সতীশের কণ্ঠস্বর পৃথিবীর মতই উত্তর-দক্ষিণে চাপা হয়ে আসে তারপর–এমন কি পিস্তল-টিস্তলও আসতে পারে ঐ পার্শেলে। সেই খবর দিয়েছে ওই চিঠিতে।
পিস্তল! শুনেই আমি চমকে উঠেছি।–পিস্তল-টিস্তল কেন রে!
আমাদের টার্গেট প্র্যাকটিশের জন্যই, আবার কী রে? স্বদেশী ডাকাতি করতে হবে না। টাকার যোগাড় হবে কোত্থেকে? কলিগাঁয় ফকির সরকারের বাড়ি করব ডাকাতি। ওর ভারী মহাজন, অনেক টাকা ওদের।
না না। ওর বাড়ি না। কিছুতেই নয়, ওই ভদ্রলোক দারুণ ভালো। বইটই পড়তে দেয় আমায়–ওর বাড়ি ডাকাতি-টাকাতি নয়।
ঘাবড়াচ্ছিস? হয়তো তোদের বাড়িও করতে হতে পারে আমাদের। তখন তোকেও লাগতে হবে–থাকতে হবে আমাদের সঙ্গে। কালি-ঝুল মেখে মুখোশ পরে থাকবি, বাড়ির কেউ চিনতে পারবে না তোকে।…তোদেরও অনেক টাকা আছে, তাই না?
কাঁচকলা পাবি আমাদের বাড়ি। বাবার যা কিছু আছে সব কোম্পানীর কাগজে জমা রাখা। কাগজ কখানা পাবি কেবল। তবে হ্যাঁ, মার গয়নাগুলো নিতে পারিস। চাইলে মা হয়ত নিজের থেকেই দিয়ে দিতে পারে দেশের কাজে। কেড়ে নিতে হবে না।
টাকা নেই তো চলে কি করে তোদের? শুনি? তোর বাবা তো কোনো চাকরি-বাকরি করেন না।
রাজ এস্টেট থেকে মাসোহারা আসে না বাবার? মাস মাস আসে টাকা। তাতেই আমাদের চলে যায়। তার থেকেও বাবা জমায় আবার। কোথায় রাখে আমার জানা আছে। মাঝে মাঝে বাবার অজান্তে সেখান থেকেও হাত সাফাই করি–ধরতে পারে না বাবা। খেয়ালই করে না বোধ হয়।
যাক গে, ই যখন পাটির, তোদের বাড়ি ডাকাতি হবে না নিশ্চয়। তার আগে তো টার্গেট প্র্যাকটিশ করে হাত-টাত পাকাতে হবে আমাদের।
হাত পাকাবি কোথায়?
কেন, সিঙ্গিয়ার আমবাগানে। হাজার হাজার গাছের আওতায় নিশ্চিন্তে প্র্যাকটিশ করা যাবে। নির্জন জায়গা, কেউ বড় একটা সেখোয় না ওর ভেতর-গুলিটুলির আওয়াজ কারো কানে যাবে না।
যেখানে আম পাকে সেখানেই হাত পাকাবি? তাহলে ভাই আমের সময়টাতেই পাকানো যাবে না-হয়। পাকা আমের দিকে তাক করে লাগালে দু-একটা আম গালে এসে পড়তেও পারে, চাই কি?
সেই সুখেই থাক! আমার কথাটা সে এক কথায় উড়িয়ে দেয়।
কিন্তু এক কথায় পাকা আমের অত বড়ো বাগান ওড়ানো যায় না–আমি আবার তাকে বাগাতে লাগি : ইসব ফলন্ত আম গাছের সামনে দাঁড়িয়ে লোভ সামলাতে পারবি তুই? তোর হাতের তাক তো আমি জানি। শুধু ঢিলিয়েই তুই ফজলি আম নামিয়ে আনিস। পিস্তলের নিশানা না জানি তোর আরো কতো জোর হবে। আর সিঙ্গিয়ার বাগানে কী সব আম রে ভাই! আমের তার আর তার হাতের আরিফ একবাক্যে করে আমি ওর আমড়াগাছি করি।
সে কিন্তু টলে না একদম। বলে যে, হ্যাঁ, সেইজন্যেই আনা হচ্ছে কিনা পিস্তল! আম পাড়বার জন্যে আনছি কিনা আমরা! সে বলে বিলেতে যে একটা জোর লড়াই বেধেছে খবর রাখিস তার? ইংরেজ জার্মানীর যুদ্ধ হচ্ছে জানিসনে?
