বেদব্যাসের মহাভারত-জানি মা আমি। সায় দিই মার কথায়। সেই মহাভারত কী? ঈশ্বরের কথাই তো। তাঁর লীলাকাহিনী। ভগবান ভূতলে নরদেহ নিয়ে নেমেছেন-বিচিত্র দেহরূপে স্নেহরূপে তাঁর সেই রসায়ন। যেমন তাঁর কথা তেমনি আমাদের জীবনকথাও আবার। ঐ মহাভারতই আমাদের জীবনে কোনো না কোনো রূপে কখনো না কখনো ঘটছেই। ঘটবেই।
আমাদের জীবনবৃত্তান্তই লিখে গেছেন সেই মহাকবি? কবি বেদব্যাস?
আবার একালের তোর ওই রবিঠাকুরও সেই বেদব্যাসেরই আরেক রূপ। আরেক দেহরূপ স্নেহরূপ সেই তাঁরই। তাঁর রচনাও অন্য এক মহাভারত। গীতাঞ্জলি পড়েছিস তো? কী সেটা? ভগবানের কথাই না?
হ্যাঁ মা। আবার তোমার রিনিও তাই। তাই না মা? রিনি অবশ্যি ভগবানের কথা কয় না, কিন্তু তাহলেও সেও ঐ ভগবানের কথাই। ভগবানের শেষ কথাই সে, আমার বোধ হয়।
যা বলিস! এই জীবনবৃত্তেই মরলোকে নরদেহী ঈশ্বরের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। তা ছাড়া ঈশ্বরদর্শনের আর কোনো উপায় নেই। বুঝেছিস?
মার মোদ্দা কথাটা যা আমার মগজে ঢুকেছিল তা হচ্ছে এই যে, আমাদের জীবনের সব কিছুর কেন্দ্রেই তিনিই মূল। সেই কেন্দ্রমূল থেকে বোধের ব্যাস নিয়ে বৃত্তে এসে তিনি কাত হয়েছেন–তাঁর মুলাকাত পেতে হলে সেই বৃত্ত পথে–আমাদের প্রবৃত্তি পথেই যেতে হবে–নানা বৃত্তের নানান বৃত্তান্তে পদে পদে তাঁর সাক্ষাৎ পাব। নইলে তিনি মূলে হাবাৎ। কেবল মূলে তাঁর খোঁজ পেতে গেলে তিনিও নেই। আমরাও নাস্তি!
বহুরূপে সম্মুখে তোমার…এই জন্যেই বিবেকানন্দ বলে গেছেন, তাই না মা?
হ্যাঁ, তাই। ফলেন পরিচীয়তে-বলে না? সবকিছুর প্রমাণ হচ্ছে তার ফলে-ফলোভে। ঈশ্বর কল্পতরু আর কল্পতরুর প্রমাণ তার ফলেই তো মিলবার? তাই না?
হাতে হাতেই পাবার তো মা? আম লিচু যেমনটা আমি পাই?
নিশ্চয়! নইলে পরিচয়টা হবে কি করে? তাঁকে ডেকে তুই তোর কল্পিত ফল, এমনকি তোর অকল্পিতও যা–যদি তুই কল্পনাতীত ভাবে পেয়ে যাস, তাহলে সেটাই, ঈশ্বর যে আছে তার প্রমাণ হবে–নয় কি? ডেকে দ্যাখ, চেয়ে দ্যাখ তুই পাস কি না তবেই তো বিশ্বাস হবে।
অবিশ্বাস করে ডাকলেও তো ফল পাবো? তুমি বলেছিলে না মা আমায়?
ঈশ্বরকে মনে রেখে তোর কর্মবৃত্তির পথে তোকে এগুতে হবে–এগিয়ে যাবি–দেখবি ঈশ্বর হাত ধরে পদে পদে এগুচ্ছেন তোর সঙ্গে–তোর সহযোগিতা করছেন, পদে পদে তার সাহায্য পাবি, হাতে হাতে নগদ, দেখিস। দেখে নিস।
ঈশ্বরের সাহায্য পাব সব সময়?
বলছি তো, তবে ঈশ্বরের সহযোগিতা পেতে হলে আমাদের তাঁর বোধের সাহায্য নিয়ে নিজের মনের মত কর্মে প্রবৃত্ত হতে হবে–তবে তিনিও সেই সুযোগে আমাদের সঙ্গে সহকর্মে প্রবৃত্ত হবেন তাহলে নানান কর্মে প্রবৃত্ত তিনিই তো করছেন আমাদের। আমাদের কর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে তিনিই সারথি।।
তিনি তো তাহলে শ্রীকৃষ্ণ?–সারথি যখন তুমি বলছ? আর আমরা তাহলে?
