উপস্ত্রী? তাই বলছেন তো! তাহলে বলি। বলে আমার পঞ্চ ম-কারের পঞ্চমটিকে ধরে টানি, তাহলেও আপনার হাওড়ার সেই মেয়েটির খবর জানা নেই যাকে নিয়ে আমি হাওয়া হয়েছিলাম একদিন…
তাই নাকি? জানি না তো।
জানবেন কি করে? আমি নিজেই জানতাম নাকি! খবরটা ধরা পড়ল হঠাৎ। আমার এক কিশোর বন্ধু একদিন বিবাহ রেজেস্ট্রি আপিসে গিয়ে খবরটা জেনে এসেছিল। তার এক দূর সম্পর্কের মাসির সঙ্গে আমার এক সুদূর সম্পর্কিত খুড়োর অসবর্ণ বিয়ের নোটিশ দিতে গিয়ে রেজেস্ট্রি আপিসে গিয়ে দেখে এসেছিল যে, সেখানকার নোটিশ বোর্ডে হাওড়ার কোন মেয়ের সঙ্গে এক শিবরাম চক্রবর্তীর বিয়ের নোটিশ রয়েছে। জানলাম তার কাছে-তারপর আমি তার সঙ্গে গিয়ে নিজের চক্ষুকর্ণের বিবাদ ভঞ্জন করে এলাম।
দেখলেন আপনাদের বিয়ের নোটিশ?
দেখলাম বইকি! তারপর কিছুদিন বাদ একটু সময় সুযোগ পেতেই হাওড়ার ঠিকানাটায় গিয়ে সেই মেয়েটিকেইও দেখে এসেছি।
কী দেখলেন?
দেখতে নেহাৎ মন্দ নয়। তবে ভারী বিষণ্ণ চেহারা। তাহলেও তেমন মেয়েকে বিয়ে করে সুখী হওয়া যায় মনে হোলো। কিন্তু বিয়ের সুখ তার কপালে সইলো না…তার বিষণ্ণতার কারণ জানা গেল…
বিধবা হয়ে গেল না কি? বিয়ের পর মারা গেল সেই লোকটা? মানে সেই শিবরাম–
তার চেয়েও খারাপ। পড়শীদের কাছে জানতে পেলাম বিয়ের পর লোকটা মেয়েটির গয়নাগাটি সব নিয়ে উধাও হয়েছে। তার কোনো পাত্তাই নেইকো আর।
তাই নাকি?
তাই তো বললেন, প্রতিবেশী সেই ভদ্রলোক। কে লোকটা, শুধাতে জানালেন কোথাকার কে এক লেখক মশাই এই শিবরাম চক্কোত্তি! গল্পটল্প লেখে-টেখে। বইটই আছে নাকি তার। তার লেখা পড়েই নাকি পটে গেছল মেয়েটা, পস্তাচ্ছে এখন। ফুসলে বিয়ে করে এখন তার যথাসর্বস্ব নিয়ে সে হাওয়া!
আপনারই কান্ড নাকি মশাই?
কে জানে! কোনো লেখকের পক্ষে অসম্ভব কিছু নেই। তবে এতদিন আমি মেয়েদেরই অঘটন ঘটনপটিয়সী বলে জানতাম। তাদের ওপরেও যে পটীয়ান লোক থাকতে পারে সে ধারণা আমার ছিল না।
.
১৫.
আমি চারুদার মতন গল্প লিখিয়েই হব না হয়। মাকে আমি বলেছিলাম– কৃত্তিবাসের মত কবি নাই বা হলাম। সেও কিছু কম কীর্তি হবে না মা।
ছেলে-চারুর মত গল্প লিখবি তুই? বলিস কী রে?
পারব না লিখতে? চারুদার ভাতের জন্মকথা বইটা বিস্টুর কাছ থেকে নিয়ে পড়েছি চমৎকার! অমনতর লিখতে পারলেও তো মন্দ হয় না।
তুই কী লিখবি? ডালের জন্মকথা? হাসলো মা : চারুকে তো প্রবাসীর পাতায় পাতায় খি। তোকে তা হলে এরপর ডালে ডালে ঘুরতে দেখা যবে!
ঠাট্টা করছো মা? কেন, ডাল নিয়েও লেখা যায় না কি? ডালও তো কত রকমের হয়। ছোলার ডাল, কলাইয়ের ডাল, খেসারির ডাল, অড়হর ডাল, মুসুরির ডাল, মুগের ডাল…। ছোলা কলার থেকে শুরু করে মুগের ইস্তক ভাঁজতে লাগি।
জানি। ডালের আবার কত পালা, শাখা-প্রশাখা, কত কী! কিন্তু তার খোঁজখবর নিতেও ঢের পড়াশোনা করতে লাগে। চারুর মত বিদ্যা হয়েছে তোর? সে বি-এ পাশ। ডালপালার অতো শতো ফ্যাকরায় না গিয়ে বরং তোর বাপের মতন পদ্য লেখ না কেন!
