সত্যি, হাতটা খালাস করে নেওয়াই ভালো। বাঁ হাতে খেতে তোমার কতো কষ্ট হয়…হয় না মা?
কষ্ট কিসের! অভ্যেস হয়ে গেছে তো। এখন হয়ত ডান হাতে খেতে গেলেই আমার আবার বাধ-বাধ ঠেকবে।
বাঁ হাতে খাওয়াটা কেমন দৃষ্টিকটু নয়? যারা দেখে তাদের তো কষ্ট হয়। হয় না মা?
তা কী জানি! কী করে বলব! আমি তো কাউকে দেখতে দিই না আমার খাওয়া।
কী দরকার অমন করে লুকিয়ে চুরিয়ে খাওয়ার? নিজের পয়সায় খাচ্চি তো? পরের পয়সায় কি চুরি করে খাচ্ছি না যখন?…আচ্ছা মা, কলকাতায় গেলে রিনিদের বাড়িতেই তো উঠব আমরা? মাসিমা এত করে বলে গেছেন তোমায়?
আমার আপন দিদি থাকতে, তোর খুদি মাসির বাড়িতে না উঠে, ওদের বাড়ি যাব কেন রে? সেটা কি ভালো দেখাবে? তবে হ্যাঁ, একদিন ওদের বাড়ি যেতে পারি, যাব বেড়াতে একদিন, বলেছি যখন।
আমি একটা থার্ড ক্লাস ছ্যাকরা গাড়ি ভাড়া করে আনব মা-যেদিন যাব ওদের বাড়ি। আমি খড়খড়ি বন্ধ করা গাড়ির খুপরির ভেতর তোমার সঙ্গে বসব না কিন্তু, বলে রাখছি এখন থেকেই। আমি কোচম্যানের পাশে বসে যাব, নয় তো গাড়ির পেছনে সইসের জায়গায় দাঁড়িয়ে। কেমন তো?
বেশ বেশ, তাই হবে। তাই যাস না হয়। হাসতে থাকেন মা-এখন খেয়ে নিয়ে পড়তে বসগে।
খোলা ফিটন গাড়ি চেপে গেলেও তো হয় মা? হয় না? তাহলে তো আমি তোমার পাশে বসেই দেখতে দেখতে যেতে পারি।
তাও হয়। কিন্তু খোলা ফিটন তো সাহেবপাড়া ছাড়া পাওয়া যায় না রে!
আমি ট্রামে চেপে চলে যাব সাহেবপাড়ায়, সেখেন থেকে ফিটন ভাড়া করে নিয়ে আসব হয়-চেপে বসে আসব তাইতে। আনব তো? কী বল মা?
তাই আনিস না হয়।
তারপরে রিনিদের বাড়ি পৌঁছবার পরে ঐ গাড়ি করেই যদি আমরা–আমি আর রিনি যদি একটুখানি হাওয়া খেয়ে বেরিয়ে আসি মা?
বেশ তো, আসিস না-কে মানা করছে। যা, এখন পড়তে যা তো।
বাবাও তো পড়তে বলছেন মা। বলছেন, বিদ্যায়ামৃতমতে। কিন্তু তার মানেটা কী মা? মুখস্থ করে পাশ করে কী যে আমার চারটে হাত বেরুবে তা তো আমি ভেবে ঠাওর পাইনে। মুখস্থ বিদ্যায় কী অমরত্ব যে পাব তা জানি না। কী তত্ত্ব তার কে জানে!
বলতে না বলতে উসকে ওঠেন মা। তত্ত্বকথায় মাকে একবার পেলে হয়, তক্ষুনি তিনি উন্মত্ত। বাবার তত্ত্ব পেতে গিয়ে মার ব্যাখ্যা শুনি-শুনতে বেশ লাগে আমার। যা কিছু শিক্ষা আমার-সে তো সেই ছোটবেলাতেই–নিজের মার কাছেই। বই পড়ে আর কতটা শিখেছি।
তাই বলছেন নাকি তোর বাবা?
বলছেন তো তাই। বলছেন যে, আবৃত্তি সর্ব শাস্ত্রানা বোধাদপি গরিয়সী। শাস্ত্রটার মানে কী যে, যদি কিছু বুঝতে নাও পারো, শুধু কেবল তুমি আউড়ে-শাস্ত্রবোধের চেয়েও তার ঐ আবৃত্তিটা বড়ো।
সে আবৃত্তি কি তোর মুখস্থ বিদ্যে? তোকে বলেছে!
