আরে না না, সেসব কিছু নয়। তার ভেতরে প্যাট্রয়টিজমের কী আছে? একেবারে অন্য জিনিস। আনকোরা আরেক ব্যাপার।
ব্যাপারটা কী শুনি?
তুই আমাদের বিপ্লবীদের দলে আসবি?
বিপ্লবীদের দল? সে আবার কী রে?
কেন, জানিসনে? ক্ষুদিরাম কানাইলালের কথা শুনিসনি নাকি? ফাঁসি হয়ে গেছে যাদের?
দেশোদ্ধারের দল? জানি বইকি। আছে একটা দল ওরকম। খবরের কাগজ পড়লে জানা যায়। খবর বেরয় বটে মাঝে মাঝে।
আসবি তুই সেই দলে? খুব গোপন কিন্তু। বলবিনে যেন কাউকে।
কী করতে হবে আমায়?
তোর কথা আমাদের লীডার বলছিল একদিন। দলে তোকে পাওয়া যায় কিনা চেষ্টা করে দেখতে, …তোর মন একটা ছেলেকে আমাদের দরকার খুব!
লীডারটা কে শুনি?
তা বলব না। তা ই জানতে চাসনে। জানতে পাবি না কোনোদিন। আমাদের দলে অতটা উন্নাসিক হওয়া কি ভালো? কিন্তু তা না হলে তো আমার আধ্যাত্মিক উন্নতির একেবারেই কোনো আশা নেই দেখছি।
ভগবান যেমন বিন্দুমাত্র, ভগবানকে ডাকার প্রয়োজনও তেমনি মুহূর্ত মাত্রই। গোশৃঙ্গে সর্ষপ, মানে গোরুর শিঙের ওপর সর্ষে রাখলে যতক্ষণ থাকে ততটুকুর জন্যই ভগবানে মন দিলে, মন দিয়ে তাঁর মন পেলেই ঢের। তার ফলে যে গতিলাভ হয়, যেদিকে যাবার প্রবৃত্তি হয়, তিনি যেদিকে নিয়ে যান সেইটেই হোলো তোর ভগবতি। খুব সহজ ব্যাপার। এত সহজে আর কিছু হয় না। প্রায় নিশ্বাস-প্রশ্বাসের মতই।
মার মতে, আমার মনে হোলো যে, ঐ নাকই দেখতে হবে বটে, তবে কিনা একটু ঘোরালো পথে। প্রায় ঘুরিয়ে নাক দেখার মতই। বৃত্তির পথে, প্রবৃত্তির পথেই যেতে হবে আমায় ভগবানকে পেতে পেতে। এক সেকেন্ড মাত্র ভগবানকে দিয়ে তার পর থেকে খালি সেকেন্ডহ্যান্ড ভগবানকে পাওয়া। সবার সঙ্গে তার সাথে সাথে চলা। যেতে যেতে আদানে-প্রদানে তাঁকেই দিতে দিতে পেতে পেতে যাওয়া।
বাবা যে বলেছে মা, ভগবানকে পাওয়া নাকি সোজা না। অনেক সাধনার দরকার। বাবার কথার পুনরাবৃত্তি আমার।
ভগবান যদি মা হন তাহলে কি তাঁকে সাধ্যসাধনা করতে লাগে? মাকে তো এমনিতেই পাই-ছেলে হয়ে জন্মানোর সাথে সাথেই। আমরা তো সবাই স্বয়ংসিদ্ধ তো। আজন্ম সিদ্ধি আমাদের। সাধনা যদি করতে হয় তো প্রবৃত্তির সাধনাই করতে হবে-বুঝেছিস? আমৃত্যু সেই সাধনা, জন্মজন্মান্তরের। তোর প্রবৃত্তি কী, মনের ঝোঁকটা কোনদিকে তোর, সেইটে তুই বার কর আগে।
মাথা ঘামাতে লাগলাম আমি তারপর। কোনদিকে মনের ঝুঁকি, মনের মধ্যে মাথা ঠুকি। ঠুকে ঠুকে মরি।
মনের ভেতর দিয়েই যদি ভগবানের প্রেরণা মেলে, তাহলে তাঁকে ডাকতে গেলে যেসব দিকে মন খেলে ( ভগবান নিজেই খেলিয়ে দেন কিনা কে জানে?) সেই দিকেই কি মনের ঝোঁক আমার? বুঝতে হবে তাই?
