আমি আর দেখতে যাই না, নীরবে এগুতে থাকি ওর সঙ্গে।
এই হপ্তাতেই কলকাতায় তোর জীবনী বেরিয়ে যাবে-জানিস? আমাদের অমর শহীদ সিরিজে। যেতে যেতে সে জানায়।
আমার লাভ? আমি তো আর দেখতে পাচ্ছি না।
তা পাবি না বটে, সে কথা ঠিকই, তবে জেনে যা-ক্ষুদিরাম, কানাইলালের সঙ্গে একাসনে স্থান পাবি–এক সাথে নাম উচ্চারিত হবে তোর।
আমার জীবনী? লিখতে গেল কে? আমি যে নিজেই কিছু জানি না আমার জীবনের। বলে আমি দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়ি আমার জীবন তো শুরুই হয়নি, এখনো।…পরলোকে পাড়ি দিতে চলেছি? আমার জীবন কাহিনী তোরা জানলি কি করে?
জানিনে আমরা? এতদিন একসঙ্গে আছি, দেখছি তোকে, জানিনে? তারপর তোর বাবার পদ্যের বই থেকেও কিছু নেওয়া, কিছুটা বানিয়ে দেওয়া। কে লিখেছে বলছিস? স্বয়ং আমাদের লীডার। লেখার বেশ হাত আছে তার।
আমার জীবনী লেখা হয়েছে এতদিন জানাসনি তো আমায়?
কবে লেখা হয়ে গেছে! ছাপাও শেষ, এখন শুধু বেরুনোর অপেক্ষায়। তোর ঐ কাটার পরেই ছাড়া হবে বাজারে। জানাইনি আগে বটে, তবে এখন, যাবার আগে কথাটা জেনে আনন্দ হচ্ছে না?
আনন্দ? জেনে আমার কিসের সুখ ভাই! অমর শহীদ হবার কোনোই সান্ত্বনা আমি পাই না।–লাভটাই বা কী আমার, বল?
তোর লাভ নয়, আমাদের লাভ। আমাদের পার্টির লাভ। কী লাভ, কেমন করে লাভ, বলছি শোন। বইটা বাজারে পড়তে না পড়তেই তো সরকার থেকে বাজেয়াপ্ত হবে, তল্লাসী করে তার কিছু কিছু বই এখানে সেখানে পেয়ে নিয়ে যাবে পুলিস। কিন্তু বেশির ভাগ বইয়েরই কোনো হদিশ মিলবে না। তখন সেইসব বই লুকিয়ে ছাপা হতে থাকবে আরো।
এডিশনের পর এডিশন। আরো আরো লাভ।
তোর জীবনীও কি আমার সঙ্গে বেরুবে নাকি আবার? আমি জিগ্যেস করি।
বের হতেও পারে, টের পাইনি এখনো। লীডার কিছু বলেনি আমাকে।
যথা সময়ে যথাস্থানে গিয়ে যথাযথ বসলাম আমরা। ডায়াসের সামনের সারিতে আমি, আর আমার ঠিক দু সারি পিছনে আমার উপর নজর রেখে সতীশ। কোটের পকেটে হাত পুরে রেখে বসেছে সে দেখে নিলাম।
আমিও তার মতই পকেটের ভেতরে পিস্তল পাকড়ে বসেছি।
সদর থেকে পুলিস সাহেব এসেছেন, সঙ্গে বেঙ্গল রেজিমেন্টের এক পদস্থ সৈনিক। হাবিলদার-টাবিলদার হবে কেউ, কাবিল হোসেন বলল। আমার ঠিক পাশেই বসেছিল সে।
বিপদে পড়লে মাথা খেলে নাকি মানুষের, কথায় বলে। আমিও ডায়াসের সম্মুখে বিপদের মুখে–বসে বসে নিজের মাথা খেলাই।
আচ্ছা, সাপও মরে আর লাঠিও না ভাঙ্গে-তেমনটা রা যায় না কি? আমাদের অভিশাপ ওই সাহেবটাও মোলো অথচ আমার দেহষ্টি অক্ষত রইল-এমনটা হয় না?
