কেন, বাসার চাকর-টাকর? বললে, বসিস দিলে, তারা কী ঝটপাট দিয়ে ধুলো ময়লা সব সাফ করে দেয় না।
কী হবে দিয়ে? তিরিশ চল্লিশ বছর ধরে ঘরের ভেতরে পুঞ্জীভূত এই জঞ্জালের মধ্যে কত না জীবাণু জন্মেছে–কত না বোগজীবাণু! কী হবে ঝেটিয়ে তাদের উত্যক্ত করে? ঝাড়লেই তো তারা হাওয়ায় উড়ে শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে আমাদের নাকমুখের পথে সোজা গিয়ে শরীরে সেঁধুবে? কী দরকার তার? তার চেয়ে লেট দি স্লিপিং ডগস্লাই। আমার এই কথাই।
বেশ কথা। কিন্তু তাহলেও, দোরগোড়ায় একটা পাপোশ তো রাখতে পারেন? লোকে পা-টা মুছে ঢুকতে পারে ঘরে তাহলে।
আমিও সেটা ভেবেছি–রাখব একটা পাপোশ এবার। তবে দরজার বাইরে নয়, আমার ঘরের ভেতরেই রাখতে হবে পাপোশটা।
ঘরের ভেতরে কেন?
বাইরে রেখে কী হবে? বাইরেটা তো বেশ পরিষ্কার, দেখছেন না? রোজ সকালে জমাদারের ঝাড়ু পড়ে। ঘরের ভেতরেই তো যত ধুলোবালি আর জঞ্জাল। ঘরের মধ্যেই রাখতে হবে পাপোশটা–যখন কেউ এ ঘর থেকে বেরুবেন, বেশ করে নিজের পা-টা মুছে-টুছে বেরিয়ে যাবেন সেই পাপোশে।
.
১৮.
পা তুলে গুটিয়ে বিছানার ওপরে ভালো করে বসুন না মশাই। বললাম আমি জনাব সাহেবকে ঘরের ধুলো বালি আপনার পায়ে লেগেছে বলেছেন? এক কাজ করুন না! আমার এই বিছানাতেই পা-টা মুছে নিন না হয়।
বিছানাতে পা মুছব? তিনি যেন অবাক হন।–বলছেন কী।
কোথায় মুছবেন আর? পাপোশ তো নেই আমার ঘরে? কী হয়েছে? আমিও তো তাই করি সর্বদাই।
বিছানাতে পা মোছেন নাকি?
বিছানাতেই কি আর? তা কি কেউ মোছে নাকি? চাদরের তলাতেই মুছি। চাদর তুলে কম্বলের গায়ে মুছে দিই। চাদর আমার ফিটফাট ধোপদুরস্ত। চাদরের তলায় কী আছে কে দেখতে যাচ্ছে বলুন? ওপরটা চাকচিকন হলেই হল। চাদরের সঙ্গেই আমার সম্পর্ক। বিছানার কী! নিন, মুছুন।
চাদর তুলে আমার কম্বল শয্যা উন্মুক্ত করি।
আমার কোনো বিষয়াসক্তি নেই। বিছানাকে যে চাদর দিয়েছি সেই ঢের-তার বেশি আদর করা ঠিক হবে না। মাঝে মাঝে পা মুছি তাই–এই, জুতো-টুতো পরার আগে কিংবা বাইরে থেকে ফিরে এসে। মাঝে মাঝে পদাঘাত করতে হয় বিছানাকে–তবেই ব্যাটা দুরস্ত থাকে।
তিনি পা নিয়ে ইতস্তত করেন।
নইলে নাই পেলে বিছানা মাথায় উঠবে যে! অনেকে অবশ্যি বিছানাকে মাথায় করে রাখেন। ঝালর দেওয়া সুজনি টুজনি বিছিয়ে তার ওপর। আমার মতে, বিছানা হচ্ছে ঘুমোবার জন্যে, ঘুমটি হলেই হোলো। শান্তিতে ঘুম-নির্বিবাদ শান্তি। তার জন্যেই বিছানা। বিছানায় বিছা না থাকলেই হোলো। নেই আমার। কামড় বসাবার কেউ নেই। বিয়ে করিনি তো।
সারারাত বিছের কামড় সইতে পারবেন না বলেই নাকি?