জানব না কেন? আসে তো খবর কাগজ আমাদের বাড়ি। হিতবাদী, অমৃতবাজার দু-ই আসে। সব খবর পাই আমরা। কিন্তু তার সঙ্গে আমাদের কী! কোথায় বিলেত আর কোথায় আমরা। কার সঙ্গে কার লড়াই আর আমরা কোনখানে।
কী বোকা রে! তার চোখে কৃপাকটাক্ষ। আরে, আমাদের স্বাধীনতা লাভের এই তো মোকা রে! ইংরেজ জার্মানীর সঙ্গে লড়ায়ে বিব্রত–এই সুযোগে আমরাও তৈরি হবো এদিকে।
রণক্ষেত্রের সৈনিক না আমরা? আমাদের অ্যানার্কিস্ট পার্টি ভারতজোড়া, জানিসনে? শুনেছি এক-আধটু। পড়েওছি খবর কাগজে।
এ সব কথা থাক এখন। কদিন বাদে পিস্তলের পার্শেলটা আসবে। কটা পিস্তল আসে কে জানে! ইস্কুলে আসার পথে রোজ খবর নিবি পোস্টাপিসে–এলেই ডেলিভারি নিবি। আর নিয়েই না, সোজা চলে আসবি ইস্কুলে। ইস্কুল পালিয়ে তারপর প্রতিদিন দুপুরে আমাদের পিস্তলের মহড়া শুরু হবে ওই বাগানে-সেদিন থেকেই। বুঝেছিস?
পিস্তল নিয়ে লড়তে হবে বলছিস? কিন্তু লড়বি কার সঙ্গে শুনি? তাহলে তো সেই যুদ্ধক্ষেত্রেই যেতে হয় আমাদের, ওই বিলেতেই।
কেন, ইংরেজের সঙ্গে লড়ব আমরা। এখানেই লড়াই করব। সারা ভারতই আমাদের রণক্ষেত্র। সর্বদাই আমাদের সংগ্রাম।
এখানে ইংরেজ কোথায় রে, এই গাঁয়? আমি শুধাই–এই অজ পাড়াগাঁয় কই তোর ইংরেজ?
ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব নেই? পুলিস সাহেব নেই জেলার? সেখানে গিয়ে মেরে আসতে হবে তাদের। লীডারের হুকুম হলেই যেতে হবে আমাদের।
না ভাই, ওসব খুনোখুনি কাণ্ড আমার ভালো লাগে না। আমার আপত্তি : পুলিস সুপারকে প্রাণে মারলে মেম-সুপারির প্রাণে লাগবে না? কাঁদবে না তাঁর ছেলে-সুপাররা? মেয়ে-সুপারিরা? না… মানুষ মারবে কেন মানুষকে? মারবার জন্যে তো মানুষরা হয়নি। ভালোবাসাবাসির জন্যেই হয়েছে।
সব মানুষকে কি ভালোবাসা যায়? ওরা আমাদের ছেলেদের ধরে ধরে গুলি করে মারছে না! লটকে দিচ্ছে না ফাঁসিতে? তুই বল?
হ্যাঁ, সব মানুষকে ভালোবাসা যায় না, তা ঠিক। মানতে হয় আমায়-তবে মানুষের মধ্যে যারা রূপসী মানুষ তাদের ভালো না বেসে পারা যায় না। সেইসব মানুষের ভালোবাসার জন্যে আমরা সব সময় উপোসী। তাদের রূপের উপাসনা করি আমরা।
তোর ওই সব রূপসী মানুষ উপোসী মানুষের ফাতরা কথা যত রাখ তো। দেশের স্বাধীনতা তুই চাস কি চাস না?
নিশ্চয়ই চাই। কিন্তু ওইসব খুনখারাপি না করে…না ভাই, কাউকে খুন করতে আমি পারব না। ওতে আমার একদম প্রবৃত্তি হয় না।
