সেও একরকমের দেখা রে! ব্রহ্মকে অখণ্ডরূপে দেখা, আবার খণ্ডরূপে দেখা-দুটো দেখাই সমান দেখাই সমান সত্যি।
খণ্ডরূপে দেখাটাই ভালো আমার কাছে। অখণ্ডরূপে দেখতে গেলে তো অদেখা হয়ে যায়, মনে হয় কিছুই দেখা হল না। সন্দেশকে খণ্ড খণ্ড করে ভেঙে ভেঙে খেলে তবেই না তার স্বাদ মেলে?
এখন যে কথা হচ্ছিল আমাদের, মা তাঁর আদিস্বরে ফিরে যান-অম-এর সঙ্গে ঋত, মানে, জড়িত কী? তার ব্যাস এবং বৃত্ত।সেই বিন্দু-ব্যাস-বৃত্ত-অখণ্ড মণ্ডলাকার-চরাচর ব্যাপ্ত হয়ে রয়েছেন।
তোমার বিন্দুবাসিনী গিয়ে বিন্দুবাসিনী হয়েছেন শেষটায়! মার কথার ওপর আমার ফোড়ন কাটা–এটা তার বিলাসব্যসন কিংবা ব্যাসনবিলাসো বলা যায় মা।
বিন্দু, ব্যাস, বৃত্ত-অ উ ম তিন মিলিয়ে হল গে ওম। ওঁ-প্রণবমন্ত্র। অনাহত ধ্বনি। বিশ্বসৃষ্টির-বীজ নব নব সৃজনের। বুঝেছিস?
জানি। বাবা হরদম হরি ওম হরি ওম করেন, জানিনে? কিন্তু মন্ত্রবিদ্যা জানতে চাইনি তো তোমার কাছে-আমার বিদ্যালাভের মতরটাই জানতে চেয়েছিলাম!
বিদ্যা হচ্ছে বিদ্যমানতা, আমাদের অস্তিত্ববোধ। বোধের মধ্যে আমাদের বেঁচে থাকা। ঈশ্বরের সঙ্গে যোগেই আমাদের অস্তিত্ব। অ-এর সঙ্গে ঋত হয়েই আমরা অমৃত আমাদের মৃত্যু নেই তখন। আবার আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে, জড়িত হয়েই অস্তিত্ব ঈশ্বরেরও–তিনিও অমৃত তখনই। পরস্পরের এক সঙ্গে একাধারে যুগপৎ এই বিদ্যমানতার বোধই হচ্ছে মহাবিদ্যা। আর এই বিদ্যাতেই অমৃতমনুতে।
ওবাবা! আমার বাকস্ফূর্তি রহিত।–এত কাণ্ড!
বিদ্যা আবার দুরকমের-পবিদ্যা আর অপরাবিদ্যা। মার ব্যাখ্যান পরাবিদ্যা হোলো ঈশ্বরের সঙ্গে বিদ্যমানতা। পর কে? না, ঈশ্বর। পর বলতে তাঁকেই বোঝায় কেবল!
কথাটা ঠিক বলেছো মা। তৎক্ষণাৎ আমার সায় : ভগবানের মতন পর আর হয় না। কখনই তিনি কারো আপনার নন। দ্যাখো না মা, তিনি আপনার হলে পৃথিবীর মানুষের এত দুঃখকষ্ট কেন?
দুঃখকষ্টের কারণ ভগবান নন। আমরা নিজেরাই। সে কথা তোকে বোঝাব আরেকদিন। মা বলেন-এ পর সে পর নয় রে! এখানে পরের মানে আলাদা। পর কিনা, পরাৎপর, পরম। যাঁর ওপরে আর কেউ নেই, কিছু নেই। সেই পরমের সঙ্গে অহরহ আমাদের যে যুক্তবোধ-সেই হলো তোর পরাবিদ্যা। আর অপরের সঙ্গে বিদ্যমানতা হোলো অপরাবিদ্যা।
সেটা আবার কীরকম মা?