আমরা পার্থ। পৃথিবীর সন্তান সব।
তাহলে তো আমরা কেউ কম নই মা। তাঁর সাহায্যে কুরুক্ষেত্ৰকাভ করতে পারি আমরা?
পারিই তো। মনের ঠিক প্রবৃত্তিটা ধরতে পারি যদি সেই বোধও তিনিই দিয়ে দেন। তাঁর কাছে চাইতে হয়। তাঁর কাছে চেয়ে পেতে হয় সেই বোধ। সেই বোধকে কর্মে রূপায়িত করতে তিনিই আবার সহায়তা করেন। আমাদের যথার্থ প্রবৃত্তির পথেই তাঁর দেখা পাওয়া যায়–পদে পদে সাক্ষাৎ পরিচয় ঘটে।
প্রবৃত্তির পথে? এটা তুমি কী বললে মা? প্রবৃত্তি তো ভালো নয়, নিবৃত্তিই ভালো– আমাদের যতো ধর্মশাস্ত্রে এই কথাই তো বলে মা? বলে না?
ধর্মশাস্ত্র পড়েছিস তুই?
তা পড়িনি বটে, আমার সব সেকেন্ডহ্যান্ড নলেজ। এখানে-সেখানে এর ওর তার লেখাটেখা পড়ে এই জ্ঞান হয়েছে–তাই থেকেই বলছিলাম–এমন কি তোমার ঠাকুরও তো ওই কথাই…।
ঠাকুর কক্ষনো অমন কথা বলেননি, বলতে পারেন না। তিনি ঈশ্বরে মন রেখে নিজের নিজের কাজ করে যেতে বলেছেন–যার যেটা কাজ। সবাইকে তিনি তার নিজের মতন হতেই বলেছেন–নিবৃত্ত হতে বলেননি কাউকেই। গিরিশ ঘোষকে তিনি অভিনয় করে যেতেই বলেছিলেন–যেটা তাঁর কাজ। এবং তাঁর প্রবৃত্তি বুঝে মদ্যপানেও কোনো দিন বাধা দেননি তাঁরা।
তাই বটে মা। মেনে নিতে হয় আমায়।
কবীরের কথা শুনেছিস? মুচির কাজ করত কবীর। কিন্তু কবিত্বে আমাদের রবির কাছাকাছি। রবিঠাকুরের যেমন গীতাঞ্জলি, তেমনি কবীরের ই দোঁহা। প্রবাসীর পাতায় ক্ষিতিমোহন সেনের লেখায় তার পরিচয় পাবি তুই, পড়ে দেখিস। তাঁকে একবার কে যেন বলেছিল, গঙ্গাসাগর তীর্থে চল না? কবীর বলল, কী হবে গিয়ে। আমার মন যদি ঠিক থাকে তো এখানেই মা গঙ্গা আমার। মন যদি চাঙ্গা তো কাঠুরিয়ামে গঙ্গা…আমি আমার কাজে লেগে থাকব। গঙ্গা মাঈর যদি খুশি হয় তিনি আমা এই জলের কটোরাইে এসে দেখা দেবেন। দিয়েছিলেন তিনি।…নিজের কর্মবৃত্তির পথেই কবীর পেয়েছিলেন মার দেখা।
তবে নিবৃত্তির কথাও কোন্ কোন্ মহাপুরুষ যেন বলেছিলেন মা, তাঁদের নাম এখন মনে পড়ছে না।
নিবৃত্তির পথে যাওয়া মানে ভগবানের বিরুদ্ধে যাওয়া। তা কি হয় নাকি রে? না, কেউ পারে তা কখনো। এটাই বোঝ না, ভগবান তো গোড়ায় নিজের মূলকেন্দ্রে চিৎরূপে নিবৃত্ত হয়েই ছিলেন, তাতে কোন সুখ নেই দেখে, কোন আরাম না পেয়েই না এই আনন্দের পথে, রূপের পথে অবারিত হলেন-প্রবৃত্তির পথে গা ভাসিয়ে দিলেন নিজের। তাঁর সেই স্রোতের উলটো দিকে কি যাওয়া যায়? কেউ পারে তা? চেষ্টা করলেও তিনি তার ঘাড় ধরে ঘুরিয়ে দেন যে! প্রবৃত্তির পথে আসতে হয় ফিরে আবার।