আঁক-ফাঁকের দেমাক সয় না আমার। তার ভেতর মাথা গলাই না আমি। অঙ্ক মেলাতে পারতুম না বলে অঙ্কশায়িনীও মিলল না বোধহয়। ভালোই হোলো একরকম। বিছানাকে নাই দিতে হোলো না, বিছানাময়ীকেও নয়।
জীবনমন্থনের বিষভাগকে বাদ দিতে গিয়ে অমৃতের ভাগেও বঞ্চিত হলেন শেষটায়। জীবনটাই বিস্বাদ করলেন। আমার ভাষাতেই যেন তাঁর বিসংবাদ শুনি-ফাঁকি দিয়েছেন নিজেকেই। ফাঁকি পড়েছেন একেবারে।
সাধ্য কী! আমি বলি-ননচার অ্যাভর ভ্যাকুয়াম, বলে না? কোথায় ফাঁক রাখার যো আছে কি? প্রকৃতিই থাকতে দেয় না। ভগবান একেবারে ফাঁকি পড়তে দেন না কাউকেই। সব ফাঁক সবার ফাঁকই ভরাট করে দেন একেক সময়-ভগবানের প্রকৃতিই তাই।
বটে? তিনি জানতে চান তাহলে শয্যাসঙ্গিনীও ঘটে যায় একেক সময় বলছেন? ই বিয়ে না করলেও?
আমি কী বলব? আপনিই বলুন। এসব কথা কি কাউকে কখনো মুখে বলার? নিজের মনে নিজ গুণেই সমঝে নিতে হয়ে। তাবৎ ভাবের কথাই তো ভাববাচ্য মশাই!
তিনি যেন ভাবে বিমূঢ় হয়ে পড়ে। কথা সরে না তাঁর। তারপর বলেন-আশ্চর্য কিছু নয়!
আশ্চর্য কী! কার কোথায় কখনো বা পুরুষকারের ফাঁকিতে পড়ে না নাকি?
আশ্চর্য কী! কার কোথায় কখন কীভাবে কোন অভাব মোন হয়ে যায় কেউ বলতে পারে? কখনো দৈবাৎ মেলে, কখনো বা পুরুষকারের দ্বারা লভ্য পুরস্কার। মোটের ওপর ভগবতীর রাজ্যে কেউ কদাপি ফাঁক যায় না–একেবারে ফাঁকিতে পড়ে না কেউ। কালী কল্পতরু, কালও আবার তাই। কালক্রমে মেলে সব, মিলে যায় তাবৎ, জানেন নাকি?
কী জানি?
কী জানবেন আর! জানবার কী আছে! ভগবানের অপার রহস্য, কিছু কি তার জানা যায়? নিন, পা তুলে ভালো হয়ে বসুন তো! নইলে আমি স্বস্তি পাচ্ছি না।…শুতে পারছি না বলে শান্তি পাচ্ছিনে।
পড়ুন না শুয়ে। কে আটকাচ্ছে?
আপনাকে ওই প্রায়োপবেশনে রেখে কি শোয়া যায় মশাই? ভদ্রতায় বাধে যে? সঙ্গে সঙ্গে আমার অনুযোগ : লেখকা যদিও ঠিক ভদ্র নন কখনো-তাহলেও চক্ষুলজ্জা বলে একটা আছে তো।
ভদ্রলোক আমার উপরোধে ঢেকি গেলার মতন সসঙ্কোচে চাদরের এক ধারটা তোলেন এ তো কম্বল দেখছি কেবল। দুখানা কম্বল। এই আপনার বিছানা! তোষক–টোষক নেই?
পাবো কোথায়? কে দেবে? জেলখানার দৌলতে পাওয়া ওই কম্বল দুটোই দুনিয়ার সম্বল আমার।
অ্যাঁ? কী বললেন? জেলখানার কম্বল?
হ্যাঁ। চুয়াল্লিশ ডিগ্রীর অবদান। সেখানে হাজত বাসের সময় ও দুখানা দিয়েছিল–একটা পাতার জন্যে আর একটা গায়ে দেবার। তারপর আদালতে কারাদণ্ড হবার পর সেখান থেকে বহরমপুরের জেলে চালান যাবার কাছে ওদুটো নিতে হহলো-শীতকাল ছিল কিনা তখন! প্রহরী আর কম্বল–পরিবেষ্টিত পৌঁছলাম বহরমপুরে গিয়ে। কম্বল নিয়েই ঢুকলাম সেখানকার গারদে।
