তাহলে কী হবে তার জবাব আমি কী দেব? আমি বলি তাহলে আমার প্রবৃত্তির পথটা তুমি আমায় বাতলে দাও না! কী যে আমার পথ, কোনদিকে যে আমার প্রবৃত্তি তার। কিছুই তো আমি ঠাওর পাচ্ছিনে। দেখোদ্ধার করব, না, সাহিত্যিক হব, না…না…নাকি…।
নাকি, মাকে কেন্দ্র করে আমার রিনির বৃত্তপথেই ঘুরতে থাকব আমরণ, যেমন ঘুরছি এখন? কিন্তু নানান কথার সেই কথাটায় আর মুখ ফোঁটাতে পারি না, চুপ করে থাকি। মার কাছে আমার নাকি-কান্না কাঁদা যায় না।
কোনদিকে তোর মনের ঝোঁক টের পাচ্ছিসনে তুই? তাহলে তোর মার কাছে গিয়ে চাইগে যা, তিনিই তোর পথ ধরিয়ে দেবেন ঠিক…
আমার মার কাছে?
হ্যাঁ, তোর মা আমার মা সবার মা। আমাদের সবার মনের মধ্যে তিনি আছেন। তাঁর কাছে চাইগে যা। তোর সত্যিকার প্রবৃত্তি কিসে যে, তা তিনিই জানেন কেবল।
তুমি যে সেই ঠাকুরের মতই কথাটা বললে মা। তিনি যেমন মার কাছে পাঠিয়ে ছিলেন নরেনকে–তার যা দরকার তা চেয়ে নেবার জন্য। নরেন কী চাইতে গেল আর কী চেয়ে বসল শেষটায়। মানে, তিনিই চাইয়ে দিলেন বোধহয়। সে চাইতে গেল টাকাকড়ি, আর তাকে চাইতে হল ত্যাগ বিবেক তিতিক্ষা। কী ঝঞ্ঝাট দ্যাখো দিকিন। না, মার কাছে চাইতে আমার ভারী ভয় করে মা। না, তিতিক্ষা-ফিতিক্ষা আমার চাইনে। ওসবে আমার কী হবে? তিতিক্ষা মানে কী?
নরেন তার নিজের নয়, তার বাড়ির চাহিদাটা চাইতে গেছল, তিনি তাকে তার মনের চাওয়াটা ধরিয়ে দিলেন কেবল। নরেন থেকে বিবেকানন্দ বানালেন তাকে। ত্যাগ বিবেক তিতিক্ষার দিকেই অন্তরের ঝোঁক ছিল তার, সংসারের দাবীর কাছে নিজেরটা তিনি দাবিয়ে রেখেছিলেন…মা তাঁর সেই সত্যিকার প্রবৃত্তির পথটা মুক্ত করে দিলেন কেবল। মার কাছে গিয়ে চা তুই। তিনিই আমাদের ঠিক পথে নিয়ে যান হাত ধরে। মা ছাড়া কে আর আছে আমাদের বল?
তুমি আমার হয়ে চেয়ে দিতে পারো না মা? কি করে চাইতে হয় তাই যে আমি জানি না।
যেমন করে আমার কাছে চাস তেমনি করে–আবার কী? তফাৎ এই, আমার কাছে মুখ ফুটে বলতে হয়, তাঁর কাছে মনে মনে। মনে মনেই শুনতে পান, জেনে নেন তিনি।
কিন্তু নিজের মতিগতির হদিশ মার কাছে গিয়ে চাইব কী, মাঝপথে আমার গাইড সতীশ। যে মাঝখানে এসে হানা দেয়–তৈরি আছিস তো শিবু? আসছে হপ্তাতেই সেই সভাটা। পুলিস-সাহেব আসবেন আমি খবর পেয়েছি। খতম করতে হবে তাকে। মনে আছে!
