তা হয়ত হতো, কিন্তু সেই জঞ্জাল সাফ হতো কি করে? আমার প্রশ্ন রাখি।
কোন জঞ্জাল?
সেই জঞ্জাল হটানো জঞ্জাল? তিনি আবার যে পুন্নাম নরক আমদানি করতেন-সেই সব?
স্ত্রীপুত্ররা সব জঞ্জাল নাকি আপনার কাছে? তাদের অবশ্যি মায়াজাল বলেছে বটে শাস্ত্রে, কিন্তু…তাহলে আপনার বোনরাও তো আপনার কাছে জঞ্জাল একরকম?
মোটেই না। আমার কাছে তারা সব নন্দন কানন। নন্দন অংশ বাদ দিলেও–সেই পারিজাত সৌন্দর্য-সুরভির সীমা নেই, তুলনা হয় না। বন উপবন যাই বলুন, সেসব ব্যক্তি-স্বাধীনতার হকারক নয়। স্বচ্ছন্দ বিচরণের স্থান। আস্তে আস্তে তারা সব ছেড়ে যায়, বেঁধে রাখে না, বাঁধা থাকে না। বন ক্রমেই গভীরত্র হয়ে নিছক রোদনের অরণ্যরূপে, কালক্রমে নিজে সংসারসমুদ্রে গিয়ে হারিয়ে যায়। তারা তো ছাড়ান দেয়, ছেড়ে যায় যথাসময়ে, কিন্তু বৌকে তো আর ছাড়ানো যায় না কিছুতেই। কখনই না।
দরকার কি তার?
সিন্ধুবাদের সেই গলগ্রহের ন্যায় সূতহিবুকযোগে লব্ধ গোধূলি লগ্নের উদ্বাহিত সেই ভার্যাকে ঘাড় থেকে আর নামানো যায় না যে! তারপরে শেষকালেতে মাথার রতন লেপটে রইলেন আঠার মতন! কবি ডি এল রায় একথা কেন বলে গেছেন কে জানে! যে জন্যেই বলুন, মোদ্দা কথা এই, তারপর সেই নাছোড়বান্দার নেহাৎ বান্দা হয়ে বন্দীদশায় যাবজ্জীবন কাটানো!
তাই বলছেন আপনি? বৌয়ের বিরুদ্ধে এই আপনার অভিযোগ!
আমি কেন বলব? বৌয়ের বিরূদ্ধে আমার কোনই অভিযোগ নেই। আমি জানাই : আমার আবার অভিযোগ কিসের! বিয়েই করিনি আমি। মাথা নেই তো মাথাব্যথা কিসের? কিন্তু যাঁরা করেছেন, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা যাঁদের, তাঁদের সেই ফাস্টহ্যাণ্ড নলেজের ফল গল্প-কাহিনীর ছলনায় তাঁদের আত্মচরিতেই ব্যক্ত হয়েছে। আমার বন্ধুরাই মুখে না বলে লিখে জানিয়ে গেছেন।
লিখে জানিয়েছেন? বলেন কি?
কেন, পড়েননি নাকি? কে যেন তার বৌকে কুয়াসার আড়ালে হারাতে চেয়েছিল অবশ্যি মেয়েটি হারায়নি শেষ পর্যন্ত। হারাবার কি হারবার পাত্র নয় মেয়েরা হারিয়ে না গিয়ে উলটে তারাই হারিয়ে দেয় আমাদের।…সেই কার যেন স্ত্রীকে শৃঙ্খলের মত বোধ হয়েছে, কে যেন আবার দেদার পাম্প করে দিয়ে স্টোভ ফেটে বৌয়ের অপঘাতের অপেক্ষায় বসেছিল–বিস্ফোরণের এক যাত্রায় সহধর্মিণীর সঙ্গে সহমরণে যাওয়াও তার বাঞ্ছনীয় ছিল নাকি–পড়া নেই আপনার?
