তা তো হবেই। সে আর বলতে হয় না।
যেমন হয়ে থাকে, সভার একধারে হবে ডায়াস–সেখানে চেয়ার সাজিয়ে বসবেন ঐ সাহেবরা, গাঁয়ের গণ্যমান্য যতো লোক, রেকটার, হেডস্যার আর মাস্টার মশায়রা, এমনি আমার আন্দাজ। আর তার সামনে সারি সারি পাতা বেঞ্চে বসব শুধু আমরা যত ছাত্ররা।
ফি বছর বসে যেমন। তার আন্দাজে আমার ঢিল ছোঁড়া।
তুই বসবি গিয়ে একেবারে সামনের সারিতে, বুঝেছিস। পকেটে গুলিভরা পিস্তল নিয়ে। আর আমি বসব ঠিক তোর পেছনে–কয়েক সারি পিছনে–আমার পকেটেও থাকবে পিস্তল।
তোর পিস্তল কিসের জন্যে রে! তুই কাকে মারবি আবার? আমি ভেবে পাই না, ও বুঝেছি। পাছে আমার হাত কাঁপে, তাক ফসকে যায় যদি–তাকে শেষ করার জন্যেই বুঝি তুই…? মানে, আমার লক্ষ্য তেমন ঠিক হয়নি এখনও তোর ধারণা?
না, না, সেজন্যে নয়। সে বলে : তাক কেন ফসকাবে তোর? তোর নিশানা অব্যর্থ। আমি দেখেছি। না, সেজন্যে নয়…
তবে কিসের জন্যে? তোর পিস্তল আবার কেন তাহলে?
তোর জন্যেই রে। বলে সে একটুখানি হাসে।
তার হাসিটা আমার তেমন ভালো লাগে না। হেঁয়ালীর মতই লাগে কেমন! আমার জন্যে তার মানে? আমার পিস্তল তো রয়েছেই, তার ওপরে আবার কেন? আমারটা যদি কোন কারণে জ্যাম হয়ে যায়, যথা সময়ে গুলি না বেরয় যদি?
তোর পিস্তলটা যেমন তোর জন্যে, আবার ওই সাহেবটার জন্যেও যেমন, আমার পিস্তলটাও সেই রকম আমার জন্যেও-ফের আবার তোর জন্যেও তেমনি।
আমার জন্যও তেমনি? তার মানে?
তা আমি বলব না। মানা আছে বলবার। বলে সে একটুখানি ঢোঁক গেলে-সব কথা কি সবাইকে সব সময় বলা যায়?
আমি কি সবাইকার মধ্যে হলুম? আমি তোর বন্ধু না? ফোঁস করে উঠি : এক পার্টির ছেলে না আমরা?
বলতে পারি। গোপনে। কাউকে বলবি না বল?
বলব নে? এসব কথা কি বলাবলির?
যক্ষুনি তুই পুলিস সাহেবকে গুলি কবি, আর সে পড়ে যাবে-সেই মুহূর্তেই তোকে গুলি করতে হবে আমায়। বুঝেছিস? লীডারের এই হুকুম।
আমাকে মেরে ফেলবি! তুই! তার পিস্তলের তাক হবার আগেই যেন আমার তাক লেগে যায়।
আমি না মারলেও তোকে তো মরতেই হবে–তা কি তুই জানিসনে? গুলি করার পরই তো ধরা পড়ে যাবি। পুলিসের হাতে ধরা পড়বি তুই। চেনা ছেলে, সবাই তোকে চেনে, পালাবি কোথায়? আর ধরা পড়লেই তোর ফাঁসি হবে। হবে না?
তা হবে। তা হবে বটে। আমতা আমতা করে মানতেই হয় আমায়। কিন্তু তাই বলে ফাঁসি যাবার আগেই…এই ভাবে মারাটা…মারা যাওয়াটা… আমার কথা আটকে যায়। গলার কাছে দলা পাকিয়ে কি একটা যেন ঠেলে উঠতে থাকে। কান্নাই নাকি?
