বাবার বইটির আরো ছত্র, আমার জন্ম কাহিনীর সঙ্গে জড়ানো বলেই বোধ করি, আমার স্মরণে রয়ে গেছে এখনো–
বঙ্গাব্দ তেরশ দশ প্রাতে রবিবার
সাতাশে অগ্রহায়ণ শিবের কুমার
শিবরাম জনমিল লীলাশ বাজাইল
শিবহৃদে উপজিল আনন্দ-অপার।
লীলাশঙ্খটা কী মা? শুধিয়েছিলাম আমি মাকে : রবিবাবুর কবিতায় লীলা কমলের মতই কোনো জিনিস-টিনিস নাকি? লীলাখেলা করবার?
না রে, তুই যখন জন্মালি না, জন্মানোর সময় শাঁখ বাজাতে হয় তো, তখন যে মেয়েটা তোর জন্মাবার সময় শাঁখ বাজিয়েছিল তার নাম ছিল লীলা। মা জানালেন আর জানিস, তুই যখন হলি না, সূয্যিঠাকুর উঠল ঠিক সেই সময়টায়-একসঙ্গেই এলি তোরা দুজনায়।
সূয্যিঠাকুরের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে এসেছিলাম বলছ না নিশ্চয়?
কে জানে! আর তুই জন্মেছিলি তোর দুহাত খুলে-সেটা একটা ভারি আশ্চয্যি ব্যাপার। আশ্চয্যি কিসের?
সব ছেলেই জন্মায় দু হাত মুঠো করে-তাই নিয়ম। তুই এসেছিলি একেবারে খোলা হাতে। নানা জনে নানান ব্যাখ্যা করেছিল তার।
কি রকম?
কেউ বলল, এ ছেলে এক নম্বরের উড়চন্ডী হবে, কিছু এর হাতে থাকবে না, কোনো জিনিস ধরে রাখতে পারবে না। কতজন কত কী বলল। তোর বাবা বলল যে, এ ছেলে কাউকে বাঁধবে না, কারো কাছে কোথাও বাঁধা পড়বে না। আমার ছেলে তো! আমার মতই হবে। জন্মসন্ন্যাসী। মুক্ত হাতে এসেছে, মুক্ত হতে যাবে-সর্বদা মুক্ত হও। মুক্ত পুরুষ। এই কথা বলতো তোর বাবা।
মুক্ত পুরষ! মুক্ত পুরুষ কী মা? আমি জানতে চাই; অগাধ সমুন্দরের ডুবুরি যারা, মুক্তো খোঁজে, শুক্তি খুঁজে বেড়ায়, তারাই কি? নাকি, যারা মুক্তি খোঁজে তারা?
যারা মুক্তো খোঁজে তারাও-যারা মুক্তি খোঁজে তারাও।
মুক্তো তো খুঁজতে হয় সমুদ্রের তলায় গিয়ে। আর মুক্তি তো খোঁজে মানুষ ভগবানের কাছেই-তাই না মা? ভগবানই তো মুক্তি দিতে পারে-তাই না? বইয়ে তো সেই কথাই বলে থাকে। আমি শুধাই : আমি যদি মুক্তি চাই তো ভগবানের কাছেই চাইতে হবে আমায়। তাই তো?
চাইতে পারিস। কিন্তু মুক্তিটা দিতে হবে তোকেই। ভগবানের তোকে মুক্তি দেওয়ার মানে হোলো, মানে তার অপর মানেটা, তোরই ভগবানকে মুক্তি দেওয়া অন্য কথায়।
তার মানে? মানে, ভগবান তোকে কী মুক্তি দেবে রে? তোর কাছ থেকেই তাঁকে নিজের মুক্তি নিতে হবে। তুই-ই মুক্তি দিবি ভগবানকে। তুই মুক্তি দিলে তবেই তিনি নিজের মুক্তি পাবেন। সেটা তোর মুক্তি বল বা উন্মুক্তি বল–যা খুশি।
খুলে বলল না মা! খোলসা করে কও?