পড়ব না কেন? বিখ্যাত গল্প সব। কিন্তু আপনার লেখক বন্ধুদের একজনেরই তো গল্প এগুলো–আর কোনো বন্ধুর কেউ কি এরকম দুর্লক্ষণ দেখিয়েছেন? তার উল্লেখ করুন।
দরকার করে না, উনি একাই একশ। আমাদের সবার মুখপাত্র। গৌরবে বহুবচন-তাঁকে। নিয়েই আমাদের গৌরব। হাঁড়ির একটা চাল টিপলেই আর সবার হালচাল জানা যায়। তাঁর লেখাতেই আর সকলের টিপসই রয়ে গেছে। তবে একথা ঠিক, গল্পকথা হলেও এগুলি অল্প কথা নয়। এর মধ্যে শিক্ষণীয় আছে অনেক কিছু।
কিন্তু শুনেছি তো, তাঁর মতন পত্নী-বৎসল নাকি হয় না…
ঠিকই শুনেছেন।…স্ত্রী না হলে একদণ্ডও চলে না ওঁর। বউকে ছেড়ে এমন কি আমেরিকায় গিয়েও উনি স্বস্তি পাননি–একদিনও তিষ্ঠোতে পারেননি সেখানে। সম্ভাবিত নোবেল প্রাইজ পাবার লোভ সংবরণ করে দুদিন বাদেই ন্যাড়া মাথায় নিজের সেই বেলতলাতেই ফিরে এসেছিলেন আবার।
কেন এলেন বলুন! তাহলেই বুঝবেন–স্ত্রী কী চীজ।
আসতেই হবে যে। আর সেই কারণেই তো আমার বলা–দাম্পত্য জীবনের পরিণতিতে দাসমলোভাব দাঁড়ায়, অন্য গতি থাকে না আর। হয়ত একটু আত্মতুষ্টির আবহ সৃষ্টি করলেও আত্মস্ফুর্তির পক্ষে ভয়াবহ। বউ কোনো বাড়াবাড়িতে যেতে দেয় না, স্বচ্ছন্দবিহার চলে না, বাড়িতেই বন্দী হয়ে থাকতে হয় সবসময়-অনিচ্ছায় বা স্বেচ্ছায়-কেচ্ছার ভয় আছে না? সেসব বালাই নেই ব্যাচিলারের। বউ অন্তরের আয়ের সব পথ বন্ধ করে দেয়–নিজের কাছে অন্তরীণ রাখে। এইজন্যেই সে ব্যক্তি-স্বাধীনতার অন্তরায়।
কিন্তু অসুখবিসুখে দেখাশোনা করবার…
যেমন সে, নানান আধিব্যাধি আমদানি করতেও তেমনি। বিবাহিত ব্যক্তির নানা অসুখবিসুখ তো লেগেই থাকে, কেন বলুন দেখি?
আপনিই বলুন না।
ঐ বউয়ের জন্যেই মশাই! বোগেই তো বোগ টানে। গোড়াকার বোগ ওই দারাই। দারারোগ দুরারোগ্যই। আবার ই বউয়ের হাতের সেবাসুখ পাবার লোভেই যতো না অসুখ! বউ এসে গায় মাথায় হাত বুলোবে, যত্নআত্তি করবে, তার মুখের আহা উঁহু শোনা যাবে সেইজন্যেই না! যার ঘরে বউ নেই তার কোনো ব্যায়োও নেই, অন্তত তেমনটা নেই এইজন্যেই।
আপনার অসুখবিসুখের সময় আপনি কি চান না আপনার প্রিয়জনরা কেউ এসে গায় মাথায় হাত বুলাক?
মাথায় থাক। অপর কেউ আমার গায় মাথায় হাত বুলোলে আমার গা জ্বালা করে– আমার মা ছাড়া আমার কপালে আর কারো করাঘাত আমি সইতে পারিনে-পাছে কেউ আমায় অসহায় অবস্থায় পেয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে যায় সেই ভয়ে আমার কোনো অসুখই করে না কখনো। এই বছর পঞ্চাশ তো এই বাসায় কাটালাম, জিগ্যেস করুন না বাসার ঠাকুরকে, জানবেন একদিনের জন্যেও আমার কোনো মীল বাদ যায়নি। কোনো অসুখ করেনি কখনো। এমন কি একবার… কথাটা বলব কিনা আমি ভাবি একবার।
একবার? তিনি উসকে দেন আমায়।
একবার এ বাসায় ফুড পয়জন হয়েছিল অনেকদিন আগে। নৈশাহারের পরেই। পরদিন শুনি আগের রাত থেকেই বাথরুমে যাতায়াত শুরু হয়েছিল কারো কারো। পরের দিন সকালে উঠে বেরিয়ে গেছি, কিছু জানিনে, রাত্রিবেলায় ফিরে দেখি রান্নাঘর অন্ধকার। উনুনে আচটাচ পড়েনি, কী ব্যাপার? না, সারাদিন ধরে বাসাড়েরা কেউ বিশ পঁচিশ কেউ বা বাহান্নবার বিগলিত হয়েছেন–কেউ কেউ আবার হাসপাতালেও গেছেন নাকি। আমাদের। বাসার ওড়িয়া ঠাকুর-পরশুরাম পাঢ়ী–সে নাকি সন্ধ্যে পর্যন্ত সঠিক ছিল, কিন্তু তারপরে তাকেও এখন মুক্তকচ্ছ হতে হয়েছে। বাসার সবাই আজ ধারাবাহিক, তাই আজ রান্নাঘরে আঁচ পড়েনি, হাঁড়ি চাপেনি তাই।
