এখন মনে পড়ছে মা? আমি উসকে উঠি-নিবৃত্তির কথাটা বাবার মুখেই আমি শুনেছিলাম যেন।
যা, তবে তোর বাবার কাছ থেকেই ভালো করে জেনে আয়গে।
শুনেই আমি তক্ষুনি এক ছুটে চলে যাই বাবার কাছে, আর পরমুহূর্তে টেনিস বলের মতন বেয়ারিং পোস্টে ফেরত চলে আসি মার কোর্টে। বাবা বলছেন–সংস্কৃত শ্লোক-টোক
কী সব আউড়ে যেন বললেন, যার মানেটা হচ্ছে যে প্রবৃত্তিরেষা ভূতানাম, অর্থাৎ কিনা, ভূতদের এইরকমই প্রবৃত্তি বটে, কিন্তু নিবৃত্তিইে নাকি রয়েছে মহাফল। ভূত কী মা?
ভূত কী, তা তুই জানিসনে?
আমিই তো, তাই না? তুমি তো আমায় ভূত বলে ডাকো একেক সময়, হনুমান কথাটা খুঁজে পাও না যখন। আমরাই তো:ভূত মা, তাই না? মারা যাবার পর প্রেত হয়ে যাব সবাই।
তোকে বলেছে! হাসলেন মা-মরবার পর তোকে প্রেত হতে হবে না কখনো–মা তা হতে দেবেন না। মায়ের পেটে জন্ম নিবি তক্ষুনি আবার।
অবশ্যি মার যদি, মানে তোমার যদি তাই অভিপ্রেত হয়। সে তো আর আমার ইচ্ছের ওপর নয়।…কিন্তু মহাফলটা কী জিনিস, যা নাকি নিবৃত্ত হলে মেলে?
কাঁচকলা!
বেলও তো হতে পারে? আমি বলি-বাবা যখন বেল খান রোজ রোজ?।
হ্যাঁ, তা হতে পারে? তবে সন্ন্যাসী হয়ে ন্যাড়া না হতে পারলে তো আর বেলতলায় যাওয়া যায় না রে! তুই কি তাহলে সন্নিসী হতে চাস?
কক্ষনো না। জটাজুট রেখে ছাইভস্ম মেখে কী লাভ? আমি তোমার ওই প্রবৃত্তির পথেই রয়েছি সব সময়।…কিন্তু মা, তোমার ওই প্রবৃত্তির কথাটা বাবাকে যখন বললাম না, শুনেটুনে বাবা কী বললেন জানো মা? বললেন যে, তোর মার কথাটা বিলকুল দর্শনবিরুদ্ধ। আমাদের কোনো দর্শনশাস্ত্রে এমন কথা বলে না।
দর্শন-টর্শন জানিনে, ষড়দর্শন পড়িনি কখনো। এটা হচ্ছে আমারনিজস্ব দর্শন–আমি নিজে যা দেখেছি, যা দেখছি–তাই। মা জানান-এখন বল তো তোর আসল প্রবৃত্তিটা
কোন্ দিকে? কোনদিকে তোর মনের ঝোঁক, বল দেখি আমায়?
বলব? বলব মা?… বলতে গিয়ে আমি আমতা আমতা করি, রিনির নামতা আওড়াতে পারি না কিছুতেই
বলল মা? আমার ঝোঁক খালি তোমার দিকে, তোমাকেই আমি দেখি তো। তোমাকেই দেখেছি, দেখছি সব সময়। বলে দৃষ্টান্তস্বরূপ আমার কথাটায় আরো একটুখানি জোর লাগাই : এটা হচ্ছে আমার নিজস্ব দর্শন।
.
২০.
