তারপর?
সেখান থেকে খালাসের সময় আমায় বললে যে, তোমার যা জিনিসপত্র আছে, যা যা সঙ্গে এনেছিলে নিয়ে যেতে পারো। নিজের বলতে ওই কম্বল দুখানাই ছিল। নিয়ে এলাম সমভিব্যাহারে। বাধা দিলে না কেউ। ব্যবহারে লাগিয়েছি এখন।
পলিটিক্যাল আসামী বলে হৃক্ষেপ করেনি কেউ। সেইজন্যেই আনতে পেরেছেন।
আনন্দবাবুও সেই কথাই বললেন…
আনন্দবাবুটি কে?
এই বাড়ির মালিক। আনন্দমোহন সাহা। তাঁর এই বাসায় তিনিই তো ঠাই দিয়েছিলেন আমায়। দুঃখের বিষয়, এখন আর বেঁচে নেই। সস্ত্রীক স্বত। আহা, তাঁরা বেঁচে থাকতে কতো ভালোমন্দ খেয়েছি যে! পায়েস পিষ্টক ভুনিখিচুড়ি-ভূরি ভূরি খেয়েছি। খিচুড়িটা ঠিক পোলাওয়ের মতই খেতে-প্রায়ই আসত তাঁদের বাড়ি থেকে। আর পায়েস। আহা, সে কী পায়েস! আয়েস করে তারিয়ে তারিয়ে খাওয়ার মতন। খাসা চাল, দুধে নয়, ক্ষীরের মধ্যে সেদ্ধ করা আগাগোড়া। তেমনটি আর হয় না। আজকাল কোথাও খেতে পাই না আর। আনন্দ বিয়োগে ততটা নয়, ওই পায়েসের শোকেই আমার দীর্ঘনিশ্বাস পড়ল–আমার জীবনের আনন্দ তিনি নিয়ে গেছেন। সেই আনন্দবাবুই এই কম্বল দেখে বললেন, আরে ভাই! করেছো কী! জেলখানার মাল নিয়ে এসেছে! কেউ দেখতে পেলে আর রকে থাকবে না–চুরির দায়ে ধরা পড়বে যে! হাতকড়া পড়বে। আর এবারকার জেলটা ঠিক বিরিয়ানি খাবার হবে না, হবে দস্তুর মতন ঘানি টানার।…সরিয়ে ফেল সরিয়ে ফেল এক্ষুনি।
বললেন তিনি। এই কথা বললেন?
হ্যাঁ। শুনেই না আমি সরিয়ে ফেলেছি তক্ষুনি। চাদরের তলায় চাপা দিয়েছি তাদের।
আর ঐ বালিশটা পেলেন কোথায়? নক্সাকাটা ওয়াড় দেয়া খাসা বালিশ তো? ওটাও কি জেলখানার নাকি?
না। ওটা আমার বোন পুতুল দিয়েছিল আমাকে। একদা সে এসে দেখল কি, আমার মাথাটা মাটিতে গড়াগড়ি যাচ্ছে…
মাটিতে গড়াগড়ি যাচ্ছিল? আপনার মাথা?
আহা, ওই হোলো। এই বিছানতেই গেল না হয়। গড়াগড়ি যাচ্ছিল তো ঠিকই। আর টাকা মাটি মাটি টাকা যদি হতে পারে তো বিছানার মাটি হতে বাধা কিসের? তাই না দেখে সে তক্ষুনি বেরিয়ে কোত্থেকে একটা বালিশ কিনে এনে উপহার দিল আমাকে। ওই বালিশটাই। সঙ্গে আবার ওয়াড় দিল খান দুয়েক। দুখানা কেন? শুধিয়েছিলাম তাকে। যাতে আমায় কাঁচাকাচির কাজে না যেতে হয় সেইজন্যেই দুখানা–একটা যোবা বাড়ি কাঁচতে যাবে, আরেকটা পরানো থাকবে। কাঁচাকাচির কাজ করলেও মেয়েরা কখনো কাঁচা কাজ করে না।
তাই বলুন! কিন্তু এই কম্বল শয্যার সঙ্গে ঐ উপাদেয় উপাধানের খাপ খাচ্ছে না ঠিক। কেমন বেখাপ্লাই ঠেকছে।
জেলের কি তার জিনিসের কোনো নিন্দে করবেন না আপনি আমার কাছে। আমি বলে দিই। তার দৌলতেই আমার এমন দেহলাভ আর এই দেহরক্ষার জন্যে এহেন শয্যা–তা জানেন?
