পারতাম, কিন্তু আর বোধ হয়এ আশা করা যায় না। আমার কী মনে হয় জানেন? উক্ত ভদ্রলোক বোধ হয় আর বেঁচে নেই।
কেন এমন আশঙ্কা আপনার?
আমি যদি তাঁকে মেরে ফেলে থাকি?…
অ্যাঁ? তাই নাকি? খুন করেছেন তাঁকে? তিনি, শিহরিত হন : আপনি বার বার পিলে চমকে দিচ্ছেন আমার। ঈর্ষাবশতই মেরেছেন বোধ হয়? কী করে মারলেন?
ট্রেন দিয়ে।
ট্রেন দিয়ে? চলন্ত ট্রেন থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিলেন নীচেয়? অ্যাঁ?
না, না–তা নয় ঠিক।
তবে কী? ট্রেন দিয়ে কি কাউকে মারা যায় নাকি? তিনি একটু সন্দিগ্ধই : তবে হ্যাঁ, একজনকে খতম করার দায়ে ট্রেন উড়িয়ে দিয়ে অনেককে ঘায়েল করা যেতে পারে বটে।
মারা যায় না ট্রেন দিয়ে? কী যে বলেন! পাকিস্তান যদি লরী দিয়ে সাতজন বিদেশ ডিপ্লোমাটকে কাত করতে পারে তাহলে কি আমি ট্রেন দিয়ে একজনের মোলাকাত করতে পারব না–যদিও আমি তাদের মতন তেমনটা লড়িয়ে নই।
খুলে বলুন তো, শুনি আপনার কান্ডটা। কী করে খতম করলেন তাকে?
ক বছর আগেকার কথা। সেবার মহাষ্টমীতে বাড়ি থেকে বেরিয়েই দুর্ঘটনা ঘটল মহাষ্টমীতে যাত্রা নাস্তি বলে থাকে পাঁজিতে জানেন তো? আজকাল আমরা তা মানিনে, নিজের সুবিধেটাই দেখি। মহাষ্টমীতে পুজোর ভিড়টা কমে যায় বেশ-ট্রেন যাত্রা ঢের সহজ। তাই ওই দিনই আমি আমার মুল্লুকে যাই। সেবার হাওড়া স্টেশন থেকেই দুর্ঘটনার শুরু-প্ল্যাটফর্মে পৌঁছেই ট্রেনটা পেয়ে গেলাম। ধরতে পারলাম, চড়তে পারলাম কামরায়। আশ্চর্য ব্যাপার।
আশ্চয্য কিসের? দুর্ঘটনাই বা কোথায়?
বরাবর আমায় পরের ট্রেনে যেতে হয়–সিটি বুকিং-এ আগের থেকে টিকিট কেনা থাকলেও। যে ট্রেনের জন্যে মনে করে বেরুই, যে কারণেই হোক, সে ট্রেনটা নির্ঘাত ফেল করে বসি, তাকে আর ধরতেই পারি না। সেই কারণেই পরের গাড়িতে যেতে হয় আমায়……..তবে সবই তো পরের ট্রেন। সেদিক দিয়ে ধরলে, কোন্ ট্রেনটাই বা আমার নিজের বলতে পারি বলুন?
তা বটে! তিনি ঘাড় নাড়েন ট্রেন আর কবে কার! তারপর?
তারপর আর কি! সেই ট্রেনটাতে না যাবার জন্যেই দুর্ঘটনা ঘটল। ঘটল আবার সেই ট্রেনেই।
কোন্ ট্রেনে?
পরের ট্রেনে, যেটাতে আমার যাবার কথা অথচ আমি যেতে পারিনি। আগের ট্রেনটা পেয়ে তাতেই চেপে চলে গেছি। যথাসময়ে ঘাটশিলায় পৌঁছে খেয়েদেয়ে বিছানায় গড়াচ্ছি, এমন সময়ে সেই বিচ্ছিরি ব্যাপারটা ঘটল। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতই বিদঘুঁটে এক আওয়াজ এল–ঘাটশিলার অদূর থেকেই। সোরগোল উঠল ঘাটশিলার কাছেই নাকি এক ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে–বে-লাইন হয়ে উলটে গিয়েছে গাড়ি। পরের দিনের কাগজে বিস্তৃত খবর বেরুল-হতাহতের তালিকায় এক শিবরামের নাম।
অ্যাঁ? সে কী মশাই?