দুরকমের অস্তিত্ব না আমাদের! এক, ভগবানের সঙ্গে মনোযোগে আর অপর সকলের সঙ্গে কর্মযোগে? ঈশ্বরের সঙ্গে যোগ মনোবৃত্তে এবং সবার সঙ্গে যোগ জীবনবৃত্তে। মনে মনে তাঁকে আমরা টের পাই, তাঁর অস্তিত্ববোধ জাগে, ঠাকুর যাকে বলেছেন বোধে বোধ। আর বুদ্ধদেব বলেছেন, বোধি।
বুদ্ধদেবের বেলায় বোধি? আর পরমহংসদেবের বেলায় বোষোদয়? আমার প্রশ্ন হয়।
বুদ্ধদেব তো ঈশ্বর মানতেন না, নিজেকে স্বীকার করতেন কেবল। তাঁর বোধি হোলো আত্মবোধ-নিজের অস্তিত্ববোধ। আর শেষ পর্যন্ত তাতেই নির্বাণ লাভ করা।
কিন্তু সেই বোধি তো বুদ্ধ হওয়া–বুন্ধু মেরে যাওয়া! ফুরিয়ে যাওয়া একেবারে–যা নাকি নির্বাণ। সে তো সর্বনাশ। সে তত ভালো নয় মা। আমার বোধশক্তি জাহির করি-অনির্বাণ না জ্বলে একেবারে নিবে যেতে কে চায় মা?
আমার সে কথার জবাব না দিয়ে মা নিজের কথার আবেগে এগিয়ে যান : মনে মনেই সেই পরমকে পাই; আর অপরকে পেতে হলে যেতে হয় জীবনে জীবনে। আমাদের পেশায়। কার্যসূত্রে আমাদের নিত্যকার বৃত্তিতে যোগাযোগ হয় সবার সঙ্গে। সেই হেলো আমাদের অপর এক অস্তিত্ব।
ভগবানের যোগে আমরা মনস্বী, আর অপরের যোগে ধনস্বী-পরমার্থের সঙ্গে টাকাকড়ি দুই মিলে জীবন্ত। মার খোদাইয়ের ওপর আমার কিঞ্চিত খোদকারি।
হ্যাঁ, তাই। তাহলে দেখা যাচ্ছে আমাদের জীবনে বৃত্তটাই হল গিয়ে আসল। বৃত্ত নইলে অস্তিত্বই নেই। আবার সেই বৃত্তকে যদি মূল-এর সঙ্গে বিন্দুর সহিত যুক্ত করতে পারি, তাহলেই আমাদের অস্তিত্বের পূর্ণতা। বিন্দুবাসিনী আমাদের বৃত্তে এসেই নিত্য; নিত্যকালীন নৃত্যকালী; তাঁর সঙ্গে সংযোগেই আমাদের অস্তিত্ব। আমরা অ-মৃত।
হ্যাঁ, মা। কিছু বুঝি কিছু বুঝি না, মার কথায় সায় দিয়ে যাই।
একেই বলে আবৃত্তি। এই আবৃত্তিই হোলো গে…
কী করে হোলো, বুঝিয়ে দাও।
অ হোলো গে ঈশ্বর, অ-র সঙ্গে আরেক অ-কার যোগ হলে হয় আ। স্বরসন্ধিতে পড়েছিস। এই দ্বিতীয় অ-কার হোলো তাঁর অনুরূপ। তুই, আমি, আমরা সবাই-পরস্পরের যোগাযোগে আমাদের আকারলাভ। তারপর বৃত্তপথে এসে, নিজ নিজ বৃত্তির পথে আবৃত্তি হচ্ছে আমাদের। তাঁরও, আমাদেরও। তাঁকে নিয়ে আমরা পুনরাবৃত্ত, এবং আমাদের নিয়ে তাঁর পুনরাবৃত্তি। পুনঃ পুনঃ পুনরাবৃত্তি-অনন্তকাল ধরে চলেছে এই খেলা!
মা অনায়াসে কত সহজে সেদিন বুঝিয়েছিলেন যে! এতদিন বাদে আজ আমার ভাষায় তার আভাসেও পৌঁছতে পারব কি! মোটামুটি যা বুঝেছিলাম, এইভাবে বিন্দুমাত্র তিনি বৃত্তপথে এসে ব্যক্ত হচ্ছেন–আমাদের মনবৃত্তে প্রাণবৃত্তে, আমাদের ব্যক্তিত্বে। দেহবৃত্তে স্নেহবৃত্তে আদান-প্রদানের রূপ ধরে জীবনের নানান বৃত্তিতে। এই আমাদের জীবনবৃত্তান্ত। মূলে তিনিই ফুলে ফুলে ফুটছেন, ফল হয়ে ফলছেন–তাঁকে পাট্টায় বসিয়েই পাটোয়ার আমাদের ফলাও কারবার। মৌলিক তিনিই নিজের অনুকরণ করছেন আমাদের মধ্যে নব রূপে-নিত্য নব হয়ে। নিতুই নব চিরকালের রূপকথাই এই।
