নিজেকেই নিজে দেখতেন, তুমি বলছ মা, সেটা আবার কী রকম?
তুই যেমন আয়নায় নিজেকে দেখতে পাস না? সেই রকম আর কি! আত্মসমোহিত অবস্থায় চিত্তের আয়নায় আত্মসাক্ষাৎকার হতো তাঁর।.বুঝেছিস এবার?
না তো। কিছু বুঝলাম না।
আমার যদি সন্মোহনবিদ্যা জানা থাকত তাহলে তোক বুঝিয়ে দিতে পারতাম এখুনি–স্বর্গ মর্ত্য পাতাল নিলোকে ঘুরিয়ে সব দেখিয়ে আনতাম তোকে…মা দুর্গাকে দেখতে পেতিস স্বচক্ষেই।
হিপটাইজম করে দেখাতে?
হ্যাঁ রে হ্যাঁ, সেদিন হিন্দু হোস্টেলের ম্যাজিক খেলায় সেই যাদুকরটা যেমন আকাশ থেকে ঝুড়ি ঝুড়ি টাকা নোট সব বার করে আনছিল দেখিসনি? তোদের সবাইকে হিটাইজ করেই তো! সেই রকম, ধ্যানের সাহায্যে নিজেকে সম্মোহিত করার এক কায়দা আছে–একদিকে মন রেখে একটানা ধ্যান করে যেতে হয়, তার ফলে যা হয় তাকেই বলে সমাধি। উনি সমাধিস্থ অবস্থায় আত্মদর্শন করতেন।
তা হলেই আমার ভগবানকে দেখা হয়েছে। আমি দীর্ঘনিশ্বাস ফেললাম একটানা ধ্যানে বসব কি, একটুক্ষণের জন্যেও মনকে কোথাও আমি বসাতে পারিনে। ভগবানের কথা ভাবতে গেলেই যত রাজ্যের জিনিস আমার মগজে ভিড় করে আসে। কী করি আমি বল তো? ও ছাড়া কি ভগবানকে দেখবার কোনো শর্টকাট নেই? ইংরেজী মেইজির মই?
থাকবে না কেন? সব কিছুরই শর্টকাট আছে। বোম্ ভোলানাথ বলে গজায় কষে দম দিলে মুহূর্তের মধ্যে কৈলাসে শিবদুর্গার সান্নিধ্যে গিয়ে পৌঁছোনো যায়; সাধু-সন্নিসিরা তাই করে থাকেন শুনেছি, অমনি করে ইন্দ্রলোকে অপ্সরাদের নৃত্যগীত দেখেন–শোনন নাকি! তোর বাবা তো সন্ন্যাসী ছিলেন এক সময়, গাঁজাও খেতেন নাকি, তাঁকেই শুধাগে না!
শুধাবার দরকার কি? এখনো তো মাঝে মাঝে খান, আমায় লুকিয়ে। তাঁর খেয়ে রাখবার পর সেই ছিলিমটা নিয়ে একদিন না হয় টেনে দেখব লুকিয়ে-এক টান মাত্তর! দেখি না কী হয়!
এই মরেছে। তাহলে তোর সঙ্গে সঙ্গে কৈলাস প্রাপ্তি ঘটে যাবে। সেইখানেই থেকে যাবি-আমার কাছে ফিরে আসতে পারবি না আর। মহেশ্বরের কাছেই থাকতে হবে তারপরে-নন্দীভৃঙ্গির সাকরেদ হয়ে।
চাইনে আমার ভগবানকে তাহলে। আমার সাফ জবাব–তোমাকে ছেড়ে ভগবানকে চাচ্ছে কে? নন্দীভৃঙ্গির সাকরেদ হবার দায় পড়েছে আমার।
বাঁচালি বাপু! হাসলেন মা-তোর বাবা সন্ন্যাসী হয়ে সংসার ছেড়ে গেছলেন, তুইও যদি আবার তাই করিস তা হলেই হয়েছে।
কী দুঃখে সন্ন্যাসী হব মা! ভগবানের খোঁজে? ভগবানের ওপর অতখানি টান নেই আমার। কলিগায় গৌরদা রামপদদাদের একটা আড্ডা আছে জানো মা? ভারী তর্কাতর্কি হয় সেখানে সব সময়। ভগবান আছে কি নেই–এই নিয়ে তর্ক যততা। আমি সেখানে বসি গিয়ে এক এক সময়। শুনি সব।
তাই নাকি?