সেই মুহূর্তে আমাদেরকেও তো সেই সঙ্গে–? পরের খতমের সঙ্গে নিজের ক্ষতিটা না খতিয়ে আমি পারি না-কিন্তু যাই বল্ ভাই, কিছুতেই আমার মন টানছে না ওদিকে।
না টানলেও তোর রক্ষে নেই। আমাদের কারোই রক্ষে নেই। করতেই হবে তোক। নইলে আমাদের পাটিই তোকে খতম করে দেবে। রেহাই পাবিনে, মনে রাখিস।
সে কথা কি ভুলবার? আমি বলি-অহরহই মনে রয়েছে আমার।
যেমন ঢিলে শার্ট পরে ইস্কুলে যাস তেমন যাসনে যেন সেদিনটায়। ভারী কোট পরে যাবি, তাহলে তোর পকেটের পিস্তলটা কারো নজরে পড়বে না। তৈরি থাকিস, আমি এসে ঠিক সময়ে নিয়ে যাব তোকে। আমার সঙ্গে প্যান্ডেলে যাবি, ঠিক জায়গায় বসিয়ে দেব, বুঝেছিস? এই শনিবার, মনে রাখিস।
তার গলায় যেন অশনির আওয়াজ পাই। মনে মনে ভয় খাই।
এদিকে শনিবার শনৈ শনৈ এগুতে থাকে।
এর মধ্যে রিনি এসে বলে গেছে আমাকে জানো শিবরামদা, সামনের শনিবার আমরা চলে যাচ্ছি। এখন থেকে–সেই কলকাতায় আমাদের বাড়িতে। সন্ধের গাড়িতে–মা বাবা সবাই আমারা–চিরদিনের জন্য। আমি গিয়ে চিঠি লিখব তোমায়। উত্তর দিয়ে কিন্তু। বলে তাদের কলকাতার বাড়ির ঠিকানাটা আমায় জানাল।
আমি নিরুত্তর হয়ে যাই। এই প্রথম রিনি দাদা বলে ডাকল আমায়–চিরকালের মতন তার চলে যাবার আগে।
আমার হৃদয়ের দুর্বলতম স্থানে অকস্মাৎ এই দা বসিয়ে একেবারে দু টুকরো করে দিল আমায়।
আমার তো মনে হয়, শুধু আমার কেন, কোনো মেয়ে দা বসালে, আমার ধারণা, রক্ষে নেই কারোই।
উত্তর দিতে পারব কি না জানি না। মুখ ফোটে আমার–আমিও সেদিন যাচ্ছি ভাই! আমিও চলে যাচ্ছি সেদিন।
হ্যাঁ, আমিও তো চিরকালের মতই চলে যাবার পথে। এখেন থেকে–ইহলোক থেকে? শনিবারের বারবেলাতেই!
কোথায় যাচ্ছ শিবরামদা? কলকাতায়? আমাদের সঙ্গেই চল না কেন তাহলে। সারাটা পথ গল্প করতে করতে যাওয়া যাবে, কেমন? কোথায় উঠবে কলকাতায় গিয়ে? মামার বাড়ি? কোনো মাসির বাড়িতে? আমাদের বাড়িতেই ওঠো না কেন? বলব আমি মাকে? নাকি, তোমার মাকেও বলতে হবে আবার?
কলকাতায় কি কোথায় যাচ্ছি আমি জানিনে। তবে যেতে হবে। আমি জানাই তোর মাকে বলার দরকার নেই। আমার মাকেও নয়। যদি যেতেই পারি তাহলে তোদের বাড়িও যাব নিশ্চয়। তোর সঙ্গে দেখা না করে পারি আমি? তুই বল?
যেয়ো তাহলে। এই বলে হাসিমুখে বিদায় নিয়ে সে চলে যায়।
মাকে কেন্দ্র করে রিনির বৃত্তও যেন আমার চোখের ওপর মুছে যাচ্ছে দেখতে পাই….রিনির বৃত্তান্তের সঙ্গে ইহকালের আমার ইতিবৃত্তেরও ইতি।… কোথায় যাচ্ছি আমি?
অবশেষে শনিবারের সেই মারাত্মক দিনক্ষণ এল। ভারী কোট পরে, তার ওপরে পিস্তলের ভারে জর্জর, ভারিক্কী হয়ে বসে অপেক্ষা করছি–অকুস্থলে অকুক্ষণে নিয়ে যাবার জন্যে যথা সময়ে সতীশ এসে হাজির।-তৈরি?
— হ্যাঁ, ভাই।
দেখি কেমন তৈরি! বলে সে আমার পকেট হাতড়ে পিস্তলটা বার করে পরীক্ষা করল-গুলি ভরে নিয়েছিস দেখছি। বেশ। তার পিস্তলটাও বের করে দেখালো আমায় আমারটাও ভর্তি। দেখেছিস!
