রামও করেনি আমার। মামার জিনিষ মনে করে নিয়েছিল, খুলে দেখেছে পিস্তল। খেলার জিনিস মনে করে রেখে দিয়েছে কাছে।
রিভলভার তো খেলার জিনিষ নয় ম্যাডাম। তক্ষুনি গিয়ে জমা দিলে হতো থানায়। তা না করে নিজের কাছে রাখাটা… দারোগার মুখ দারুণ গম্ভীর হয়।
খুবই অন্যায়, খুবই অন্যায়। মা সায় দেন তার কথায়। আমি জানলে সেই ব্যবস্থা করতাম। কিন্তু টের পেলাম তো আজ। এইমাত্র। তা ছাড়া আমার ভাই সুরেন যে তলে তলে বিপ্লবীর দলে গেছে ঘুণাক্ষরেও তা আমরা জানিনে। টের পাইনি কখনও। তা ছাড়া, সুরেন তো বহুদিন এখানে থাকে না…
কোথায় থাকেন সুরেনবাবু এখন?
ভাঙরের কাছে কোন এক আশ্ৰম আছে নাকি, গোঁসাই গুরুর আশ্রমেই থাকে সে। ধর্মকর্ম নিয়েই আছে এখন–সর্বদা হরিনাম কীর্তন করে এই তো জানি। কোনোদিন যদি বিপ্লবী দলে ভিড়েও থাকে, এখন সে বদলে গেছে একেবারে। হলফ করে বলতে পারি আমি।
তা হলে খোঁজখবর নিতে হবে আমাদের একবার।
নিয়ে দেখুন, তাকে দেখলে, তার সঙ্গে কথা কইলেই টের পাবেন–আলাপ হলেই জানতে পারবেন সে এখন আলাদা মানুষ…একেবারে অন্যরকম…
এই সব কাজের প্রতিক্রিয়ায় অনেকেই পালটে যায়, ধর্মে মতি হয় শেষটায়, দেখেছি আমরা অনেক…
আপনারা কি মামাকে গিয়ে অ্যারেস্ট করবেন নাকি? আমার অন্তরগত বিবেক আমায় কামড় বসায়, আর্তনাদ করে উঠি।
যদি দেখি যে বিলকুল বদলে গেছেন, এনাকির্স্ট দলে তিনি নেই এখন আর, তাহলে কেন তাঁকে হ্যারাস করতে যাব আমরা?
দাদাকে বুঝি ধরে নিয়ে যাবেন থানায়? সত্য জানতে চায়।
শিবপ্রসাদবাবু যদি ওর জামীন হন-অতঃপর ওর গুড বিহেভিয়ারের দায়িত্ব নেন-ওকে নিজের চোখে চোখে রাখেন, বিপথে যেতে না দেন, তা হলে ওকেও আমরা কিছু বলব না। তবে বাবার নজরে ছেলেরা আর কতক্ষণ থাকে বলো! উনি যদি নিজের হেফাজতে রাখেন… মার প্রতি তিনি কটাক্ষ করেন। ছেলেরা মার নজর এড়াতে পারে না কখনই…উনি যদি নিজের হাতে ভার নেন ওর-তাহলে তোমার দাদাকেও আমরা কিছু বলব না।
দারোগার আবেদনে নীরব থাকলেও সর্বদাই যে তাঁর নজরানা আমার প্রতি প্রদত্ত, মার মৌনতাতেই সেই কথাটি সবার সম্মুখে মুখর হয়। আমি বেঁচে যাই।
কিন্তু তার পরেও একটি প্রশ্ন থেকে যায়। শেষের সেই প্রশ্নটি আমার আর আমাদের সতীশের কি হবে তাহলে?
যদি সে সৈন্যবাহিনীতে যোগ দেয় তো কিছুই হবে না। ভালই হবে তার। যুদ্ধ থেকে বেঁবের্তে যদি ফিরে আসে, আসতে পারে, সরাসরি আমার জায়গাতেই এসে বসতে পারে হয়ত-চাই কি, কোনো থানার দারোগা হয়েই বসবে হয়তো কোনোদিন।
দারোগা? কী হতে গিয়ে কী যে হতে হলো সতীশকে, আমি নিজের মনে খতিয়ে দেখি একবার। লাভ কি ক্ষতি জানিনে, দেশভক্তির পরাকাষ্ঠা দেখাতে গিয়ে সেই রাজভক্ত হতে হলো তাকে-পেট্রিয়ট না হয়ে পুলিস সেজে পেটের ধান্দায় ঐ পথের আর সব বিপথিকদের ধরে পেটাবার কাজে লাগতে হলো শেষটায়…হায় রে!
