বটে?
অথচ সেদিন সকালে যেখানে গেছলাম সেই বন্ধুর বাড়িতে বেদম খেয়েছি–খাবার লোভেই আমার যাবার গরজ তো-তারপরে বাসার ঐ নিরাহার চেহারা দেখে বেরিয়ে পড়তে হলো আবার। দেলখোস কবিনে গিয়ে গিলতে বসে গেলাম।
আপনার জীবনে কখনো কোনো অসুখবিসুখ করেনি তাহলে? এই কথাই বলতে চাইছেন আপনি?
করেছিল বইকি। একবার করেছিল। মোক্ষম অসুখ। প্রায় মোক্ষ প্রাপ্তির কাছাকাছি নিয়ে গেছল বলতে কি! এখানে সেখানে ভালোমন্দ খেয়ে না খেয়ে-বহুকালের ব্লডপ্রেসার তো আমার। দারুণ প্রেসার। তার দরুন একটু স্ট্রোক হয়েছিল হঠাৎ। ব্লাডপ্রেসার মানতাম না, ডাক্তারের মানাটানা না শুনে তার ওপরেও খেতাম–একটানা গিলে যেতাম-মাংস ডিম মাখন ক্রীম–তার ফলেই ওই দুর্ঘটনা! কিন্তু তারপরেই আমি সাবধান হয়ে গেছি খুব। কোথাও যাই না, গেলেও তেমনটা খাই না। কোনো কোনো সাহিত্যিক বন্ধুর জন্মদিনে বেজায় ঘটা করে যোড়শোপচারে খাওয়ানো হয়, সেখানে গেলে পাছে লোভ সামলাতে না পারি–তাই যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি, তাঁরাও বেঁচে গেছেন মনে হয়, কেননা কারো জীবনের শুভদিন অপর কারো শোকাবহ মৃত্যুদিন হয়ে জন্মোৎসবটা নষ্ট হোক, তারাও তা চান না নিশ্চয়। নিজ গুণে ক্ষমা করেছেন আমাকে।…
মুক্তারামের তক্তারামে শুয়ে-অচিন্ত্যবাবুর ভাষায়-শুক্তারাম খেয়ে সুখে রয়েছেন?
সর্বদা মার্কাস স্কোয়ারের দূর্বা-মথিত দুর্বার মুক্ত বায়ু সেবন করে-আমি জানাই-এই, সকালে খাই চারটি ভাত, কত কটি, চোখেই তো দেখলেন? দুপুরে বোনের বাড়ির থেকে আমার ভাগনের নিয়ে আসা একখানি রুটি, কয়েক টুকরো মাছ, একটু তরকারি আর রাত্রে খালি হরলিক। তার সঙ্গে হয়ত এক-আধটা বিস্কুট। তবু আমার রক্তের চাপল্য যায় না মশাই।
কখনো আপনার কোনো অসুখ হয়নি একথা আমার বিশ্বাস হয় না।
হয়নি কি? হয়েছে। ছেলেবেলাতেই হয়ে গেছে। কী অসুখটাই না ভুগেছি তখন–কত রকমের যে অসুখ! যত রকমের সুখ আর অসুখ আছে তার উপভোগ সেই অতি কৈশোরেই হয়ে গেছে আমার। সে সবের লিস্টি দিয়ে কী হবে? যেমন রোগা ছিলাম তখন, তেমনি রোগও ছিল কত না। কিন্তু সেও সেই মা এসে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে। বিছানার পাশটিতে বসে থাকবে দিনরাত, সেই লোভেই তো! আর, ইস্কুলে যেতে হবে না, শুয়ে শুয়ে গল্পের বই পড়া যাবে মজা করে–কী আনন্দ! সুখের জন্যই আমাদের যতো অসুখ, বুঝেছেন? আমার বক্তব্যের উপসংহার-তারপর সেই যে বাড়ির থেকে পালিয়ে তীরবেগে বেরিয়ে পড়লাম উদার পৃথিবীতে, তারপর থেকে আমার একটিও অসুখ করেনি কখনো। কার জন্যে করবে?