ভগবদ্দর্শনের প্রশ্নটা বাবার কাছেও পেড়েছিলাম আমি।
বাবা বলনে, ধ্যানের দ্বারা ধরা যায়। ধ্যাননেত্রেই তিনি প্রত্যক্ষ হন। আর ধ্যানে বসতে হলে? এমনি করে পদ্মাসনে নাসিকাগ্রে দৃষ্টি নিবদ্ধ ক বসতে হবে–একটানা, যতক্ষণ পারো। বলে তিনি দৃষ্টান্তস্বরূপ হতেন।
এদিকে পদ্মাসনে বসাটা তেমন সোজা নয়, বসতে গেলে উটে পড়তে হয়। আর উলটে যদি নাও পড়ি নেহাত, অমন আড়স্টভাবে বসে থাকাটাও কস্টকর। ওর চাইতে কুশাসনে বসাটাও ঢের সুখের। তাছাড়া ঐভাবে বসে ভগবানের ধ্যান করতে গেলে নাস্ত্রে ডগায় আনব কি, আমার সবটা মনগিয়ে যন্ত্রণাকাতর পায়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। সেইখানেই ওতপ্রোত হয়ে। মৈনাকের শিখরদেশ থেকে মনের এই পদস্খলনের গতিরোধ করা যায় না।
মাকে কথাটা বলায় তিনি বললেন-তোর বাবার যেমন! নাকের ওপর নজর রেখে জড়ভরতের মত ল্যাজেগোবরে হয়ে বসে থেকে কী লাভ? ভগবান কি ঐ নাকের মাথায় রয়েছেন যে দেখা দেবেন? কুশাসন কেন, তুমি আরাম করে কুশানে কি ইজিচেয়ারে বসে ডাকো না, কি বিছানায় শুয়ে ঠ্যাং-এর ওপর ঠ্যাং তুলে। মন দেওয়া নিয়ে কথা, নাক দেখানো নয়।
বেশিক্ষণ ডাকাই যায় না ভগবানকে, ভালও লাগে না ডাকতে। আমি জানাই। তাছাড়া, ঐ নাক নিয়ে মানে, নিজের নাক নিয়ে মাথা ঘামানো আমার একদম ভালো লাগে না। ফিলানথ্রপিস্ট-কথাটাও ততদিনে জানা হয়ে গেছে ঐ কাগজের কল্যাণেই। হেডস্যারের জবাবে ঐ প্যাট্রিয়টই জিভের গোড়ায় এসে গেল। হেডস্যারের জবাবে ঐ গালভরা কথাটাও আমি আওড়াতে পারতাম, কিন্তু কেন জানি না, ঐ প্যাট্রিয়টই জিভের গোড়ায় এসে গেল। ফিলানথ্রপিস্ট হতে গেলে অনেক কাঠখড় পোড়াতে লাগে, তার আগে বহু কষ্ট করে বড়লোক হতে হয়, তারপরেই না বিশ্বের উপকার করতে বেরুনো? কিন্তু ঐ প্যাট্রিয়ট হওয়াটা তার চেয়ে ঢের সোজাই যেন! সারা জীবন দিলে তো কথাই নাই, সোজাসুভি প্রাণটা দিলেও হওয়া যায়।
কিংবা দেশের ভাবনায় ভাবিত ঐ অর্ধ সাপ্তাহিকের গরম গরম সম্পাদকীয় বা সংবাদের পৃষ্ঠা পাঠেই বুঝি আমি অনুপ্রাণিত হয়ে থাকব। অথবা বাবার বইয়ের ভাড়ার থেকে বাগানে যোগীন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনা ম্যাজিনি-গ্যারিলডির জীবনকাহিনীর থেকেও হয়ত প্রেরণ পেয়ে থাকতে পারি।
কান্তিবাবু আর কোনো ছেলের উচ্চাশা সম্পর্কে বিশেষ উচ্চবাচ্য করে আমার বিষয়ে কিংবা ওই প্যাট্রিয়টের বিষয়েই বেশ কিছু বলেছিলেন মনে আছে। প্যাট্রিয়ট কাকে বলে প্যাট্রিয়টিজম কী, কী বা তার দায় ধাক্কা তার যেন একটুখানি আঁচ পেয়েছিলাম তার কথায়
সেদিন ইস্কুলের ছুটির পর আমাদের ক্লাসের ছেলে সতীশ আমায় পাকড়ালো।
আয়, এখানে বসি একটু। কথা আছে তোর সঙ্গে।
ড্রিলের মাঠটায় আমরা বসলাম।
প্যাট্রিয়ট হতে চাস বলছিলিস না তুই? তাই ভাবলাম, তোকে তো আমাদের দলে নেওয়া যায় তাহলে। চাপা গলায় বলল ও।
তোদের দল! ক্রিকেট ফুটবলের টীম যদি হয়… আমার সাফ কথা-না ভাই, তার মধ্যে আমি নেই। ঐ সব খেলাধুলায় হাত পা ভাঙতে পারব না আমি। ওসব আসেও না আমার, ভালোও লাগে না। তবে হ্যাঁ, যদি টেনিস কি ব্যাডমিনটন হয়…
