বলে একটু থামেন মা–আর, তুই যদি নিজের চেষ্টায় কখনো খুব বড়লোক হোস, তাহলে তোর নিজের অর্থ অপরকে দিয়েই সেই ভগবানকেই তুই বিলিয়ে দিবি। তোর সেই দানই ভগবান তখন। সেই ভগবানের দান, ভগবানকেই দেওয়া–বুঝেছিস। মানে, যা পাবি…..রূপই হোক, শিল্পই হোক, অর্থই হোক, তা পেয়েই তোকে দিতে হবে-দিলেই তুই পাবি আবার। পেলেই দিবি, দিলেই পাবি–এমনি ধারা একটি মজার খেলা চলছে দুনিয়ায়।
দিলেও তেমনি কিছু পাওয়া যায় না রে! দিলেও তেমনি কিছুই পাওয়া যায় না–এটা একটা রহস্যই।
বুঝেছি মা। আমি যদি বড়লোক হই, তবে আমাকে পেয়ে পেয়ে দিতে হবে, যদি গাইয়ে ই তো গেয়ে গেয়ে দিতে হবে। নইলে সত্যিকারের পেয়েছি কি না, তা আমি টের পাব কি করে? তাই তুমি বলছ তো?
হ্যাঁ, তাই। নইলে, তোর লাখ টাকা মাটির তলায় পোতা থাকলে কার কী! তোরই বা কীসের! অন্য কেউ ভাগ পেল না বলে টাকাটা তোর ভাগ্যেও এল না।
আর যদি আমি কাউকে ভালোবাসি মা, তাহলে কিন্তু খালি দিয়ে গেলেই চলবে না, সেখানে আমায় দিয়ে দিয়ে পেতে হবে–যেমনটা কিনা পেয়ে পেয়ে দিতে হবে। তা নইলে ভলোবাসা হল কোথায়? তা তো কখনো একতরফা হয় না মা। সেখানে আমায় চেয়ে চেয়ে দিতে হবে, দিয়ে দিয়ে চাইতে হবে–তাই তো?
এই বয়েসে তোর এত ভালোবাসার ধান্দা কিসের রে? আমি যে তোকে এত ভালোবাসি আমি কি তোর ভালোবাসা চেয়েছি কখনো চাই কখনো?
তোমার ভালোবাসাই আলাদা। আমি জানাইঃ মার ভালোবাসার কি তুলনা হয় কারো সঙ্গে?
দুটো হাতই মুক্ত রাখতে হয়–পাবার আর দেবার। দেওয়ার আর নেওয়ার। মুক্ত হস্তে দিবি, মুক্ত হস্তে নিবি। আদান-প্রদান একই খেলার এদিক ওদিক। যেমন নিতে হয়, তেমনি দিতে হয়–নইলে, ভগবানের দান মেলে না। মনে কর না, বাইরে ভগবানের ঝড় বয়ে যাচছে, কিন্তু তোর ঘরের একদিকের একটি মাত্র জানালা খোলা রাখলে তার একটু হাওয়াও কি তুই পাবি?
একেবারে পাব না? বাইরে ঝড় বইলেও তার ঝাঁপটা লাগবে না আমার ঘরে? একটুখানিও না? আমি জানতে চাই।
একদিকের একটা জানালা খোলা থাকলে-মা বলেন, সেই হাওয়ার ছিটেফোঁটা হয়ত আসতে পারে তোর ঘরে–কিন্তু ঘরের দুধারের জানালা যদি খুলে রাখিস তো সেই ঝড় তোর ঘরের ভেতর দিয়ে হু হু করে বয়ে যাবে। তাঁর কৃপার জন্য দুটো দরজাই খোলা রাখতে হয়–আসার এবং যাবার।
তা হলেই তাঁর কৃপার পার পাওয়া যায় না-মার কথার ওপর আমার টিপ্পনি কাটি মার লকের ওপর আমার এক কাঠি।
বেশ বলেছিস। কেবল ভগবানের দিকে ওপনিং থাকলেই হবে না, মানুষের দিকটাও ওপন রাখতে হবে, নইলে ভগবান তোর বাতায়নে এসে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যাবেন। ঈশ্বরের কাছ থেকে যা আমরা পাই তা আবার কড়ায় গন্ডায় আমাদের কিরিয়ে দিতে হয় তাঁকে–কিন্তু সরাসরি তাঁকে দেবো কি করে? তাই পৃথিবীকে দিয়েই তাঁকে দিতে হয়। মানুষকে দিলেই তিনি পান। নইলে পান না-পেতে পারেন না।
মানে, তাঁর দেওয়াটা একেবারে দান না? ধার দেওয়া কেবল? তার মধ্যে ফিরিয়ে দেবার কড়ার রয়েছে আবার? সুদ দেবার-শুধে দেবার কড়াকড়ি?
