করেইছি তো, কিন্তু সে কথা পরে। তবে একথা না বলে পারছি না যে, আপনি ভয়ঙ্কর মিথ্যেবাদী।
যা বলেছেন। একটা সত্যি কথা বললেন এতক্ষণে। গল্প লেখার সময় মিথ্যে লিখতে পারি আর কইতে গেলেই যত দোষ?…তবে হ্যাঁ, আমার ছোট ভাই শিবসত্য ইংরেজিতে ডিস্টিংকশন নিয়ে বি-এ পাশ করেছিল বটে। সে-ই পরে হয়ত এম-এ-টাও দিয়ে থাকতে পারে, আমার জানা নেই। তার নামের সঙ্গে আমার নামটা গুলিয়ে ফেলেননি তো অমিয় বাবু? গোড়ায় শিব আর শেষে চকরবরতি দেখেই আত্মহারা হয়েছেন, ভেতরের সত্যটা তলিয়ে দেখতে যাননি কো আর?
তা কি হতে পারে নাকি? এতদূর দৃষ্টিভ্রম?
অসম্ভব কী? তা না হলে ধরুন না…এই সহজ কথাটাই ধরুন। আমার ভাই যেকালে বি-এ পাশ করে ঘাটশিলা হাই স্কুলের হেডমাস্টার হতে পেরেছে সেকালে আমি এম-এ পাশ করলে, তা সে যে বিভাগেই করে থাকি না কেন, যে কোনো একটা মাস্টারি কি জুটিয়ে নিতে পারতুম না? নিদেন একটা সেকেন্ড মাস্টার হয়ে স্বচ্ছন্দে জীবন কাটাতে পারতুম না কি? এই থার্ড ক্লাস লেখক হতে যেতাম কোন্ দুঃখে? লেখক হতে কি ভালো লাগে কারো? অন্তত আমার তো লাগে না মশাই!
লেখত হতে চান না আপনি?
একদম না। এই দন্ডে যদি আমি হাজার দশেক টাকা পাই, তো আমার ছোটদের বইগুলোর একটা ট্রা বানিয়ে দিয়ে…ওগুলো তো আর আমার নয়, বাংলার ছেলেমেয়েদের সম্পত্তি…তার প্রকাশ ব্যবস্থাটা করে গঙ্গাস্নান করি গিয়ে আমি। তার পরে একেবারে তোবা তালাক দিয়ে এই লেখাটেখা সব ছেড়ে দিই বেবাক।
বলেন কি?
তাই বলি। কী যন্ত্রনার জীবন যে এই লেখক হওয়া-কী বলব। সাধ করে কি কেউ হতে চায়? নেহাৎ প্রাণের দায়-ও ছাড়া কিছু পারি না তাই। যাক্ গে, সে কথা থাক। এখন বলুন আপনার বার্তাটি কী? সেবার তো আমার কুলের কেচ্ছা নিয়ে এসেছিলেন।
এবার এসেছি আপনার উপকূলকাহিনী নিয়ে।
উপকূল! আবার আমায় হতচকিত হতে হয়।–সে আবার কী মশাই? উপকূল আবার কী?
উপকূল কাকে কয় জানেন না নাকি?
জানব না কেন? নদীর দুই উপকূল থাকে, সেই দুকূলের গভী বজায় রেখেই তাকে বইতে হয়… আমি বলি। আর সাধারণ লোকেরও দুটি কুল থাকে জানি। পিতৃকুল আর মাতৃকুল।
কিন্তু লেখক শিল্পীরা কি সাধারণ লোক? তাঁদের কি কেবল দুকুল হলেই পোয় মশাই?
তা বটে। দুকুলে শুধু সীতা শকুন্তলাকেই শোভা পেয়েছিল, লেখক-টেখকদের একাধিক কুল থাকতে পারে বটে। এতদ্বারা আপনি কি কোনো পরস্বৈপদী পরকীয়া ইঙ্গিত-টিঙ্গিত করছেন?
