কী বলেন যে!
আরে মশাই! এই চেহারা আমি ফিরিয়ে আনলাম সেই জেলের থেকেই। বলব না। আগে তো আমি এই কড়ে আঙুলটির মই টিঙটিঙে ছিলাম। কোনো ব্যায়াম ট্যায়াম সেরে নয়, টনিক-ফনিক মেরে না, জলবায়ুর হেরফেরেও নয়কো, সেই কড়ে আঙুলের ন্যায় চেহারা নিয়ে গিয়ে তেহারা হয়ে ফিরলাম। এই বুড়ো আঙুলের মত হৃষ্টপুষ্ট হয়ে বেরিয়ে এলাম বহরমপুরের সেই গারদ থেকেই। দেখছেন তো বেঁটেখাটো আমার এই প্রতীকচিহ্ন। দোর্দণ্ডপ্রতাপ ব্রিটিশ সরকারকে আমার এই বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে চলে এলাম। আর, তারপর থেকে…।
তারপর থেকে?
তারপর থেকে জেলখানায় আর জেলের খানায় গড়া এই মোগলাই চেহারা একটুখানি টসকায়নি আমার। সেইরকমটিই রয়ে গেছে প্রায়। অ্যাদ্দিন বাদেও এখনো আমার সেই বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠই দেখিয়ে বেড়াচ্ছি সবাইকে।
জবাবে কাজীর প্যারডির একটি পংক্তিই তিনি পুনরুচ্চারণ করলেন- তুমিই ধন্য ধন্য হে!
সত্যি বলতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মুদ্রাযন্ত্র তার দুঃশাসনী কারাগারের নিষ্পেষণী খর্পর থেকে আমার এই দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করার অদ্বিতীয় কৃতিত্বের জন্য নিজেকেই কি আমার ধন্যবাদ দেবার ইচ্ছে করে না একেক সময়?
.
১৭.
না বিইয়ে কানাইয়ের মা বলে না? বললেন ভদ্রলোক, আপনি দেখছি সেই রকম বিয়ে না করেই বলাইয়ের বাবা। বলাই বা বালাই যাই বলুন।
এ কথা বলছেন কেন? আমি শুধাই।
মানে, আপনার সেই হাওড়ার পরকীয়া গৃহিণীকে স্মরণ করেই কথাটা মনে পড়ল আমার। এতদিন তাঁর দৌলতে হয়ত আপনি অনেক ছাপোনার বাবা হয়ে বসেছেন …।
কিন্তু বালাই বলছেন কেন তাদের?
মেয়েরা ঘরের লক্ষ্মী হলেও ছেলেরা তো আপদ বালাই-ই। মায়ের কাছে তা না হলেও বাপের কাছে তো তাই বটে। ছেলেদের মানুষ করা যায় না যে। বেশির ভাগই তারা বাঁদর হয়ে যায়। সেই কারণেই।
বংশধররা বংশের ধারা রাখে কি না!
আদমপুর্বিক সেই ডারুইনের সূত্র ধরে তাদের হয়ে আমার সাফাই গাইতে হয়, মেয়েদের মনের মত করে গড়া গেলেও (এমনিতেই মেয়েরা মনের মত স্বভাবতই) ছেলেদের বেলায় সেটা একেবারেই খাটে না। তারা নিজের মতই হয়ে ওঠে। বাপের ধার ধারে না, ধারাও বজায় রাখে না। এই জন্যই কি বালাই? কিন্তু কোনো পুরুষেই তো বাপের ধার ধারেনি-পিতৃঋণ শোধ করতে চায়নি। পারেনি কেউ। আর মাতৃঋণ? মার ঋণ তো শোধ করাই যায় না। এবং……এবং মা তার বড় একটা প্রত্যাশাও রাখেন না। মা মা-ই। তার সঙ্গে কারো কি তুলনা হয়? আমি নিশ্বাস ফেলি-মার ঋণ কখনই আমরা শুধতে পারিনে। তাঁর কাছে আমরা চিরঋণী, আর তাই আমরা থাকতে চাই।