হ্যাঁ, পদ্য লেখেন বটে বাবা। পয়ার, ত্রিপদী, চতুস্পদী-নানা আকারে, নানান ছন্দে বানানো ছোটখাট অনেক রকম পদ্য লিখেছেন বটে, নিজ ব্যয়ে বই করে ছাপিয়েছেনও সেসব আবার, কলকাতার থেকে ছাপিয়ে বাঁধিয়ে নিয়ে এসেছেন-তা, হাজারখানেক কপি তো হবেই। যে চায়, যে না চায় তাকেও, না চাইতেই বিনামূল্যে বিলিয়ে দিয়ে থাকেন। চাঁচোর আর আশপাশের গাঁয়ে তাঁর বই পেতে বাকি নেই কারও। কবি খ্যাতিও রটেছে নিশ্চয়ই।
নিজের নামেই নামকরণ করেছেন বইটার-শিবপ্রসাদ। নিজে তেমনটা না হলেও তাঁর বইটিকে তিনি স্বনামধন্য করে ছেড়েচেন।
বাবা বললে, সে কবিতাই বা কী আর সেই বনিতাই বা কীসের, পা ফেলার সাথে সাথেই যে হাতে হাতে তোমার মন না কেড়ে নেয়। বেড়ে কথা বলেছিলেন বাবা। পদ্যবিন্যাস মানে মন না মতে যয়া। কথাটার মর্ম বুঝতে আমার একটুকুও বিলম্ব হয়নি। কবিতার পদবিন্যাস কী তখন আমি তা ভালো করে জানি না, কিন্তু বনিতারটা জেনেছিলাম। রিনির পদক্যিাসের সঙ্গে কথাটা অক্ষরে অক্ষরে মিলিয়ে দেখেছিলাম সত্যি বটে! বনিতা কাকে বলে কে জানে, কিন্তু অমন মেয়ে না হলে, যে তার পা দিয়েই সহজে যে কারো মন হাতিয়ে নিতে পারে-তার সঙ্গে ছাড়া আর বুঝি বনিয়ে চলা যায় না। আর কেউ তেমন বনবার নয়।
আমার সেই বাল্যকালে বাবার বইটা আমি কয়েক বারই তো পড়েছিলাম, কিন্তু এমনিই আমার বিস্মৃতি শক্তি, এতদিন পরে তার অতগুলো পদ্যর একটাও যদি আমার মনে থাকে।
কেবল তার একটা পদবিন্যাস আমার মনে আছে-যে পদ্যটা সত্যিই আমার মন ভুলিয়েছিল সেদিন। ভারী উপাদেয় পদ!
বাংলার নানান জায়গার কোথাকার কী খাদ্য, কোনখানের কোন খানা খাসা, তার সবিস্তার ফিরিস্তি তাঁর একটি পদ্যের কয়েকটি ছত্রে তিনি ধরে দিয়েছিলেন, তার মধ্যেকার সারাৎসার সেই লাইনটি
চাঁচোরের মানকি কলা সংসারের সার। এখনো আমার মর্মে মর্মে গাঁথা হয়ে রয়েছে। মনের লালায়িত রসে সজিভ হয়ে এখন।
স্বর্গীয় চন্দ্রশেখর মুখোপাধ্যায়ের উদ্ভ্রান্ত প্রেমের (সেই কালেই আমার পড়া) আহা, কী করিয়া বলিব কেমন সেই মুখখানি-র বর্ণনার সঙ্গেই বর্ণে বর্ণে মিলিয়ে বুঝি সেই কলার তুলনা কর চলে। তেমন হৃষ্টপুষ্ট বলিষ্ঠ কলা, মের্তমান জাতীয়ই হবে বোধ হয়, কিন্তু বর্তমানে বিরল) চাঁচোরের বাইরে আর কোথাও আমি পাইনি, খাইনিকো অন্য কোথাও। ফজলি যেমন মালদা জেলার বিশিষ্ট আম (গোপালভোগ, বৃন্দাবনা, ক্ষীরসাপাতি ইত্যাদি আরো সব থাকলেও) তেমনি ঐ মানিক কলা চাঁচোরেরই বিশেষ আমদানি। খানদানি পরিবাররাই খানদান- খান এবং দান করে থাকেন।
