন–
বাজ ওরে শিঙ্গা বাজ ঘোর রবে
সবাই স্বাধীন এ বিপুল ভবে
সবাই জাগ্রত মানের গৌরবে
ভারত শুধুই ঘুমায়ে রয়;
চীন ব্রহ্মদেশ অসভ্য জাপান।
তারাও স্বাধীন তারাও প্রধান…
দাসত্ব করিতে করে হেয় জ্ঞান, ভারত শুধুই…
জানি বাবা। তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। ফাঁক পেলেই শিঙ্গাটা আমি বাজিয়ে দেবো আজকে। আমি ভরসা দিই।
