শুনে আমি গুম হয়ে যাই। অঙ্কুরিত কিনাশের সম্মুখে প্রস্ফুটিত হবার কোনো উৎসাহ পাই না।
সে কিন্তু গুমরে ওঠে তার পরেই–পার্শেলের মধ্যে মোট নিটে পিস্তল ছিল, মনে নেই তোর?
হ্যাঁ, ছিল তো। বেশ মনে আছে।
তার মানেটা কী জানিস? বলে সে একটুখানি থামে-অকালে মরার জন্যে মন খারাপ করছে তোর? মনে কোনো দুঃখ রাখিসনে। কিচ্ছু ভাবিসনে। আমিও তোর সহযাত্রী ধরে নে না! তোর পরে আমিও হয়ত এই পৃথিবীতে আর থাকব না। ওই তৃতীয় পিস্তলটি, মনে হচ্ছে আমার জন্যেই হয়ত।
তোর জন্যে? তার মানে? অন্য আরেক ধাঁধার সামনে আমি বাধা পাই আবার।
মানে, সেদিন হয়ত কে জানে, সেখানেই আর কেউ অমনি বসে থাকবে আমার পেছনে আমাকে মারবার জন্যে তা করে! সঙ্গে সঙ্গে সাফ করে দিতে আমায়। কেউ বলতে পারে?
তোদের লীডার না কি? না অন্য কেউ?
কী জানি কে? আমি কী জানি?
নিজের মধ্যে এই খুনোখুনি? না ভাই, ব্যাপারটা আমার একেবারেই ভালো লাগছে না। যাই বল তুই।
ভালো লাগালাগির কথা নয় তে, দলের কানুন। যে বিয়ের যা মন্তর বলে না? তাই।
.
২২.
অমন দুর্ধর্ষ জার্মান ফৌজ য়ুরোপ জুড়ে অতো লড়াই করেও যে ইংরেজদের মেরে ফৌত, করতে পারছে না, আমরা মুষ্টিমেয় বালক এখানে সেখানে তাদের এক আধটাকে কখনো সখনো খতম করে কি করে যে শেষ পর্যন্ত তাদের নিকেশ করব তা আমার হিসেবে আসেনা। আর সেই হেতু অকারণে অকালে এভাবে আমাদের নিজেদের হতাহত হওয়াটা একেবারের ভালো লাগে না আমার।
তাছাড়া এই খুনোখুনি কাণ্ডে একটুও প্রবৃত্তি হয় না, সত্যি বলতে।
কিন্তু কী করা যায়…
কোনদিকে যাই, কী করি, কোন পথ ধরি তাই আমি ঠাওর পাই না। আমার প্রবৃত্তি যে কোনদিকে, কে আমায় তা বলে দেবে?
শেষটায় বাবাকে গিয়ে পাকড়াই–প্রবৃত্তির পথটা আমায় বাতলে দিতে পারো বাবা!
প্রবৃত্তির কোনো কথাই নয়। নিবৃত্তিনিবৃত্তি! আবৃত্তি করেন বাবা-বললাম না তোক বোকা? হাত-পা-মন সব গুটিয়ে এনে পদ্মাসনে বসে একাগ্র হয়ে ধ্যান করতে হবে? এইভাবে নিবৃত্তিটা রপ্ত করতে পারলে, মানে, নিবৃত্তিই হচ্ছে আসল কথা। সত্যিকার পথ। যে পথে নাকি মোক্ষ।
বাবার মোক্ষম কথাটা মার কাছে গিয়ে ফাঁস করে উঠেছন মাতোকে বলেছে! তুই না। হয় হমুদ চেষ্টায় কোনোমতে নিবৃত্তিটা আয়ত্ত করলি, কিন্তু ভগবানকে নিবৃত্ত করে কে? কার সাধ্যি? তিনি তো কার কথা শুনবেন না-হতেই থাকবেন, যেমন কি হচ্ছেন। তেমনিধারা হয়ে যাবেন। নিজেকে গুটিয়ে নেবেন না কখনই। কিছুতেই। তাঁর বিরুদ্ধে কেউ যেতে পারে? স্রোতের উল্টো মুখে কি যাওয়া যায়? গিয়ে লাভ? মারও সেই আগের কথারই পুনরাবৃত্তি আবার।
