তােদের দল! ক্রিকেট ফুটবলের টীম যদি হয়… আমার সাফ কথা–না ভাই, তার মধ্যে আমি নেই। ঐ সব খেলাধুলায় হাত পা ভাঙতে পারব না আমি। ওসব আসেও না আমার, ভালােও লাগে না। তবে তা, যদি টেনিস কি ব্যাডমিনটন হয়…
আরে না না, সেসব কিছু নয়। তার ভেতরে প্যাট্রিয়টিজমের কী আছে? একেবারে অন্য জিনিস। আনকোরা আরেক ব্যাপার।
ব্যাপারটা কী শুনি?’
তুই আমাদের বিপ্লবীদের দলে আসবি?
বিপ্লবীদের দল? সে আবার কী রে?
কেন, জানিসনে? ক্ষুদিরাম কানাইলালের কথা শুনিসনি নাকি? ফাঁসি হয়ে গেছে যাদের?
দেশােদ্ধারের দল? জানি বইকি। আছে একটা দল ওরকম। খবরের কাগজ পড়লেই জানা যায়। খবর বেরয় বটে মাঝে মাঝে।
আসবি তুই সেই দলে? খুব গােপন কিন্তু। বলবিনে যেন কাউকে।
কী করতে হবে আমায়?
তাের কথা আমাদের লীডার বলছিল একদিন। দলে তােকে পাওয়া যায় কিনা চেষ্টা করে দেখতে, তাের মতন একটা ছেলেকে আমাদের দরকার খুব!
লীডারটা কে শুনি?
তা বলব না। অ ই জানতে চামনে। জানতে পারি না কোনােদিন। আমাদের দলে
কে কে আছে তাও না। তুই শুধু আমাকেই জানবি, আমি তোকে রিক্রুট করলাম তো? লীডারের অর্ডার আমার মারফতেই পাবি তুই। সেই মতন তোকে কাজ করে যেতে হবে।
আমি ভেবে দেখি ওর কথাটা। অভিরামের দ্বীপান্তর মা, ক্ষুদিরামের ফাঁসি। বিদায় দে মা ঘুরে আসি। মনে পড়ে মুকুন্দদাসের যাত্রার পালা গানও। জাগো জাগো জননি, আসিছে নামিয়া ন্যায়ের দণ্ড রুদ্র দীপ্ত মূর্তিমান–সাবধান সাবধান! মনে পড়ল কত কথাই।
কাজটা কী করতে হবে শুনি আমায়?
সেন্টার থেকে চিঠি আসবে লীডারের-আসবে তোর নামে–দলের আরো বড় লীডারের চিঠি। সেসব চিঠি খুব দরকারী, কিন্তু তার ভারী রিকস। আমাদের হোস্টেলের ছেলেদের চিঠিপত্র সব পুলিসে খুলে দ্যাখে কি না! ডাকঘরেই দেখে নেয় টিকটিকিরা। তোর নামে, তোর একটা দলীয় নাম দেব আমরা, সেই নামে যেসব চিঠিপত্র, পার্শেল-টার্শেল আসবে, একদম তুই না খুলে সেসব তুলে দিবি আমার হাতে। আমি গিয়ে লীডারকে দেব। আপাতত এই কাজ।
তারপর?
তারপর, পরে তোকে যা করতে বলা হবে, করতে হবে। ইতস্ততঃ করা চলবে না। কিন্তু সে পরের কথা পরে, এখন…
আমার চিঠিপত্র খুলবে না পুলিস?
