.
১৬.
তাহলে এই পটানো কাজটি আপনার নয় আপনি বলতে চান? জিজ্ঞেস করেন ভদ্রলোক।
কী করে বলি? আপনার সম্বন্ধে কি সঠিক কখনো জানা যায়? নিজের রহস্য কি টের পায় কেউ? আপনার অন্ত মিলেছে কারো? সেই গুরু গোবিন্দর পর বলুন, পেয়েছি আমার শেষ–এমন গুরুতর কথা কটা লোক আর আওড়াতে পেরেছে? হাজার আত্মবিদ্ধ করেও আত্মবিদ্ধ হয় না মশাই! এই কথাই আমি কইতে চাই।
সোজাসুজি বলুন না গো! অত ঘোর প্যাঁচে যাচ্ছেন কেন!
কিন্তু সহজ কথা যায় কি বলা সহজে। আমাদের কর্মকান্ডর বিবরণ বিশদ করা কি সোজা? কটা কাজ আমরা প্রকাশ্যে করি–কতটাই বা আমাদের জ্ঞাতসারে হয়? প্রদীপ জ্বালার আগে যেমনটা সলতে পাকানো, অনেকটা তো আমাদের অন্তর্লোকের অবচেতনায় ঘটে থাকে। ক্রিয়াকলাপের বেশির ভাগই আমাদের অন্তরগত, লোকলোচনের অন্তর্গত হবার নয়।
এমন কাজ আপনি করতে পারেন বিশ্বাস হয় না।
বিশ্বাস হয় না যথার্থ। আমারও। আবার অবিশ্বাস করতেও প্রাণ চায় না। এমনতর নিজের নৈপুণ্য মনে মনে আমি কল্পনা করেছি অনেক। পটনকর্ম তো একটা শিল্পকর্মই, মশিল্পও বলা যায়। পটনশিল্পী-পটশিল্পীর চেয়ে কিছু কম নন। আর, আমি কি এককালে (এই লিখিয়ে না হয়ে) পটুয়া হতেই চাইনি? চায় না কি লেখকরা? বিস্তর লেখালেখির পর রেখার হরিহরছত্রেও কি পটুতা দেখা যায়নি কারো কারো?
সুন্দরদের শুধু চিত্তপটে ধরে না রেখে (ক দিনই বা রাখা যায় অমন করে?) চিরদিনের
তরে চিত্রপটে বেঁধে রাখতে চাইনি কি?
দেখুন, এ বিষয়ে আমি সন্দেহবাদী, জনাবাহাদুরের প্রতি আমার জবাব : সব ব্যাপারের মত এখানেও আমার একটুখানি সংশয় আছে। আমার কী মনে হয় জানেন-হয়ত আমিই করেছিলাম এই কর্ম, কিংবা হয়ত…হয়ত বা আমার মন অন্য কোনো ব্যক্তি এই দুঙ্কা করে থাকতে পারেন। পটিয়সীদের ওপর পটিয়স হবার দক্ষতা আমার আছে জানলে স্বভাবতই আমার গর্ব হয়, কিন্তু কে জানে, আমার ওপরেও টেক্কা মারার মন আরও কোনো টেকচাঁদ ঠাকুর থাকতে পারেন। আমার চাইতেও বাহাদুর কেউ নেই কি আর?
তাহলে আপনার কোনো বল? আপনি বলতে চান অবিকল।
ঠিক ধরেছেন আপনি। আমার প্রবল সন্দেহ তাই। ফুরার হিটলারে যেমনটি ছিল বলে শোনা যায়-তারা বোধ হয় কখনো ফুরাবার নন। সুভাষচন্দ্রের নিরুদ্দেশের পর আমি একবার ওয়েলিংটন-ধর্মতলার মোড়ে কল্পতরু আয়ুর্বেদ ভবনে সুভাষচন্দ্রের মতন বজনি একজনকে ঢুকতে দেখে অবাক হয়ে গেছলাম, পরে জানা গেল, উনি সেই গণনায়ক নন, কবিরাজ গণনাথ সেনেরই কে যেন হন। দেখেছিলেন নেতাজীর অন্তর্ধানের পরে? সত্যি?