তা না হয় হলো, কিন্তু এখন আপনার এই বয়সে যদি হঠাৎ কোনো অসুখ বিসুখ করে, কোনো শক্ত অসুখই হয়, এখন তো যে কোনো সাধারণ অসুখই সহসা শক্ত হয়ে দাঁড়ায়। এখানে বাসার সবাই নিজের কাজ নিয়ে আপন ধান্দায় ব্যস্ত এই অবস্থায় একলাটি কী ব্যবস্থা হবে আপনার? বলুন দেখি?
কী হবে আর? মারা যাবো? এই না? তা বলে দৈনন্দিন মার খেয়ে মরতে হবে না তো? মারা যাবার সময় কারো ওই আহা-উঁহু শুনতে পেলাম আর নাই পেলাম। কী ক্ষতিবৃদ্ধি? তখন কি কারো ফোঁসফোঁসানি কানে যায়, না ভালো লাগে মশাই?, বিশেষ করে শুধু আমিই যখন মারা যাচ্ছি–আর কেউ মরছে না আমার সঙ্গে অন্তত, এই মুহূর্তে নয়–তখন আমার অন্তরের সেই হাহাকার তাদের ঐ আহাকারে কি থামবার? সেই কালে তাদের ওই সহানুভূতি আমার মরার ওপর খাঁড়ার ঘার মতই মনে হবে না কি?
কিন্তু আপনার যদি বৌ থাকত এ সময়–
রক্ষে করুন! সারা জীবন ধরে বৌয়ের অসুখ সামলাতে কে? তারা কিছু কি কম অসুখে ভোগে নাকি! তাদের অসুখের হামলা পোহাতে হোতত না দিনরাত? নিজের অসুখের দায় বরং সওয়া যায়, কিন্তু সেই বোঝার উপর বৌয়ের বিসুখের ঐ শাকের আঁটিটি-তার ঠ্যালা কি কম নাকি?
আরে মশাই, দিনরাত অসুখে ভুগবে কেন সে? দেখেশুনে স্বাস্থ্যবতী এক যুবতাঁকে বিয়ে করতে পারবেন না? পরীর মতন একটি বৌ হলে আপনার ঘর আলো করে থাকত নাকি? আপনার দেখাশোনাও করত সে?
সত্যি কথা বলব? পরীর মত মেয়ের কথা বলছেন? আমার জীবনে কোনো পরীর দ্বারাও আমি দৃষ্ট হতে চাইনি, অন্ততঃ এভাবে নয়, শুধু একটি মেয়ের দ্বারাই পরিদৃষ্ট হতে চেয়েছি।
কে সে মেয়েটি, জানতে পারি?
আমার মা।
তিনি তো কবে মারা গেছেন।
মা-রা কি কখনো মারা যাবার? তাঁরা চিরকাল বেঁচে থাকেন, থাকতে হয় তাঁদের। ছেলেকে দেখাশোনার জন্যেই, বুঝলেন? ছেলের মরণের পরও তাঁকে বাঁচতে হয় ছেলেকে কষ্ট করে পুনর্জন্ম দিতেই আবার। ছেলেকে নিজের গর্ভে ধারণ করতে হবে না? জন্মজন্মান্তরের মায়ের সেই ঋণ কি শোধ হবার কখনো? এ জন্মে না–কোনো জন্মেই নয়।
.
১৯.
মাকে একদিন আমি শুধিয়েছিলাম, মা, তুমি কি কখনো ঈশ্বরকে দেখেচ?
দূর খ্যাপা! ঈশ্বরকে দেখবি কি! ঈশ্বরকে কি দেখা যায়?
যায় না? বাঃ! তবে ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেখতেন কি করে? আমি বলি–তিনি কি তাহলে মিথ্যে কথা বলেছেন?
না, মিথ্যে বলবেন কেন? তিনি নিজেকেই দেখতেন–নিজের মধ্যে নিজেকে। মা বললেন-ভগবানের কথা ভাবতে ভাবতে উনি নিজেই ভগবত্তা লাভ করেছিলেন। সেই যে, কাঁচপোকার কথা ভাবতে ভাবতে আরশোলা একদিন কাঁচপোকা হয়ে যায়–বলতেন না উনি?
ঈশ্বরপ্রাপ্তি, ঐশ্বর্যপ্রাপ্তি সব। যদি তিনি ধরা দিতেন না, তাঁর ঐশ্বর্য-বিভূতি ব্যবহার করতেন না কখনো।