অব্যর্থ লক্ষ্যভেদের পরেই আমি যদি ধুপ করে বসে পড়ি-বসেই না বেঞ্চির সঙ্গে মিশিয়ে যাই, তাহলে, সতীশের তাক না ফস্কালেও, আমার গায়ে তার গুলির আঁচড়টিও লাগবে না। ধরাও পড়তে হবে না, পুলিসের থোলাই থেকেও বেঁচে যাব হয়ত।
যেহেতু, সাহেবের পতন ও মৃত্যুর সাথে সাথেই দারুণ হইচই পড়ে যাবে। হট্টগোলের মধ্যে ভেঙ্গে যাবে সভা। সবার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে পুলিস, কে কোথায় পালাবে তার ঠিক নেই। আমিও ঘাড় গুঁজে সেই ভিড়ের ভেতরে ভিড়ে গিয়ে হারিয়ে যাব গভীরে। সেখান থেকে সটান চলে যাব সামসিতে। এক দৌড়ে মাইল দশেক দূরের আমাদের রেল স্টেশনে। খানিকক্ষণ কোথাও ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থেকে তারপরে কলকাতার ট্রেন ছাড়বার মুখটাতেই চট করে উঠে পড়ব সেই গাড়িতে। সরাসরি চম্পট কলকাতায় তারপরই।
জমজমাট সমাবেশ। এক একজন কিছু বলতে উঠছেন, চটাচট পড়ছে হাততালি। পাঁচশো ছেলের হাজার হাতের হাতুড়িতে গমগম করছে সভা।
প্রথমে বলতে উঠলেন আমাদের রেটর মশাই কামাখ্যাবাবু, তিনি পরিচিতি দিলেন মাননীয় অতিথিদের। বাংলার এককালের শৌর্যবীর্যের উল্লেখ করে বললেন-যে-সামরিক বৃত্তির পথ এতদিন বাঙ্গালীর কাছে অবরুদ্ধ ছিল, ভগবানের কৃপায় আজ তা আবার উন্মুক্ত হয়েছে, আবার কৃপাণ ধরবার সুযোগ পেয়েছি আমরা। বাঙ্গালী যুবকরা–যারা শক্ত সমর্থ–এহেন সুযোগের সদ্ব্যবহারে যেন দলে দলে এই সৈন্যবাহিনীতে যোগ দিয়ে দেশের মুখোজ্জ্বল করে-সেই আশাই উচ্চারিত হলো তার ভাষণে।
সব শেষে বলতে উঠলেন হাবিলদার সাহেব। বীরোচিত চেহারার সেই বাঙ্গালী সৈনিকটি। রণক্ষেত্রে নিজের বরামাঞ্চকর নানান অভিজ্ঞতার কথা এমন ভাষায় তিনি বর্ণনা করলেন যে, সত্যিই রোমাঞ্চ হল আমাদের। যুদ্ধে না গিয়েই গায়ে কাঁটা-দেওয়া সেদিনের আমার সেই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।
তারপরেই তিনি তাঁর সৈন্যবাহিনীতে ভর্তি হবার জন্য ওজস্বিনী ভাষায় আহ্বান জানালেন সবাইকে।
সেই মুহূর্তেই আমি দাঁড়িয়েছি, পকেটের মধ্যে হাত মুঠো করে। সঙ্গে সঙ্গে সতীশও উঠেছে আমার পিছনেই, আড় চোখে দেখছি তাকিয়ে। আমি উঠতেই না, চারধার থেকে এমন জোর হাততালি পড়ল যে এক লহমায় সব প্ল্যান ভেস্তে গেল আমার।
হালিদার সাহেব আমায় ডাকলেন তার কাছে।
ডায়াসে যেতেই তিনি আমায় বুকে জাপটে ধরলেন; ঘোষণা করলেন এই তরুণই এখানকার প্রথম বীর, আমাদের সৈন্যবাহিনীর। তারপর দুহাতে আমাকে উঁচুতে তুলে সবার সামনে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রদর্শনী করলেন আমার।
তিনি নামাবার পর কামাখ্যাবাবু আমার মাথায় হাত রেখে তাঁর আশীর্বাদ জানালেন। গদ কণ্ঠে বললেন–ধন্য! তুমি আমাদের মুখ রেখেছ। সিদ্ধেশ্বরী ইনস্টিটিউশনের মুখ উজ্জ্বল করেছ তুমি। যাও, বীরের মত যুদ্ধে যাও, বীরের মতই ফিরে এসে আবার। বীরের উপযুক্ত তোমার সংবর্ধনার জন্য সেদিনটির অপেক্ষায় থাকব আমরা।