আমিও তো তাই বলছি মা। মুখস্থ করে কোন্ অমৃতটা আমি পাব যে…
বলতে গিয়ে আমি থমকে যাই। মনের মেঘে বিজলির মতন চমকে ওঠে, হ্যাঁ, একটা অমৃত আছে বটে, যা শুধু মুখস্থ করলেই মেলে, মুখেই যার উদয় আর মুখেতেই অস্ত-মুখের ওপরেই সমস্ত–কিন্তু সর্বক্ষণ অন্তরে যায় নিরন্তর অনুরণন–উদয়াস্তব্যাপী সেই দিলবাহার, আসলে তা কোনো বিদ্যা কিনা জানি না, তবে তার তত্ত্ব যে সেই অল্প বয়সেই আমার আয়ত্ত হয়েছে, মার কাছে তা আমি আর ব্যক্ত করতে যাই না। যেমন ভারতচন্দ্রের গ্রন্থাবলীর ওই বইটাও যে আমি পড়েছি, ফাঁস করতে পারিনি কোনোদিন। বিদ্যাসুন্দরের থেকে শেখা সেই সুন্দর বিদ্যার কথাটা জানাইনি কখনো মাকে, বইটা পড়ার পুনঃ পুনঃ মানা ছিল মার–সেইজন্যেই! মনে হয়, মনে আমার পাপ ঢুকেছিল তখনই।
বিদ্যার মানে আলাদা, একেবারেই আলাদা-সবাই তা জানে না। গঙ্গাড় করে তোর ওই আউড়ে যাওয়াটা বিদ্যে নয়। বিদ্যে কখনও পুঁথিগত হয় না, সেটা অভ্যাসগত। সেই অভ্যাসের মানেও আবার স্বতন্ত্র। প্রত্যেক শব্দের একটা আভিধানিক মানে আছে, কিন্তু তার আড়ালে আরেক অর্থ থাকে, প্রত্যেক বাক্যের অন্তনিহিত আরেক তত্ত্ব। শোন বলি। বিদ্যার মানে হচ্ছে…
কিন্তু মার বিদ্যা জাহিরের আগেই সত্য ভগ্নদূতের মতন হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে-জানো মা, কী হয়েছে? সতীশদাকে পাকড়েছে পুলিশে, তার পকেটে রিভলবার পাওয়া গেছে। নাকি। সে কবুল করেছে যে, আরেকটা জিনিস আছে নাকি দাদার কাছে। থানার দারোগা অ্যারেস্ট করতে আসছে দাদাকে। জানায় সে।
ঐ জিনিস-কী জিনিস? জানতে চান মা।
ঐ রিভলবার। আরেকটা আছে নাকি দাদার কাছে।
কোথায় রিভলবার? দেখি তো?
এই যে মা। কোটের পকেট থেকে বার করে দিই।
কোথায় পেলি তুই?
মামার নামে একটা পার্শেল এসেছিল। সেই যে মামার একটা অঙ্কের চিঠি এসেছিল না? তার পরেই তো এল এই রিভলবার দুটো। একটা পার্শেলে।
সুরেন তলে তলে বিপ্লবীদের দলে ভিড়েছে জানতুম না তো। ঘুণাক্ষরেও না…
দারোগাবাবু ততক্ষণে বাবার বৈঠকখানায় এসে পৌঁছেছেন–বাতচিত করছেন বাবার সঙ্গে। দারোগার মুখে আমাদের কীর্তিকাহিনী শুনেও বাবার মুখে কোনো ভাবান্তর আমি দেখলাম না।
মা গিয়ে দারোগাবাবুকে বললেন-রিভলবারগুলো এসেছিল আমার ভাই সুরেনের নামে পার্শেলে…।
জানি। পোস্টমাস্টারবাবু পার্শেলের কথা বলেছেন। পার্শেল যে এসেছিল তা আমি জানি। সেদিনও গিয়েছিলাম পোস্ট-আপিসে, রোজই একবার করে যেতে হয় আমাদের…এইসব ব্যাপারের খোঁজখবর নিতে। পার্শেলটার ওপরে লেখা ছিল মেডিসিন উইথ কেয়ার আমি দেখেছিলাম। শিবপ্রসাদবাবুর কেয়ার অফে এসেছিল বলে আমরা আর ওটা খুলে পরীক্ষা করে দেখিনি…সন্দেহই করিনি কোন।
