আবার চটপট হাততালি চারধার থেকে। ছেলেদের সে কী উল্লাস! পুলিস সাহেব আমার সঙ্গে করমর্দন করলেন সহাস্যে।
আমার পিছু পিছু সতীশও উঠে দাঁড়িয়েছিল। আমাদের দেখাদেখি আরো জনাকতক।
সবাইকে ডাকা হলো সেই ডায়াসের ওপর। রিকুটের দলে নাম লেখা হলো সবাইকার। শুনলাম, সাহেবের সঙ্গে পরদিনই সদরে চলে যেতে হবে সবাইকে।
আমার অপটু দেহের জন্য, বিস্তর বাহবা দিয়েও, শেষ পর্যন্ত আমায় বাতিল করে দেওয়া হল। ওদের সবাইকে কিন্তু ভর্তি করে নেওয়া হলো সৈন্যদলে। সতীশও গেল সেই সঙ্গে।… আমাকে আর কষ্ট করে নিজের মাথা খেলাতে হল না। কার লীলা কে জানে, অবলীলায় বেঁচে গেলাম সে যাত্রায়।
কী করতে যে কী হয়ে যায়। আমাদের মাথার ওপরে আড়ালে থেকে কে যে নিজের মাথা খেলায়!
.
২৩.
সেদিনের সংগ্রামসভা থেকে ফিরেই সোজা যাচ্ছিলাম রিনিদের কোয়ার্টারে–তার সঙ্গে শেষ দেখা সারতে। সেদিনের সন্ধ্যাতেই তাদের স্টেশনে যাওয়ার কথা-সামসি রওনা হবার আগেই যদি ধরতে পারি তাদের। রাত্রের গাড়িতেই কলকাতায় পাড়ি জমাবে তারা।
বাড়ির সামনেই বাধা পড়ল। আমার ভাই সত্য এসে খবর দিল-বাবা তোকে ডাকছে রে দাদা।
যেতে হোল বাবার কাছে।
বাবা সেই সভায় যাননি, কিন্তু সেদিনকার সব খবরই পেয়েছিলেন আমার ভাইয়ের কাছে।
যেতেই তিনি বললেন, রাম, তোমার শৌর্যে আমি সুখি, একটু গর্বিতও বইকি। কিন্তু এখনও তোমার যুদ্ধবিগ্রহে যাওয়ার বয়স হয়নি। বয়স হলে যেয়ো। যাবে বই কি। লড়াইয়ের কায়দা-কানুন রপ্ত করে রাখাটা ভালো–এখনই তার বেশ সুযোগ ছিল। কিন্তু লড়তে হবে নিজের দেশের জন্যেই, ইংরেজের জন্যে নয়।…।
হ্যাঁ বাবা, তা আমি জানি। দেশের স্বাধীনতার জন্যই আমি প্রাণ দিতে চাই, ইংরেজের স্বার্থে নয়–সেইজন্যেই যাচ্ছিলাম। ইংরেজের কাছ থেকেই তো শিখে নিতে হবে এই যুদ্ধবিদ্যাটা?
এখন যারা তার উপযুক্ত, তারা তা শিখবে বইকি। এবং তারা কি শিখছে না? দলে দলে যুদ্ধে ঢুকছে তারাই এখন। পরে সুযোগ মতন সব বেঁকে দাঁড়াবে। কামানের মুখ, বন্দুকের নল ঘুরিয়ে দেবে ওই ইংরেজের দিকেই। কিন্তু এখন তোমার সে বয়স আসেনি, তোমার শরীর যুদ্ধে যাবার মতন তৈরি হয়নি–মজবুত হয়নি এখনো…
সেইজন্যই তো নিল না আমায়। আমি সখেদে জানাই-তারাও সেই কথাই বলল বাবা।
এখন তোমার যে কাজ সেইটাই ভালো করে করো। খেলাধূলায়, ব্যায়াম চর্চায় শরীর তৈরি করো। আর পড়াশুনায় মন দাও। যখনকার যা কাজ তাই কমতে হয়; তাহলে পরবর্তী কাজটার জন্য উপযুক্ত হওয়া যায়। বিদ্যার্জন কিছু কম কাজ নয় বাবা। যুদ্ধে গিয়ে প্রাণ দিলে অমরলোকে যাওয়া যায় জানি, জয়তে লভতে লক্ষ্মী–মৃতেলাপি সুরাঙ্গনা-শাস্ত্রে বলেছে, কিন্তু বিদ্যার দ্বারাও অমরত্ব লাভ করা যায়–মরবার পরে নয়, এই জীবনেই। সেটাও কিছু কম শ্রেয় নয়। বিদ্যয়ামৃতমনুতে-বলে থাকে, জানো?