কী চাইতে গিয়ে কী যে পায় মানুষ, কী পাবার পরে কী আবার চেয়ে বসে যে–হিসাবের খাতায় তার অঙ্ক কোনোদিনই মেলে না বুঝি!
.
২৪.
সবটা কাল শোনা হোলো না মা আমার, মার কাছে গিয়ে বসলাম আবার : দারোগাবাবু মাঝখানে এসে আমার বিদ্যালাভের পথে বাগড়া দিলেন না কালকে?
কিসের বিদ্যালাভ?
সেই যে…যে বিদ্যায় অমৃতলাভ হয়…বিদ্যয়ামৃতমতে?
অমৃত মানে কী, বল্ দেখি আগে।
কে না জানে? সেই জিনিস, যা নাকি একদিন দেবাসুরের সমুদ্রমন্থনে উঠেছিল…সুধা আর বিষ।
সুধা আর বিষ?
হ্যাঁ, সুধাটা স্বর্গেই শুধু পাওয়া যায়, কিন্তু বিষ কি কোথায় মেলে আর এখন? সবটুকু তো তোমার নীলকণ্ঠই গিলে বসে রয়েছেন।
গিলেছিলেন ভাগ্যিস!
আমার অনুযোগ : কিন্তু ঐ সুধাও কি তোমার এই বসুধায় মেলে নাকি আবার? বাবা বলছেন যে, বিদ্যার্জনেই কেবল তা পাওয়া যায়।
হ্যাঁ, সুধাই বটে। অমৃতর তাই একটা মানে বটে ঠিকই, কিন্তু বলেছি না, প্রত্যেক শব্দের ভেতরে আরেকটা অর্থ থাকে ফের? অমৃত কি না, অ-এর সঙ্গে যা ঋত, কিনা জড়িত। অ হল গে আদিস্বর, ব্রহ্ম আর ম্ হল তোর অনুস্বর–তার সঙ্গে যুক্ত ব্যঞ্জন,-যার মানে অদ্ভুত ব্যঞ্জনা, অফুরন্ত প্রকাশ। ব্ৰহ্ম আর তাঁর মায়া-স্বয়ং ব্রহ্মময়ী-মা বিন্দুবাসিনী। বিন্দু আর ব্যাস মিলিয়ে ঐ অম্।
অনুস্বরের চেহারাটাও প্রায় সেই রকম-তাই না মা? যেন পয়েন্ট আর তার রেডিয়াস। আমার পয়েন্টেড প্রশ্ন : বিন্দু আর ব্যাস নিয়ে তোমার ঐ বিন্দুবাসিনী। তাই না মা? ভারী আশ্চর্য তো!
আশ্চর্য কি! শব্দ তো ব্রহ্মই। প্রত্যেক শব্দের আড়ালেই তিনি রয়েছেন, বাক্যমাত্রেই তাঁর আভাস মেলে। যেমন সব জলেই ছায়া পড়ে আকাশের। মা জানানঃ শুধু দেখতে জানলে হয়।
যাদের দিব্যদৃষ্টি খুলে যায় তারাই দেখতে পায়, তাই না? যেমন বিবেকানন্দের খুলে গেছল একবার, তোমার ওই ঠাকুর খুলে দিয়েছিলেন, তখন তিনি পৃথিবীর সব জিনিসেই ব্ৰক্ষ দেখছিলেন। গোলদীঘির ধারে দাঁড়িয়ে, হারিয়ে ফেলেছিলেন গোলদীঘিকে। অতবড় গোলদীঘিটা, এমনকি তার রেলিং-টেলিং সব নিয়ে ব্রহ্মের সঙ্গে, গুলিয়ে একাকার হয়ে গেছল তাঁর চোখের সামনে।
হয়েছিলই তো।
কিন্তু ব্রহ্মের সঙ্গে মিলিয়ে ঐ গোলদীঘির কিংবা গোলদীঘির সঙ্গে মিলিয়ে তোমার ঐ ব্রহ্মের এই তালগোল পাকানোটা কি ভালো মা? তাতে তো কোনোটাইে ঠিক ঠিক দেখা যায় না–সঠিকরূপে পাওয়া যায় না একদম।
