তাই বলুন। তিনি হাঁফ ছাড়লেন–আমি ভেবেছিলুম…
ভেবেছিলেন আমি সর্বগুণান্বিত, এমন কি ঐ খুনান্বিতও? না, মশাই না, হয়ত বা ইচ্ছে থাকলেও অদূর আমি এগুতে পারিনি। সাধ ছিল বটে, সাধ্য ছিল না–কবির ভাষায় বলা যায়। আমার দৌড় ওই মসজিদ অবদিছিঁচকে ব্যাপার-প্রাণ বাঁচানোর দায়ে-করা ছিঁচকেমি যত। ছিচকাঁদুনি আর গাইতে চাইনে। বাঁচতে হলে মানুষকে এক আধটু ক্রাইম করতেই হয়–অবশ্যি সবদিক বাঁচিয়ে আইনের দিকটাও-না হলে চলে না। আর বাঁচার মন বাঁচতে হলে সময় সময় কিছু কিছু সিন না করলেই নয়। এই আমার ধারণা। তবে বাঁচোয়া এই যে, তার অনেকখানিই আমরা মনে মনে সারি–বাহ্যত এবং কার্যত পারি না। বেশির ভাগই আন্তরিক উপভোগ। আমি যোগ করি : আর আসলে সুখ দুঃখ তো আমাদের মনেই মশাই! জন্মভূমির মতন আমাদের মনোভূমিও তো স্বপ্ন দিয়ে তৈরি এবং স্মৃতি দিয়ে ঘেরা। স্বপ্নসাধ আর স্মৃতিসুখ–এই নিয়েই তো আমাদের আধখানা বাঁচা। আদ্ধেক জীবন।
সমাজে বাস করে অপরাধপ্রবণ হওয়া উচিত নয়। তাঁর সুচিন্তিত অভিমত।–অপরের চেয়েও নিজের মনেই তার প্রতিক্রিয়া বেশি হয়।
তা তো বটেই। জানি, অপরাধ করলে একটা অপরাধবোধ সর্বদাই মনের মধ্যে খোঁচায়, তেমনি আবার কোনো কোনো অপরাধ না করলে নিজের কাছে অপরাধী হয়ে থাকতে হয়। পস্তাতে হয় জীবনভোর।
জানি না ঠিক। এবার শুনি আপনার কারাবাসের কাহিনী। সময়টা খুব কষ্টের ছিল নিশ্চয়?
কষ্ট কিসের! অমন সুখের সময় আর আসেনি আমার জীবনে। আমার বিশ্বাস সহজে লোকে জেলে যেতে পারে না বলেই সাধ করে বিয়ে করে-ওই জেলে না যাওয়ার দুঃখ ঘোচাতেই। ওই জাতীয় একটা সুখের লোভে নিজের বাড়িতে জেলখানা এনে বানায়। হাতে পা শেকল বাঁধে।
তবে জেলখানাকে নরক ভোগ বলে কেন মশাই? আমার কথায় তিনি বেশ একটু অবাক হন।
ভিন্ন রুচির লোক হয়ে থাকে না? তাই হবে বোধহয়। জেলখানার বিচার তো জেলের খানা দিয়েই। প্রেসিডেন্সি কি আলিপুরের জেলে থাকতে-কানটায় ছিলাম জানিনে, তবে এটা বলতে পারি, যেখানেই এই চুয়াল্লিশ ডিগ্রী বিরাজিত সেইখানেই–খাওয়াটা ছিল একেবারে যাচ্ছেতাই। একটা জগাখিচুরির মতন খেতে হতো আমাদের নাম ছিল তার লপসি। সহজে গলা দিয়ে গলতে চাইত না। কিন্তু সেখানকার সেল থেকে বেরিয়ে বহরমপুরের জেলে গিয়ে যেন হাতে হাতে স্বর্গ পেলাম। সেখানকার খানাই ছিল আলাদা। মাথাপিছু তিন টাকা করে বাধা ছিল সবার–সেই টাকায় কী ইলাহী খাওয়া হোত যে। তা কহতব্য নয়।
বটে বটে?
সেখানে গিয়ে জে এল বাঁড়ুয্যে, নজরুল ইসলামের দেখা পেলাম। আলাপ হোলে কবি বিজয় চাটুজ্যে, বিপ্লবী বীর পূর্ণ দাসের সাথে। আরো কে কে যেন ছিলেন, মনে পড়ে না এখন-তাঁদের প্রত্যেকেই দিপাল। কাজী বলত, হোটবেলায়, সে নাকি কোথায় বাবুর্চির কাজ করেছে–সব রকমের রান্না জানে! প্রমাণ দেবার জন্যে সবার রান্নাটা সে-ই করত। আর কী খানাই যে বানাত কী বলব! বিরিয়ানি পোলাও থেকে শুরু করে চপ কাটলেট কোপ্তা কোর্মা কাবাব কারি–কাবাব আবার দুকিসিমের-শিক্ এবং নন-শিক্-কারিকুরি কত না!