জানি বাবা। আমার ঘাড় নাড়ি : বিশ্ববিদ্যালয়ের বইয়ে ওই ছাপ মারা থাকে আমি দেখেছি, কিন্তু ওর মানে ঠিক জানি না।
বিদ্যয়ামৃতমতে, কিনা, বিদ্যুয়া অমৃতম্ অণুতে– অর্থাৎ বিদ্যার দ্বারা অমৃত অর্জন করা যায়। বুঝলি?
হ্যাঁ বাবা। এখন খেলতে যাই তাহলে? বলে বাবার কাছে বিদ্যার্জন না সেরেই রিনিদের বাড়ির দিকে দৌড়াই।
গিয়ে দেখি তাদের ঘরগুলোর জানালা খড়খড়ি সব বন্ধ–তবু আশায় ভর করে–এখনও হয়ত ওরা রওনা দেয়নি–সেই ভরসায় কাঠের সিঁড়িটা ধরে উপরে উঠলাম। কুয়াতলার পাশ দিয়ে এগিয়ে দেখি, দরজায় মোটা তালা ঝুলছে। আর দরজার গায়ে রিনির হাতের গোটা গোটা আঁচড়ে টাটকা চকের লেখা–রামদা, চলে গেলাম, রিনি।
র-য়ের বদলে ঋ-কার দিয়ে নিজের নাম লিখেছিল সে। বানান ভুলটা চকচক করছিল চোখের উপর। ইচ্ছে করে ঐ রকম বানানো-আমি বুঝলাম।
কিন্তু সে ঋণীটা কিসের? ঋণী তো আমি। আমিই তো। সে তো খালি দিয়েই গেছে, দু হাতে, অন্নপূর্ণার মতন যত পরমান্ন, আর আমি কেবল নিয়েই গেছি–পেয়েছি যত না। বিনিময়ে কিছুই তাকে দিইনি–দিতে পারিনি।
আমার আছেটা কী? চিড়ে গুড় ছাড়া আর দেবার কী ছিল আমার? সে-ই তো মহাজন। আমি ঋণী, চিরঋণী–শিবের মত চিরভিখারী রয়ে গেলাম তার কাছে।
ফিরে এলাম রান্নাঘরে, মার কাছেই। মা লুচি ভাজছিল তখন।
আয় বোস, কোথায় ছিলি রে এতক্ষণ? কিছু খাসনি তো বিকেলে। মুখটুখ শুকিয়ে গেছে।
খানকয় ফুলকো লুচি আর পটল ভাজা দিলেন একটা রেকাবিতে। খেতে খেতে বলি–মা, তুমি কলকাতায় যাবে বলছিলে না?
কলকাতায়! কেন রে? এত জায়গা থাকতে কলকাতায় যাব কেন হঠাৎ?
বাঃ, বলছিলে না সেদিন? কালীঘাটে তোমার হাত খালাস করতে যাবে। বলছিলে না সেদিন রিনির মাকে?
রিনির মা কী রে? মাসিমা বল। হ্যাঁ, যাব তো কলকাতায়। যেতে হবে বটে, কিন্তু কবে হয়ে ওঠে দেখি।
এর আর দেখাদেখি কি মা? হয়ে ওঠাওঠিটা কিসের? গাড়িতে উঠে বসলেই হয়। আমি মাকে উৎসাহ দিই-বল তো আমি সাইকেলে করে সামসিতে গিয়ে আগে থেকে টিকিট কেটে নিয়ে আসতে পারি। যাব কাল সকালে?
টিকিটের জন্যেই আটকাচ্ছে কিনা! তোর বাবার সময় সুবিধা হলে তবেই তো যাওয়া হবে। দেখা যাক আগে…
বলব গিয়ে বাবাকে? জিগ্যেস করব মা?
না, তাকে জিগ্যেস করতে হবে না। আমিই বলবখন।