মার বক্তব্য আমার ভাষায় ব্যক্ত করি গিয়ে বাবার কাছে-আমি না হয় নিবৃত্ত হলাম বাবা! কিন্তু বাবা, ভগবানকে নিবৃত্ত করা যায় কি করে, করতে পারে কেউ? মা এই কথা বলছিল।
বিপন্নের মত মুখ করে তার জবাবে বাবা মাইকেলের গীতিকবিতা আওড়ান- সখি রে, বন অতি রমিত হইল ফুলফুটনে/পিককুল কলকল/অলিকুল চঞ্চল/চললো নিকুঞ্জে সখি, ভজি ব্রজরমণে। বিপদে পড়লেই, দেখেছি, তিনি মধুসূদনকে স্মরণ করেন।
তারপরে, বোধ করি, বিপদের কিনারা করার পর, তিনি নিবৃত্তির তত্ত্ব ব্যাখ্যায় বসেন ভগবান কি কারো পরামর্শ নিয়ে কাজ করেন? ভগবতীর পরামর্শেই বোধ হয়–আমার এই গায়ে পড়া কথাটা গায়ে না মেখেই তিনি বলে যান-ভগবানের কথায় আমাদের কাজ কী বাবা? মহাজনরা যা বলে গেছেন তাই না শুনতে হবে আমাদের? মেনে চলতে হবে তাই না? তাঁরা বলে গেছেন, নিবৃত্তিই হচ্ছে পথ। আর সে পথে যেতে হলে… তিনি নাগাড়ে বলে যান : প্রবৃত্তির কোনো কথাই নেই। বলেই চলেন বাবা–নিবৃত্তিই হচ্ছে আসল কথা। নেতি নেতি করে এগিয়ে যেতে হয় কেবল… বলে বাবা তাঁর নেতিবাদের বিস্তৃত বিশদ বিবরণ দেন।
বাবার নেতৃত্বে আমার পথের কোনো হদিশ না পেলেও শোনার মতন বাণী শোনা যায় বিস্তর।
শোনার জন্য যেমন, তেমনি শোনানোর জন্যও বাণীর দরকার জানি, আর, অলঙ্কার গড়তে গেলে সেই সোনাটাই ঝালিয়েও নিতে হয় আবার। যদিও ঝালমরা বাদ দিয়েই খাঁটি জিনিস পাই আমরা, তেমনি বাবার কাছে শোনাটা মার কাছে ঝালিয়ে নিতে যেতে হয়।
শুনেটুনে মা বলেন, তাই করগে যা তবে-যা বলেছেন তোর বাবা। নেতি নেতি করতে করতে নিবৃত্তির পথে এগিয়ে হাত-পা ছেড়ে দিয়ে নেতিয়ে পড় গিয়ে। তাহলে হাতে হাতে মোক্ষ লাভ হবে।
বাবা তো সেই কথাই বলছেন মা? মোক্ষের কথা, নির্বাণের কথাই।
সব জ্বলা আর জ্বালা চুকিয়ে দিয়ে নিবে যাবার কথা। মুলে গিয়ে হাবাৎ হওয়া? এই কথাই বলেছেন তো তোর বাবা?
তোমার কথাটা শুনে বাবা কি বললেন জানো মা?…কোনো কথাই বললেন না, কেবল মাইকেল, না না, মাইকেলের মেঘনাদ নয়। আরেক আর্তনাদ ছাড়লেন। বলে মহাকবির ফুলকেলির কথাটা আমি প্রকাশ করে দিই তাঁর কাছে।
ওর মধ্যেই তাঁর অজান্তে ঈশ্বরের কথাই দৈববাণীর মত উক্ত হয়েছে…উহ্য রয়েছে… মা জানান : ফুল বরং বৃত্তচ্যুত হয় কিন্তু ভগবানের বৃত্তচ্যুত হবার কোনো কথাই নেই। বৃত্তকে ধরেই তিনি কেন্দ্রমূল। সর্বদাই তিনি তাঁর প্রবৃত্তির পথে ধাবিত। ফুল তিনি ফোঁটাতেই থাকবেন, অফুরন্তই, বনও রমিত হবে বারংবার সে-প্রবৃত্তি তাঁর কোনো কালে ঘুচবে না। অলিকুলের মধ্য দিয়ে তাঁর মাধুশ্রী বৃত্তিও কোনোদিন যাবার নয়। তাহলে?