তা বই কি। সেই রকম কেউ হয়ত আমার অনুরূপ ধারণ করে আমার ওপরে এই হটি করে যাচ্ছেন বারংবার–যদিও তাঁর সঙ্গে আমার মুখোমুখি ডেড হীট হয়নি এখনো অব্দি। তিনিই হয়ত আমার বিয়ের সাধটা মিটিয়ে গেছেন। আমার বংশরক্ষার শখও মিটিয়েছেন কি না কে জানে।…তাহলে তো আমার…..আমাদের উভয়েরই মৃত্যুর পর জলপিণ্ডির ব্যবস্থা করে রেখেছেন।
পুত্রপিণ্ডের প্রয়োজনেই ভার্যাবরণ করা হয়, শাস্ত্রে বলে। জানি।
যাঁ। আর পুত্রপিণ্ডের ভরণপোষণ, মানুষ করার দায় থেকে বেঁচে গিয়ে নিখরচায় যদি ঐ পুত্রপিন্ড, পুত্র আর পিণ্ড, আলাদা আলাদা, রঙ্গমঞ্চের নেপথ্যে কারো সৌজন্যে পাওয়া যায় মন্দ কি?
আপনি ভাগ্যবান। খেটে মরলো হাঁস, ডিম খেলো দাবোগাসাহেব।
তাই তো হয় মশাই, এক-একজনের বরাত অমনিধারা। বর না হয়েও কনে পায় তারা–ঘরের কোণেই মিলে যায় অবলীলায়। আমার কী মনে হয় জানেন? ঐ মহাপ্রভু। উনিই। আমায় কোনো মেয়ে দিয়েছেন কি না এখনো জানিনে, তবে আমায় ঐ এম-এ ডিগ্রীটা–আমার ধারণা, ওঁরই অবদান।
সেই লোকটার কাণ্ডই বলছেন?
সে ছাড়া কে আর? তিনিই অঙ্ক মিলিয়ে অতগুলো পরীক্ষা পাস করেছেন, আবার অঙ্কশায়িনী মিলিয়ে দিয়েছেন তিনি–তাঁর দয়ায় কোনো দুঃখ অভাব নেই আর আমার।
দুঃখ ছিল নাকি কখনো?
ছিল না? কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখ দেখিনি, সেজন্য কেমন যেন একটা নিঃস্ব বোধ করতাম নিজেকে–বৌ নেই বলেই কি কম ক্ষোভ ছিল এককালে? তাঁর কৃপায় নাক গেল না, কিন্তু নরুন মিলল-কষ্ট করে পড়াশুনা করতে হল না, অবহেলায় ডিগ্রী জুটে গেল। সেকালে, জানেন, নামের পেছনে বি-এ, এম-এর লেজুড় লাগানোর রেওয়াজ ছিল বেজায়। একালে কেউ তেমন পোঁছে না, কিন্তু তখন এর যেমন বাজারদর তেমনি নাকি কদর। যাই হোক, এহেন দৌলত তাঁর দৌলতেই তো!
গাছে না উঠেই এক কাঁদি-কোনো কাদাকাঁদি না করেই। আমার কথায় তার সায় দেওয়া-আপনার ভাষায় প্রকাশ করলাম মশাই; মাপ করবেন। ব্যারামটা ছোঁয়াচে কি না।
হ্যাঁ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রীটা তাঁর সৌজন্যে হলেও, চুয়াল্লিশ ডিগ্রীটা পাওয়া স্রেফ আমার নিজের জন্যেই। সম্পূর্ণ আমার কুতে। বিলকুল স্বোপার্জিত। আমি জানাই।
চুয়াল্লিশ ডিগ্রীটা কী আবার? কোথাকার কলেজের?
আলিপুর জেলের। পাঁচ হাত লম্বা, হাত চারেক চওড়া ছোট ঘোট খুপরি-বাইশটা করে সারি সারি দু লাইনে সাজানো-খুনের আসামীদের ফাঁসি দেয়ার আগে আটক রাখা হয় সেখানে।
শুনেই তিনি চমকে উঠেছেন-ও বাবা! আপনি খুনও করেছিলেন আবার?
না। আমার তরুণ বয়সে কলকাতায় এসে এক যুগান্তকারী পত্রিকা প্রকাশের জন্য খুন। হয়েছিলাম। দেশবন্ধু দাশের অর্থ সাহায্যে আগেকার যুগের যুগান্তর পত্রিকাটার নবপর্যায়ে পুনরুজ্জীবন করেছিলাম। ফলে যা হবার। জেল হয়ে গেল। তখনকার কালে যাতে না পালাতে পারে, সে কারণে ওই রাজবন্দীদেরও রাখা হোতত সেই সব খাঁচায়। উপেন বাঁড়ুজ্যে বারীন ঘোষ উল্লাসকরের আত্মজীবনীতে নিশ্চয় ওর সবিশেষ বর্ণনা পেয়েছেন।