কলিগাঁয় ফকির সরকারের বাড়ি থেকে বই আনতে যাই না? রামপদদাদের আড্ডাতেও– যাই তখন। কলিগাঁয় অতুল গোঁসাই আমাদের ক্লাসফ্রেন্ড-তাদের বাড়িতেই সেই আড্ডাটা! …গৌরদা কে হয় যেন তাদের। তাদের বাড়িতেই থাকে। আর, রামপদদা হচ্ছেন গৌর গোঁসাইয়ের বন্ধু!
তার চেয়ে বয়সে বড়ো বুঝি?
অনেক বড়ো। তিরিশ বত্রিশ বছর বয়েস হবে বোধ হয়। তারা বলে যে, তারা নাস্তিক, ঈশ্বর ধর্ম কিছু মানে না। ওসব কিছু নেই নাকি। মানা তো ভারী খারাপ, না মা?
কেন, খারাপ কিসের! মা একেবারে নির্বিকার না মানলে কী হয়? ভগবান রাগ করেন? না,না-হয়ে যান?
বয়সে তারা বড় হলেও আমি তাদের সঙ্গে তর্ক করতে যাই, কিন্তু পারি না কিছুতেই। তারা বলে, ঈশ্বর আছে যে তার প্রমাণ কোথায়? প্রমাণ দাও আগে। আমি কি করে প্রমাণ দেব? কিছুই তো জানি না আমি। তুমি বলে দাও না আমায়-ঈশ্বরকে কি প্রমাণ করা যায়? প্রমাণ আছে কোনো তার অস্তিত্বের?
আছে বই কি। প্রমাণও করা যায় নিশ্চয়।
কী প্রমাণ? আমি জানতে চাই–কী করে প্রমাণ করা যায়–বলে দাও না তুমি আমায়! ঈশ্বরের প্রমাণ বিন্দুমাত্র। মা জানান-বিন্দুমাত্রই প্রমাণ।
বিন্দুমাত্র প্রমাণ?
হ্যাঁ, বিন্দুর যেমন অস্তিত্বই শুধু সার, সেই রকম আর কি! তোর ঐ জ্যামিতি দিয়েই প্রমাণ করে দেওয়া যায় ভগবানকে। মা বিশদ হন–পয়েন্ট থেকে ইচ্ছে মতন রেডিয়া নিয়ে সার্কেল টানা যায় না? রেডিয়াস্ মাফিক কোনোটা বড়ো সার্কেল হয়, কোনটা বা ছোট সার্কেল? হয় না? সেই সার্কেলটাই হচ্ছে পয়েন্টের অস্তিত্বের প্রমাণ তখন। তাই না? পয়েন্ট একটা ছিল বলেই তো তার থেকে রেডিয়াসের সাহায্যে সার্কেল টানা গেল? তেমনি আমরাই হচ্ছি ভগবানের অস্তিত্বের প্রমাণ। আমরাই তাঁর সার্কেল, নিজগুণে তিনি টেনেছেন আমাদের-তাঁর সেই টান থেকে বেরুনো।
ভগবানের সার্কেল আমরা?
হ্যাঁ। কারো বা বড় সার্কেল কারো বা ছোট সার্কেল। কেউ বা সূর্য হয়েছে, কেউ বা শুধুই যুঁই। কেউ রবিঠাকুর, কেউ বা…কেউ বা তোর ওই রিনি! যার যেমন ব্যাস তার তেমনি বৃত্ত। সেই বিন্দুমাত্র ঈশ্বর আছে বলেই জগদ্ব্যাপী আমাদের অস্তিত্ব। ঈশ্বর আছে বলেই আমরা আছি। আমরা হয়েছি, আমরা হচ্ছি। আমরা স্ব।
তা না হয় হলাম, কিন্তু তাই বলে ঈশ্বরকে তোমার তো জানা যাচ্ছে না মা!
জানা যায় না, তবে বোঝা যায়। ঠাকুর যাকে বলতে বোধে বোধ। সেই ঈশ্বর বোধের থেকে যে জ্ঞানের উদয় তাই হলো গিয়ে তোর বেদ। আর, বেদের সেই বোধোদয় থেকে ব্যাস নিয়ে আমাদের এই জীবনের বৃত্ত রচনাই হচ্ছে গিয়ে মহাভারত। যার মানে কিনা, মহাপ্রকাশ। ঈশ্বরপ্রকাশ। আমাদের জীবনে ঈশ্বরের বৃত্তলাভ। আর আমাদের ঈশ্বরবৃত্তিলাভ।