জানলাম। কিন্তু এইটে আমি বুঝতে পারছিনে আপনার এমন সব বোন থাকতে তাঁরা কি এই ঘরটার ওপর একটু নজর দেন না? সাফসুফ করতে চাননি কখনো কেউ?
চাননি কি আর? বিনি ইতু পুতুল–যে এসেছে, ঘরের এই চেহারা দেখেছে, সে-ই এর হাবভাব বদলাতে চেয়েছে, কিন্তু দিচ্ছে কে হাত লাগাতে? বিনিকে নিয়ে ইনিয়ে-বিনিয়ে অনেক গল্প লিখেছি এককালে মানি, সে-সবের বিনিময়ে টাকাও পেয়েছি দাদার তা জানি, কিন্তু–তাই বলে দাদার লেখা বিকিয়েছে বলে তার মাথা কিনে নেয়নি, আমার কি আমার ঘরের ওপরে হস্তক্ষেপ করার অধিকার তাকে দিইনি আমি। আর ইতু কি পুতুল এ-ঘরের জঞ্জালে হাত লাগাতেই না আমার সঙ্গে হাতাহাতি বাঁধার যোগাড়। যতই ইতুদেবীর পূজারী কি পৌত্তলিক আমি হই না কেন, আমার ব্যক্তি-স্বাধীনতায় কারো হস্তক্ষেপ আমি সইতে পারি না। ব্যক্তিত্বহানিতে আমি নারাজ। ব্যক্তিত্বই তো একজনের চরিত্র। চরিত্রহীন হতে চায় কে?
ঘর পরিষ্কারের সাথে ব্যক্তিত্বের, ব্যক্তি-স্বাধীনতার কী সম্পর্ক মশাই? তিনি ঠিক বুঝতে পারেন না।
ঘর কি আমার ব্যক্তিত্বের অংশ নয় মশাই? আমার ঘরের সঙ্গে আমার ব্যক্তিত্বও কি জড়িত নয়? কী বলেন! আমার মনের রূপের বহিঃপ্রকাশ তো এই ঘর। খানিকটা অদ্ভুত নিশ্চয়ই। আমার অন্তঃকরণের পুঞ্জীভূত জঞ্জালের অভিব্যক্তি ছাড়া কী আর? সত্যি বলতে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন সোফা সেট সাজানো পোশকী ঘরে লোফার আমি যেন ঠিক স্বস্তি পাইনে।
বুঝতে পেরেছি। এই হেতুই কোথায় আপনি হবেন এক বিরাট জমিদারি আর সাত মহলা বাড়ির সুসজ্জিত সাতষট্টিখানা ঘরের মালিক, খাটপালঙ্ক গদি সাজানো ঘর সব, তা না হয়ে. গদির কথায় তাঁকে গদ হয়ে উঠতে দেখি।
আর কোথায় এহেন এক ঘরের এই চৌকিদারি আমার। তাঁর বাক্যটা আমিই সম্পূর্ণ করি : অবশ্যি, সেই সাথে কয়েকটি চটিরও মালিক বটি।
চটি না বলে স্লিপার বলুন বরং।
স্লিপার তো আমিও কিছু কম নই। ওরা ইতস্তত বিক্ষিপ্ত, আর আমি সর্বদা এই শয্যায় নিক্ষিপ্ত। তফাৎ এই, ওরা সব জোড়ায় জোড়ায়, আর আমার আদৌ কোনো জোড়া নেই। এ ঘরে নেই অন্তত।
সারা বাংলা মুলুকেই আপনার জোড়া নেই। কথাটা যেন তার ব্যাজস্তুতিচ্ছলেও বলা নয়।–তা জানি।
জুড়ি একজনা ছিল বটে–কিন্তু সে জুড়ি তো আমি হাঁকিয়ে দিয়েছি কোকালে। ঘাটশিলার রেলগাড়িতেই। বললাম না আপনাকে?
অন্য জুড়ি জুটলে এমনটা হতো না। বিয়ে করলে এভাবে থাকতে পারতেন না কিছুতেই। বোন না হয়ে বৌ হলে কি আর এসব আবর্জনা বরদাস্ত করত? দরকার হলে হাতাহাতি করেও সব জঞ্জাল সাফ করে ছাড়ত এক লহমায়।