আছেই তো। কেবল যোগ করলেই হয় না তো, বিয়োগ করতেও হয়–তবেই কিনা অঙ্ক মেলে। যোগবলে কী পেলি বিয়োগ ফলেই তো তা টের পাবি রে। যোগবলের চেয়ে ঐ বিয়োগবল বড়ো-বুঝেছিস?
আর ই বিয়োগ ফলটাই শেষ ফল মা–তাই না? এত যোগবল আর যোগফলের পরেও শেষের তোমার ওই প্রাণ বিয়োগ। আমার দীর্ঘ নিশ্বাস।
মা থাকতে মৃত্যু কোথায়? আবার তিনি এমনি জন্ম দেবেন–ভয় কিসের?…তোকেও। দেবেন আমাকেও দেবেন।
তুমি তো বললে মা যে, ভগবানের কাছ থেকে যা আমরা পাই, তা আমাদের মানুষকে ফিরিয়ে দিতে হয় আবার। বললে না তুমি? কিন্তু একটা জিনিস আছে মা, যা নাকি কাউকে চেষ্টা করে পেতে হয় না, কষ্ট করে দিতে হয় না। টাকাকড়ি পরকে দিতে গেলে সব দিক দেখতে হয়, এমন কি, তোমার ঐ ভালোবাসাও-কাউকে দিতে যাওয়া তেমন সোজা নয়কো মা। অনেক চেয়ে চেয়ে পেতে হয়–দিতে হয়।
জিনিসটা কী তোর–শুনি?
রূপ। ও তো যে পায়, এমনিতেই পায়, অমনিই পেয়ে থাকে। অপরকে দিতেও তাকে কোনো বেগ পেতে হয় না। যেমনি পাওয়া অমনি তার দেওয়া। না দিয়ে উপায় নেই তার-ঝরনা যেমন আপনার থেকেই সর্বক্ষণ ঝরছে।
রূপ তো ভগবানেরই বিভূতি রে। তাঁরই ঐশ্বর্য-যে পায় তার মতন ভাগ্যবান কে আর? সবাই কি তা পায়?
যেমন কিনা রিনি–মানে যে ঐ জিনিস পেয়েছে, সে তার কাছে ঋণী হয়েও সেই ঋণী নয়–তাকে আর কষ্ট করে পরকে দান করে তা শুধতে হয় না। সে দেখা দিলেই তার দেওয়া হয়ে যায়, তাকে দেখতে পেলেই পাওয়া হয়ে গেল আমার-দর্শন দান আর দর্শন লাভ যুগপৎ! আশ্চর্য নয় মা?
আশ্চর্য বই কি! পরমাশ্চর্যই। পরম ঐশ্বর্যও আবার। মা বলেন-রূপ তো ভগবানেরই প্রকাশ-সেখানে তিনি প্রত্যক্ষ হয়েছেন।
অমনি আরেকটা জিনিসও আছে মা, যা নাকি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পাওয়া হয়ে যায়-খাওয়ার সাথে সাথেই খাওয়ানো। সেও কিছু কম আশ্চর্য নয় মা! মি বলি-তর চেয়ে বড় অবদান বিধাতার কিছু নেই অর
কিসের কথা বলছিস তুই? কিসের কথাই বলছি তো মা! বলতে গিয়ে আমি ঢোক গিলি-ওর বেশি আর বলি। সব কথা কি সবাইকে বলবার? গুহ্য কথা গুরুজনদের কাছে ব্যক্ত না করাই শ্রেয়ঃ। পূজ্যদের কাছে উহ্য রাখাই বিধেয়।