সে কথা তুলছি না। বলছিলাম হাওড়ার সেই আপনার পরকীয়া পত্নীটির খবর নিয়েছিলেন আর? ভদ্রলোক, মানে সেই ওরফে-টি নিশ্চয়ই ফিরে এসেছেন এর ভেতর, সুখে ঘরকন্না করছেন এতদিন।
অসম্ভব না। নানান অশ্বমেধের পর অনেক হৰ খেয়ে নিজের নিশ্চিত নীড়ে ফিরে এসে, রাজসুয়ের যোগ্য হয়ে রাজার মতই শুয়ে পড়েছেন এতদিনে আশা করি।
এবং আপনার আশাও পূর্ণ করেছেন আরো। আপনাকে পুত্র কন্যা খনে ধনী বা ঋনী যাহোক একটা করে আপনার সন্তান দুঃখও মোচন করে বসে আছেন আপনার সেই ওরফে বা বিকল্প–যাই বলুন।
অসম্ভব নয়। একালে আর সেই কল্পতরু তো নেই–এখন সবই বিকল্প–সব কিছুরই বিকল্প নিয়েই সুখী হতে হয় আমাদের। আমিও আমার সেই বিকল্পতরুর থেকে ধর্ম অর্থ কাম মোক্ষ চতুর্বর্গ লাভ করলাম। এমনকি, পুত্রকন্যাও পেয়েছি নিশ্চয়। যাকে বলে মোক্ষম লাভ।
তাহলে আপনার সব দুঃখ দুর হয়েছে বলুন।
সুখ আরো যে, নিজে না হতে পারলেও আরেকজনকে আমি স্বনামধন্য করতে পেরেছি। সাহিত্য জগতে দ্বিত্ব লাভ না কালে দ্বিজত্বলাভ করা যায় না; তারাশঙ্কর, বিমল মিত্র, সুনীল গাঙ্গুলির দু নম্বর বেরিয়েছেন। যে কারণে তারাশঙ্করকে শ্ৰী-হীন হতে হল মশাই! বাকী দুজন কী করেছেন জানিনে। আমারও যে অমনি একজন আছেন জানলেও আনন্দ।
কিন্তু তিনি তো লেখেন না আর! লেখক তো নন?
হতে কতক্ষণ? লেখা এমন কি শক্ত কাজ? আর, আমার লেখা এমন উঁচু দরের অননুকরণীয় কিছু নয় যে কারো পক্ষে এ ধরনের লেখা কঠিন হবে। ইস্কুলের থার্ড ক্লাসের ছেলেরাও আমার স্টাইলে আমার চাইতে ঢের ভালো লেখে, আমি দেখেছি–অবলীলায় এমনটা লেখা যায়। কেবল আমার পক্ষে লিখতেই যা দারুণ পরিশ্রম হয় মশাই!
কই, আপনার নাম নিয়ে কাউকে ক্লিখতে তোদেখা যায়নি এ পর্যন্ত। তিনি শুধানঃ আপনার স্বনামধন্য সেই ভদ্রলোকের কোনো লেখা কি চোখে পড়েছে আপনার?
এখন অব্দি না! আমার মতন থার্ড ক্লাস লিখিয়ে হতে চান না বোধ হয়। কিংবা আমার মৃত্যুর অপেক্ষায় রয়েছেন। আমি মরলেই তিনি কলম ধরবেন। আমি বিল হবার পরই তাঁর অবিরল হবে।
ভালোই আপনার। এও তো এক রকমের অমরত্বই।
নিশ্চয়ই। তাছাড়া, দেখছেন তো একালে অমর হওয়া শক্ত কত। নামজাদা লেখকরাও মারা যাবার পরই ডুবে যাচ্ছেন। পাঠকরা তাদের ভুলে যাচ্ছে একেবারে। সেকালে এক একটি প্রতিভা বহুদিন বাদ বাদ প্রদীপ্ত হতেন-তিনকাল ধরে প্রতিভূরূপে আলো বিলোনে অন্তত। এখন তো ঘন্টায় ঘন্টায় নতুন নতুন প্রদীপ জ্বলছে,-নিভেও যাচ্ছে তেমনি–এবং আলোর বন্যায় ভেসে যাচ্ছে দেশ। ভালোই তো বলতে গেলে।
তা বটে। তাহলেও মরবার পরে অমর হতে না পারলেও আপনি অন্তত ধারাবাহিক হতে পারবেন।