তোর বাবার কেয়ার অফ-এ আসবে তো? সন্দেহ করবে না পুলিস। তোর বাবা বয়স্ক লোক, গণ্যমান্য মানুষ–তিনি কি আর এইসব বিপ্লবী দলে থাকতে পাবেন–ভাববে তারা। বুঝেছিস এখন? কেমন, রাজী তো! কথাটায় কি রকম বরামাঞ্চ বোধ করি। সঙ্গে সঙ্গে রাজী হয়ে যাই। প্যাট্রিয়ট হবার বাসনা প্রকাশের সাথে সাথেই প্যাট্রিয়টের মত কাজ করার এই সুযোগ! সৌভাগ্য বলেই মনে হয় আমার।
দুদিন বাদে সতীশ এসে বলল, তোর নাম দেওয়া হয়েছে সুরেন। দলীয় নাম।
আরে! সুরেন যে আমার মামার নাম রে! সুরেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী।
ভালোই হলো আরো। ঐ নামই রইলো তোর তাহলে। বলে চলে গেল সতীশ।
আমিও ভাবলাম, মন্দ কি! নরাণাং মাতুলক্রম বলে নাকি, আমার যদি নামের দিক দিয়েই সেই উপক্রম হয় তোত ধারাবাহিকতাই বজায় থাকে তার।
দিনকতক বাদে একটা চিঠি এল মামার নামে-খামের চিঠি-বাবার কেয়ার অফে, ইস্কুল থেকে ফিরে জানলাম মার কাছে।
মা বললেন, এ কী চিঠি এসেছে রে সুরেনের নামে, দ্যাখ দেখি। এক বর্ণও বোঝা গেল না তার।
খুললে কেন চিঠিটা? খুলতে গেলে কেন? মামার চিঠি, দেখছ না?
সুরেন তো রাজাপুরেই এখন, তার বাড়িতেই। কোনার ঠিকানায় না লিখে এখানে আবার তাকে লিখলো কে, কলকাতার থেকে খুদিদি, তোর বড় মাসীই হয়তো লিখে থাকবে, মনে। করেছে সে এখেনেই আছে এখো-তাই ভেবেই, খবরটা কী, আর খুলে দেখতে গেছি। কিন্তু দেখছি, এ তো একটা আঁক। কী আঁক কে জানে?
ইকোয়েশনের আঁক বলে ঠাওর হচ্ছে। তার সঙ্গে ফ্রাকশন ট্রাকশন ডেসিমেল সিঁড়ি ভাঙা সব মিশিয়ে বিদঘুঁটে এক বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ড!
এ আঁক তুই জানিসনে?
কোনো জন্মে না। কাবিল হোসেন জানে। কিন্তু তাকে তো এই চিঠি দেখানো যাবে না যার চিঠি তার হাতে দিতে হবে।
কার চিঠি শুনি?
সে একজনের। শুনলে তুমি কিচ্ছু বুঝতে পারবে না। বলে চিঠিখানা হাতিয়েই আমি সরে পড়ি।
সতীশকে চিঠিখানা দিই গিয়ে। খাম খোলা দেখেই সে খাপখোলা তরোয়ালের মতই ঝলকে উঠেছে : খুলেছিস কেন?
আমি খুলেছি নাকি? মামার চিঠি মনে করে–মামাকে লেখা মাসির চিঠি তাই ভেবে না খুলে দেখেছে মা। দেখেও বুঝতে পারেনি কিছু। যা বিচ্ছিরি আঁক একখানা–তার ভেতর নাক গলায় সাধ্য কার। এক সাথে আমি মার আমার সাফাই গাই-মনে হচ্ছে মা আমার মতই অঙ্কে দিগগজ। আমারই মা তো!
মোটেই তোমার আঁক নয়, সাঙ্কেতিক ভাষায় লেখা। লীডার বুঝবে। এই না বলে সে দ্বিরুক্তি না করে চিঠিখানা নিয়ে চলে যায়। কোথায় যায় কে জানে!
রাত্রে তাদের হোস্টেলে গেলে সে জানায়–লীডার ভারী রাগ করেছে। এরপর থেকে ইস্কুলে যাবার পথে রোজ তুই পোস্ট আপিস হয়ে যাবি। জানবি তোর মামার নামে চিঠিপত্তর পার্শেল-টার্শেল টাকাকড়ি মনিঅর্ডার-টর্ডার এসেছে কিনা। এলে ফর দিয়ে সই করে নিয়ে সোজা চলে আসবি ইস্কুলে।
মনিঅর্ডার টাকাকড়িও আসবে নাকি আবার? শুনে আমার উৎসাহ হয়।
এলেই বা! তাতে তোর আমার উৎসাহিত হবার কিছু নেই। বেল পাকলে কাকের কী পার্টির টাকা–দলনেতাকে গিয়ে দিয়ে দিতে হবে তক্ষুনি।
