কিসে তোমার প্রবৃত্তি শুনি?
প্রবৃত্তির প্রশ্নটা খট করে আমার মগজে এসে লাগে। মার কথাটা মনে পড়ে যায়…প্রবৃত্তির পথেই ভগবদ্গতি…আমাদের গতি ভগবানের দিকে, ভগবানের গতি আমাদের দিকে। উভয়ের গতিমুক্তি এক পথে–একসঙ্গে। একাধারে–এক ধারায়। ধারাবাহিক।
কিসে আমার প্রবৃত্তি বলব? আয়, আমরা হাতে-লেখা একখানা পত্রিকা বার করি। মাসিক কি ত্রৈমাসিক। আমার মতে সেই ভালো হবে তার চেয়ে। মাস মাস কি তিন মাস অন্তর বেরুবে কাগজটা। তাতে গল্প উপন্যাস কবিতা সব থাকবে। তুই লিখবি, আমি লিখব, হোস্টেলের আরো সব ছেলেরা লিখবে–বিষ্টু-টিষ্টু সব্বাই। ইস্কুলের লিথো মেশিনটা নিয়ে লিথো করেও বার করতে পারা যায়। কাগজটার নাম রাখা হবে অঞ্জলি। দেবী ভারতীর পায়ে অঞ্জলি আমাদের।
তোর মাথা! দেশের স্বাধীনতা আগে, না, ওইসব তোর ছাতমাথা? দেশ স্বাধীন হোক। সাহিত্যচর্চার ঢের সময় পাওয়া যাবে, কিন্তু ইংরেজ এখন জীবন-সঙ্কট লড়ায়ে বিব্রত, তাকে খতম করার এমন সুযোগ আর মিলবে না। জার্মানরা ওদিকে হারাবে তাদের, আমরা এদিক থেকে তাড়াব।
তার কথাটাও নেহাত ফেলনা নয়, ভেবে দেখি। ভেবে দেখতে হয়।
ভাবছিস কী? আমরা সবাই রণক্ষেত্রের সৈনিক এখন। লড়তে হবে এ সময়-লড়তে হবে, মরতে হবে, মারতে হবে। প্রাণ দিতে হবে, প্রাণ নিতে হবে-বুঝেছিস!
হ্যাঁ, প্রাণ দিতে হবে প্রাণ নিতে হবে-প্রাণ দেওয়া-নেওয়ার কথাই বটে। ভেবে দেখি, কথাটা রিনির ক্ষেত্রেও যেমন, রণক্ষেত্রেও তাই।
২. পার্শেলটা এল
২১.
অবশেষে একদিন পার্শেলটা এল।
স্কুলের পথে পোস্টাপিসে খবর পেয়েই মামার নামের ফর দিয়ে ফরফরিয়ে আমার সই করে সেটার ডেলিভারি নিয়েছি।
সটান চলে গেছি ইস্কুলে-সিঙ্গিয়ার আমবাগানের ভেতর দিয়ে শর্টকাট করে।
বাংলার সার সীতানাথবাবু ততক্ষণে এসে গেছেন ক্লাসে।
পার্শেলটা দেখেই না লাফিয়ে উঠেছে সতীশ। অবশ্যি, বসে বসেই যতটা লাফানো যায়সারের নজর বাঁচিয়ে।
কী আছে রে ওতে? জানতে চেয়ে ফিসফিসিয়েছে পাশের ছেলেটি।
ডিকসনারি। ফাঁস করেছি আমি। দেখবি নাকি? দেখতে চাস? খুলব?
শুনেই সে আর দ্বিরুক্তি করেনি, দ্বিতীয় বার তাকায়নি সেদিকে–নাড়ানাড়ি করা দূরে থাক।
খানিক বাদে বলেছে, বিয়ের আগে কোনো নারীঘটিত ব্যাপারে থাকতে নেই ভাই! বি এ পাশ করার আগে কি কেউ ডিকসনারি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে?