মা তখন কথাটার খোলস ছাড়াতে লাগেন-যেমন ধর এই সূর্য। সূর্যর ভেতর দিয়ে ভগবান আলো হয়ে মুক্তি পাচ্ছেন, আলো বানিয়ে সূর্যই ভগবানকে মুক্তি দিচ্ছে একথাও তো বলা যায়। সূর্য তাঁর বাহন। বলা যায় যে, ভগবানই আলো হয়েছেন, কিন্তু সূর্যটি না হলে হতে পারতেন কী? সূর্যের যেমন ভগবানের দরকার নিজের আলোর জন্যে, তেমনি ভগবানেরও ঐ সূর্যটিকে চাই আবার। দুজনের না হলে দু-জনার চলে না।
এই জন্যেই কি দেবতাদের সব বাহন থাকে মা? মা দুর্গার যেমন সিংহ, সরস্বতীর যেমন কিনা হাঁস…। আমি ফাঁস করতে যাই।
বলতে পারিস। তা হলে দ্যাখ ভগবান যেমন তোকে মুক্তি দেবেন, তুইও তেমনি তাঁকে মুক্তি দিবি। কেবল নিজেকে নিয়ে কারো চলে কি রে? একক চেষ্টায় মুক্তি মেলে না, আরেক জনকে চাই। নইলে, ভগবান তো গোড়ায় একলাই ছিলেন আপনি, হাজারটা হতে গেলেন নে তবে? ওই জন্যেই তো। হাজার জনের ভেতর দিয়ে হাজার রকমের মুক্তির স্বাদ পাবেন–সেই জন্যেই না! হাজারটার মজাই আলাদা।
হাজা মজা যে বলে থাকে মা, তা বুঝি এই? আমি কই-ভগবান আমাদের হেজে মজে গেছেন?
তোর যতো সব উল্টোপাল্টা কথা! কোনোই তার মাথামুন্ডু নেই! কথার মাঝখানে বাধা পেয়ে মার ব্যাজার ভাব।–বড় হলে বুঝবি এসব।
না না, এখনই বুঝছি। এখনই বুঝব। তুমি বলে যাও। শুনছি তো আমি এই যে! কান খাড়া করে দেখাই।
তা হলে দাঁড়ালো কী? ভগবান যেমন তোর মুক্তিদাতা, তুইও তেমনি তাঁর মুক্তিদাতা– কিংবা উন্মুক্তিদাতাও বলতে পারিস। তোরা দুজনেই, যাকে বলে পরস্পরের পরিপূরক। গতিমুক্তি–আশা-ভরসা।
তাহলে আমি…আমিই তো…না, আমি ঠিক নই…মানুষই তো তাহলে বিধাতার চেয়ে বড়ো হয়ে গেল মা? অত বড় বিধাতাকে, ধারণাই করা যায় না যার, এই একটুকুন মানুষ মুক্তি দিচ্ছে?
হলই তো এক পক্ষে। তার সসীম দেহের ভেতর দিয়ে, তার আয়ুর গভকালের মধ্যে সেই অসীমকে, অখন্ডকে সবার কাছে নিয়ে…গভীর মাঝখানে ধরে বেঁধে ছেড়ে দিচ্ছে এনে…..একপক্ষে হলই তো সে। মুহুর্মুহু মৃত্যুর শিকার হয়েও সর্বদা ভগবানের অঙ্গীকার লাভে সে মহৎ।
আর সব মানুষের কথা থাক, বড় বড় মানুষের কথায় আমার কাজ নেই, আমায় বলল তুমি কী করে আমি মুক্তি পেতে পারি? কিংবা, তোমার কথামতন আমার ভগবানকে মুক্ত করতে পারি আমি? সেই কথাটাই বলো তুমি আমায়।
ভগবান প্রকাশ পান রূপে আর অপরূপে-মানুষের দেহ–সুষমা আর তার শিল্পকলার সৃষ্টি-মহিমায় তিনি ধরা দিয়েছেন। তুই যদি কবি হোস, তা হলে তোর কবিতাই হবে তাঁর মুক্তি, যদি দেখতে সুন্দর হোস, তবে তোর সেই, সৌন্দর্যেই তিনি উম্মুক্তি পাবেন। রকমটা এই আর কি! ভগবানের বাহন হতে হবে তোকে। কাউকে তিনি আপনার থেকেই নিজের বাহুন বেছে নিয়েছেন, কারু আবার তাঁকে যেচে তাঁর বাহন হতে হয়েছে। ঠাকুরকে তিনি বেছে নিয়েছিলেন, বাণীরূপে তিনি মুক্তি পেয়েছেন সেখানে। আর রবিঠাকুরকে যেচে নিতে হয়েছে…নিজের কাব্যসাধনায় তাঁর সে অন্তরদেবতাইে তিনি উন্মুক্ত করেছেন।