কী হতে চাই? কী করতে চাই আমি? মাথা খেলাই।
সেদিন ক্লাসে হেড স্যার শুধিয়েছিলেন সবাইকে– কে কী হতে চাই আমরা?
হেড স্যার কান্তিভূষণ ভট্টাচার্য ইংরেজি পড়াতেন আমাদের। এমন জলের মতন বোঝাতেন, এমন চমৎকার পড়াতেন যে, দৌলতপুর কলেজের প্রিন্সিপাল কামাখ্যাচরণ নাগ মশাই আমাদের ইস্কুলে রেকটর হয়ে যোগ দেবার সময় তার সেরা ছাত্র কান্তিবাবুকে হেডমাস্টার করে নিয়ে এসেছিলেন তাঁর সঙ্গে।
একমনে পড়িয়ে যেতেন তিনি, আজেবাজে কথা কইতেন না একদম।সৌম্যদর্শন ছিপছিপে চেহারার গুরুগম্ভীর মানুষ। হঠাৎ সেদিন তিনি পড়ার বাইরে ঐ প্রশ্নটা করে বসলেন কেন যে! কেউ বললে সে ডাক্তার হবে, কেউ বললে যে বিজনেস করবে, কেউ হবে অ্যাডভোকেট–এমন কতোজন কতো কী।
আই ওয়ান্ট টু বি এ প্যাট্রিয়ট। আমায় শুধাতে জবাব দিয়েছিলাম।
আমাদের বাড়িতে অর্ধসাপ্তাহিক অমৃতবাজার পত্রিকা আসত দেশপ্রেমের বান ডাকত সেই কাগজে। প্যাট্রিয়ট-ঐ শক্ত কথাটা সেখান থেকেই শেখা আমার। অবশ্যি, ফিলনথ্রপিস্ট–কথাটাও ততদিনে জানা হয়ে গেছে ঐ কাগজের কল্যাণেই। হারের জবাবে ঐ প্যাট্রিয়টই জিভের গােড়ায় এসে গেল। হেডস্যারের জবাবে ঐ গালভরা কথাটাও আমি আওড়াতে পারতাম, কিন্তু কেন জানি না, ঐ প্যাট্রিয়টই জিরে গােড়ায় এসে গেল। ফিলানথ্রপিস্ট হতে গেলে অনেক কাঠখড় পােড়াতে লাগে, অর আগে বহু কষ্ট করে বড়লােক হতে হয়, তারপরেই না বিশেষ উপকার করতে বেরুনাে ? কিন্তু ঐ প্যাট্রিয়ট হওয়াটা তার চেয়ে ঢের সােজাই যেন! সারা জীবন দিলে তাে কথাই নাই, সােজাসুজি প্রাণটা দিলেও হওয়া যায়।
কিংবা দেশের ভাবনায় ভাবিত ঐ অর্থ সাপ্তাহিকের গরম গরম সম্পাদকীয় বা সংবাদের পৃষ্ঠা পাঠেই বুঝি আমি অনুপ্রাণিত হয়ে থাকব। অথবা বাবার বইয়ের ভাঁড়ার থেকে বাগান যােগীন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনা ম্যাজিনি-গ্যারিলডির জীবনকাহিনীর থেকেও হয়ত প্রেরণা পেয়ে থাকতে পারি।
কান্তিবাবু আর কোনাে ছেলের উচ্চাশা সম্পর্কে বিশেষ উচ্চবাচ্য না করে আমার বিষয়ে কিবা এই প্যাট্রয়টের বিষয়েই বেশ কিছু বলেছিলেন মনে আছে। প্যাট্রিয়ট কাকে বলে, প্যাট্রিয়টিজম কী, কী বা তার দায় ধাক্কা আর যেন একটুখানি আঁচ পেয়েছিলাম তাঁর কথায়। সেদিন ইস্কুলের ছুটির পর আমাদের ক্লাসের ছেলে সতীশ আমায় পাকড়ালাে।
আয়, এখানে বসি একটা কথা আছে তাের সঙ্গে।
ড্রিলের মাঠটায় আমরা বসলাম।
প্যাট্রয়ট হতে চাস বলছিলিস না তুই ? তাই ভাবলাম, তােকে তাে আমাদের দলে নেওয়া যায় তাহলে। চাপা গলায় বলল ও।