নারী আর ডিকসনারির মধ্যে মিলটা কোনখানে? আমি জানতে চেয়েছিলাম।
নাড়ির সম্বন্ধ নেই? তার পাল্টা জিজ্ঞাসা।
আমাদের ভেতরে সে একটু পরিপক্ক বলতে হয়, কেননা তার পুরুষ্টু গোঁফ বেরিয়েছিল, বিয়ে হয়েছিল দিন কতক আগে। (তখনকার দিনে পাড়াগাঁয়ে বাল্যবিবাহ চালু ছিল বেশ) হয়ত সেই কারণেই ডিকসনারি নিয়ে বাড়াবাড়ি করাটা সে পছন্দ করেনি।
আমি আর সতীশ আর কথা না বাড়িয়ে পিরিয়ড শেষ হওয়ার অপেক্ষায় রইলাম।
তারপরে পিরিয়ড কাবার হতেই স্কুল পালিয়ে সতীশ আর আমি চলে গেছি আমবাগানে পিস্তলের তাক বাগাতে।
ছায়াচ্ছন্ন নিরালা এলাকায় খোলা হল পার্শেল।
তিনটে পিস্তল এবং আরো কতকগুলো কী যে দেখা গেল তার ভেতরে!
তিনটে কেন রে? শুধালাম আমি সতীশকে।
এর একটা তোর, একটা আমার। তৃতীয়টা কার জন্যে কে জানে?
কেন, তুই জানিসনে?
লীডার জানে। বলেনি সে আমায়। আমিও জানতে চাইনি। সেরকম চেষ্টা করাও অন্যায়। শুধু জানিয়েছিল যে তিনটে আসবে মোটমাট।
আর এগুলো সব কি রে?
কার্তুজ। আমাদের টার্গেট প্র্যাকটিসের জন্যে।
এত কার্তুজ?
লাগবে না? সহজে কি কারো নিশানা দূরস্ত হয় নাকি? অবশ্যি প্র্যাকটিসের পরেও বেঁচে যাবে এর অনেক। পরে সেগুলো কাজে লাগাব আমাদের। আমাদের কিংবা আমাদের দলের।
সেই তৃতীয় ব্যক্তিটি প্র্যাকটিস করতে আসবে না?
তার হাত দূরস্ত আছে–আগের থেকেই। তাছাড়া সে যে কে তাও আমি জানিনা। লীডার আমায় জানাননি। টের পাবো সেই অ্যাকশনের দিন। কিন্তু হাড়ে হাড়ে টের পেলেও হয়ত তাকে দেখতে পাব না। মনে হোল বলতে গিয়ে একটা দীর্ঘনিশ্বাস যেন সে চাপল।
তিন তিনটে ঝকঝকে পিস্তল! বেশ দেখতে কিন্তু। আমি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখি।
তাকিয়ে দেখার পর তাক করে দেখতে লাগি তারপর।
হাত তৈরি হবার পর সতীশ একদিন এসে জানাল-এই শোন! আমাদের কষ্ট করে সদরেও যেতে হবে না আর। ম্যাজিস্ট্রেট কি পুলিস সাহেবকে জেলায় গিয়ে মারতে হবে না। এখানেই আসছেন তাঁরা কদিন বাদে আর।
তাই নাকি? আমি জানতে চাই–কেন আসছে রে?
দুজন না হলেও ওদের একজন তো আসবেই নির্ঘাত। খবর পেয়েছে আমাদের লীডার।
ইস্কুল ভিজিট করতে বুঝি?
তা নয়। মীটিং করতে এখানে। বিলেতে যুদ্ধ বেধেছে না? বাংলাদেশে বেঙ্গল রেজিমেন্ট তৈরি হচ্ছে সেইজন্যে। তার সোলজার রিক্রুট করতেই তাঁরা আসছেন। ইস্কুলের ছেলেদের কি এখানকার যুবকদের কেউ সেই সৈন্যবাহিনীতে যোগ দিতে চায় যদি।
বেঙ্গল রেজিমেন্ট? হ্যাঁ, দেখেছি বটে কাগজে। স্কুল-কলেজের অনেক ছেলে সৈন্যদলে নাম দিয়েছে তাও জানি।
এখন, আমাদের প্ল্যানটা কিরকম হবে শোন্। সভাটা হবে স্কুলের মাঝখানে ড্রিল মাঠে সামিয়ানা খাটিয়ে–যেমনটা হয়ে থাকে ফি বছর প্রাইজ বিতরণ উৎসবের সময়। তবে এবার জেলার ম্যাজিস্ট্রেট আর পুলিস সাহেব আসছেন না? তাই এবার আরো জমকালো হবে সভাটা।