হ্যাঁ, সেই কথাই তো বলছি। এই দুর্ঘটনার জন্যে আমিই সম্পূর্ণ দায়ী। না না, ঐ ট্রেন দুর্ঘটনার জন্য না–আমি দায়ী মানে, আমার দোষেই ঐ ভদ্রলোক হতাহত হলেন কি না। আমি যদি পরের ট্রেনে আসতাম তো আমিই মারা যেতাম নির্ঘাৎ। এক বাড়িতে দুবার বজ্রাঘাত হয় না, এক লোককে দুবার কামড়ায় না সাপে-তেমনি এক সাথে দুজন শিব্রাম মারা পড়তে পারে না কখনো।
আপনার পক্ষে ভালোই তো সেটা। তিনি ঠিক ঠাহর পান না-এর ভেতর খারাপটা হলো কোনখানে?
সেই ভদ্রলোকের মারা যাওয়াটা খারাপ হলো না? একজন বিধবা হলো না সেজন্য? কয়েকজন পিতৃহারা হলো না কি? কিন্তু আমি মরলে কার কী যেত? কী ক্ষতি হতো কার? খতিয়ে আমি বলি–চিত্রগুপ্তের খাতায় এক শিব্রামের ট্রেন চক্রে মরবার কথা ছিল সেদিন, সেই খাতে আমায় মিলল না বলেই ওকে মেরে তাঁর খতিয়ানের হিসেব ঠিক রাখতে হলো। কাপুরুষের মতন আত্মরক্ষা করে তাঁর মৃত্যুর জন্য আমিই কি দায়ী নই? বলুন আপনি?
শুনে তিনি গুম হয়ে যান, কিছুক্ষণ তাঁর কথা সরে না। তার পরে তিনি গুমরে ওঠেন অত।
অদ্ভুত তা বটেই। আমাদের বেচে যাওয়াটাও অদ্ভুত, মারা পড়াটাও অদ্ভুত! সবচেয়ে অদ্ভুত আমাদের এই বেচে থাকাটা। মুহুর্মুহু মিরাকে। তাঁর কথায় আমার অক্ষরে অক্ষরে সায়।
খেয়েদেয়ে থালাতেই হাত ধুয়ে মুখ মুছে সকড়ি থালাবাটি গেলাস সব চৌকির নীচে নামিয়ে রেখেছিলাম- এবার আমি শুয়ে পড়ি, কী বলেন? শুয়ে শুয়ে আপনার সঙ্গে গল্প করা যাক, কেমন?… আপনি পা তুলে ভালো করে বসুন। বাবু হয়ে বসুন বিছানার ওপর।
তা কি হয়! পায়ে ধুলো যে! ধুলো কিসের! আপনি জুতো পরে আসেননি কি? তাঁর পায়ের দিকে নজর দিই, এ কি? আপনার জুতো গেল কোথায়?
ঘরের বাইরে রেখে এসেছি। দরজার ও ধারে।
করছেন কী! খালি পায়ে এসেছেন এই নোরা ঘরে, অ্যাঁ? কেন? ঘরে কি আরো জুতো নেই নাকি? আমারই তোক জোড়া রয়েছে-ঘরময় ছড়ানো। ইতস্তত বিক্ষিপ্ত-নিক্ষিপ্ত দেখছেন না? এটা তো ঠাকুরঘর নয় আর। জুতো পায়ে ঢুকতে কী হয়েছিল আপনার? জুতোর কি আবার জাতিভেদ শ্রেণীভেদ আছে নাকি?
না, তা নয়। তবে কারো ঘরে কি জুতো পরে ঢুকতে আছে?
অন্য ঘরের খবর রাখিনে, আমার ঘরে কিন্তু তাই নিয়ম। দেখছেন আমার ঘরে কতো ধুলো বালি আবর্জনা জমে রয়েছে। তিন যুগ আগে সেই কবে যে এই ঘরে ঢুকেছি তার পর আর এখানে ঝটপাট পড়েনি। ঝড়পোছ হয়নি কখনো। কে করবে ওসব বলুন? ও সব তত গৃহিণীর কাজ–গৃহিণী গৃহমুচ্যতে, বলে না? মুচ্যতে কিংবা মুচ্ছ্যতে যাই বলুন না।