যা বলেছেন, তাই বটে। কলকাতার চারদিকে আপনার চারটে উপকুলের খবর পেয়েছি আমি… জানি না, তাঁরা আপনার বিবাহিত স্ত্রীও হতে পারেন…
কী সর্বনাশ! এতগুলি নারীর উপনায়ক হয়ত আমি হতে পারি কিন্তু তাদের ভর্তা হওয়া তো আমার পক্ষে অসম্ভব। নিজের ভরণপোষন করতেই আমার প্রাণ যায় তার ওপর এই কান্ড। এমনটা আমি করেছি আমার বিশ্বাস হয় না।
বিশ্বাস হয় না?
না মশাই! এতগুলি মেয়েকে বিয়ে করব কি, কোনো মেয়েরই উপযুক্ত আমি নিজেকে জ্ঞান করিনি কখনো। ভেবে দেখলে এদেশের বেশির ভাগ মেয়েরই বেশ দুঃখের জীবন। এদের একটিকে অন্তত আমি সুখী করতে চেয়েছিলাম আমার জীবনে…
কাকে?
যে মেয়েটিকে আমি বিয়ে করিনি। আমার হাতে পড়ে বেচারী অহরহ যে কষ্ট পেত। তার থেকে তাকে বাঁচিয়ে দিয়েছি।
বিয়েও করেননি, উপটুপও নেই বলছেন। মেয়ের অভাব কখনো বোধ করেননি আপনি?
বরং উলটো। মেয়ের প্রভাবেই একেক সময় ত্রাহি ত্রাহি ডাক ছাড়তে হয়েছে আমায়। আমার বাবা ততটা বউ পছন্দ করে নয়, যতটা নাকি সাত শালী দেখে বিয়ে করেছিলেন শোনা যায়–রসিক ব্যক্তি ছিলেন নিশ্চয়। আমি স্বয়ং শালীবাহ হলেও তাইতেই পুষিয়ে গেছল আমার, বাবার উত্তরাধিকার-সূত্রে আমার সাত মাসির সৌজন্যে সাতাত্তরটি কাজিন– রত্ন লাভ করেছিলাম…
সাতাত্তর জন? বলেন কি মশাই?
গুণে গেঁথে দেখিনি অবশ্যি, তবে আমার আন্দাজ। তাছাড়া, আমার নিজের স্বোপার্জিত কাজিনও কিছু ছিল বইকি তার ভেতর…
স্বোপার্জিত কাজিন কী রকমটা?
মনে করুন বন্ধুর মাসে তো ঠিক মার মতই। নাকি তাকে আপনি অন্য কোনো উপমা দিতে চান? তাঁর মেয়েরা, মানে আমার বন্ধুর বোনদের তো. বোনই ধরতে হবে? নাকি
আপনি তাদের উপবোন বলবেন, শুনি?
আমি আর কী বলব।
উপবনই বলুন। কারণ সেখানে সেকালে ফলের কোনো আশা নেই, আকাঙ্ক্ষাও নেই কোনো-উপবনই বলা উচিত। তথায় ফুল ছেঁড়ারও অধিকার নেই আপনার, শুধু ওপর ওপর ঘ্রাণ নেওয়াই কেবল। একটুকু ছোঁয়া লাগে একটুকুগান শুনি গোছের আর কি।
কিন্তু তাতে কি আশ মেটে? কাউকে ষোলো আনা পাবার সাধ জাগেনি কখনো আপনার? কেবল ফুল শুঁকে কে কি দুঃখ যায়? ফল কী তাতে?
মা ফলেষু কদাচন। ষোলো আনার সাধ মেটাতে গেলে ষোলো আনাই যে বরবাদ হয়। যদি কোনো মেয়ের মোল আনা আপনি পেতে চান তো বিনিময়ে তাকে ষোলো আনাই দিতে হবে আপনার-তার চেয়ে এক আনা পেয়েই খুশি থাকা কি ভালো নয়? শত শত একানি পেলে মোটমাট কতখানি দাঁড়ায় ভেবে দেখুন একবার।
ভাবতে গিয়ে তিনি গুম হয়ে থাকেন। উপকূলের খবর নিয়ে এসে এখন বুঝি হিসেবের কূল পান না। এ কানার পাল্লায় পড়ে যোবা মেরে যান বোধ হয়। কিন্তু একটু পরেই তিনি গুমরে ওঠেন আবার
কিন্তু যাই বলুন না মশাই, কলকাতার চারদিকে আপনার যে চারজন রয়েছেন তাঁরা কখনই উপবন নন, তাঁরা আপনার…