সেই তোকে মরতেই হবে। সেই মরবি কিন্তু পুলিসের হাতে অনেক মারধোর খেয়ে, অনেককে মেরে তার পরে মরবি-তার চেয়ে আগেই খতম হয়ে যাওয়াটা কি ভালো নয়? তোর পক্ষেও ভালো, দলের পক্ষেও।
দলের কাকে আমি মারতে যাচ্ছিলাম! কাউকেই তো চিনি না আমার দলের।
ধরা পড়ার পর থানায় নিয়ে পুলিস যা বেধড়ক মার লাগাত না, পুলিসের সেই পিটুনির বহর তো জানিসনে…জানলে তুই ঢের আগেই মরতে চাইতিস–নিজেকেই নিজে গুলি করে মরতিস। কিন্তু তখন আর সে উপায় নেই তোর। লেট হয়ে গেছে।
খুব মারে বুঝি পুলিস? থানায় নিয়ে গিয়ে খুব কষে ঠ্যাঙায়?
মারে না? নখের মধ্যে পিন ফুটিয়ে দেয়, কম্বলে মুড়ে রামধোলাই লাগায়, ঠ্যাং বেঁধে কড়িকাঠে লটকে ঝুলিয়ে রাখে…।
এই উলটো ফাঁসিটা কেন? আগের থেকে আসল ফাঁসির মহড়া দিয়ে রাখতেই নাকি?
কষে চাবকাবার জন্য, আবার কেন? তারও পরে আরো আছে…ন্যাংটো করে বরফের চাপড়ার ওপরে শুইয়ে রাখে…
ন্যাংটো করে? না না, ন্যাংটো হতে আমার ভালো লাগে না একদম।
প্রবল আপত্তি আমার খালি গা হতে লজ্জা করে ভারী।
তোর আপত্তি তারা শুনছে কি না। কারো লজ্জাফজ্জার ধার ধারে কি না তারা!
সতীশ বেআবরু করে। কেন, খালি গা হতে লজ্জাটা কিসের তোর? আমরা তো হেসটেলের ছেলেরা কেউ কেউ ফুটবল খেলার শেষে সন্ধ্যেবেলায় এসে পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ি গিয়ে-পাড়ের ওপর প্যান্ট-শার্ট সব খুলে রেখে-খালি গায়ে সাঁতার কাটি কেমন আমাদের কই লজ্জা করে না তো।
আহা, তোর মতন শরীর হত যদি–দেখাবার মত অমন-আমারও খালি গা হতে লজ্জা করত না তাহলে, ইচ্ছেই করত বরং। কিন্তু দেখছিস তো এই প্যাঁকাটির মতন চেহারা, হাড় বার করা জিরজিরে এই শরীর নিয়ে কেউ কি কারো সামনে খালি গা হতে চায়?
সে আমি জানি না ভাই, তবে শোয়বেই ওরা বরফের চাঙাড়ে। এবং একেবারে দিগম্বর করে- কিছুতেই ছাড়বে না। যার যা দস্তুর। বরফের ওপর শুতে কেমন লাগে জানিস?
খেতে তো ভালোই জিনিসটা, শুতে কেমন কে জানে! কখনো তো শুয়ে দেখিনি।
দেখতে পাবি বেঁচে থাকলে। টের পাবি হাতে হাতে তখন। দেখতে চাস নাকি?
না, কিন্তু শোয়াতে যাবে কেন তারা? তাতে লাভ তাদের? তারা তো সোজাসুজি নিয়ে আমায় ফাঁসিতে লটকে দিলেই পারে। শেষমেস তাই যখন লটকাবে, লটকাবেই ছাড়বে না, তখন তার আগে মড়ার ওপর এত খাঁড়ার ঘা মারাটা কিসের তবে?
কনফেসন আদায় করতে তোর। তোর দলে আর কে কে আছে তাই জানবার জন্যেই…
দলের কাউকেও তো আমি জানি না ভাই! কী জানাব? কার নাম করবো?
আমাকে তো জানিস। যন্ত্রণার চোটে আমার নামটা বলে দিবি নিশ্চয়। না বলে পারবি না। পার পাবি না। তখন তারা আমাকে পাকড়ে নিয়ে গিয়ে ওই সব কাভই করবে আবার। মারের চোটে আমিও বলতে বাধ্য হব তখন-যার নাম জানি তার। এই করে করে শেষ পর্যন্ত গোটা দলটাই ধরা পড়ে যাবে আমাদের। সেই কারণেই তোকে এই অঙ্কুরেই বিনাশ করা।