রান্নাবান্না ছাড়া আর কিছু করত না কাজী?
আর গানে কবিতায় আবৃত্তিতে গল্পগুজবে আড্ডায় মাতিয়ে রাখত। এমন মজার মজার কথা কইত সে! অমন প্রাণোচ্ছল প্রদীপ্ত যুবক জীবনে আমি আর দেখিনি। খানাকুলের থেকে আমি কৃষ্ণাগরের দিকে এগোই–তার প্রেমের গান সেইখানেই শুনেছিলাম। তার বিদ্রোহের কবিতার পাশাপাশি দোলনচাঁপার কাহিনী! প্রেমের স্মৃতিচারণ তার অবিস্মরণীয় যতো গজল। সোজা গজালের মতন গিয়ে গেঁথে যায় মগজে।
বিদ্রোহের গানটান গাইতো না? গাইত না আবার! তার বিদ্রোহী কবিতাটার আবৃত্তি তার মুখে মুখে বার বার শুনলাম। আর বিপ্লবের যততা গান।কারার ঐ লৌহকপাট/ভেঙে ফ্যাল কর রে লোপাট রক্তজমাট। শিকল পূজার পাষাণবেদী/ওরে ও পাগলা ঈশান/বাজা তোর প্রলয় বিষাণ/রক্তনিশান/উড়ুক প্রাচীর প্রাচীর ভেদি। মনে হয় এ-গানটা তার ঐ জেলেই বাঁধা। কী উল্লাসে গাইত যে।
আর কী করত কাজী?
তাছাড়া কবিগুরুর গানও গাইত একেক সময়। তার মুখে কবির ঋতু পর্যায়ের গানগুলো এমন ব্যঞ্জনা পেত যে বলা যায় না। তোমারি গেহে পালিছ স্নেহে/ তুমি ধন্য ধন্য হে কবির এ গানটার এমন চমৎকার এক প্যারডি বেঁধেছিল সে। গেয়ে গেয়ে সেটা শুনিয়েছেও আমাদের।
গানটা কী শুনি।
আমি তো গাইতে পারব না, শোনাতে পারি–তোমারি জেলে/পালিছ ঠেলে/তুমি ধন্য ধন্য হে! / তোমারি অশন/তোমারি বসন/তুমি ধন্য ধন্য হে!
আপনারা বেশ আরামেই ছিলেন দেখা যাচ্ছে সেখানে। তবে জেলখানাকে এত মন্দ। জায়গা বলত কেন লোকে?
মন্দের ভালোটা তারা দেখতে পেত না তাই। ভালোর ভালো বলে এই দুনিয়ায় কিছু তো নাই। মন্দের ভালোই সত্যিকার ভালো। তাই নিয়েই খুশি থাকতে হয়। আমাদের কবিও কি সেই কথাই বলে যাননি? অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো। সেই তো তোমার আলো/ সকল দ্বন্দ্ববিরোধ মাঝে জাগ্রত যে ভাললা/ সেই তত তোমার ভালো! বলেননি কি তিনি?
জেলখানাটা আপনার বরাতে দেখছি এক রাজঘোটক হয়ে গেছে।
নিশ্চয়। আমার স্বনামধন্য সেই ভদ্রলোক আমার হয়ে কষ্ট করে পাশ-টাশ করেছেন, বে-থাও করেছন, সেজন্যে আমার কোনোই ব্যথা নেই, কিন্তু কী ভাগ্যি, তিনি আমার হয়ে এই জেলটাও খাটেননি–তাহলে, সত্যিই! কী সর্বনাশ যে হতো আমার! এইসব অন্তরঙ্গদের সঙ্গসুখ পেতাম না। যথার্থই সর্বহারা হতাম। রাজযোটক তো বটেই। যত রাজাগজার সঙ্গে যোগাযোগ সেই সুযোগেই আমার ঘটল তো! আর সেই খানা! জেলখানার সেই খানা। আহামরি! কার সঙ্গে তার তুলনা করি। মনে পড়লে এখনো জিভে জল সরে। আমি নিজেকে যেন সজিভ বোধ করি আবার। আহা, তেমনটি আর জীবনে কখনো খাইনি।
