মার কথায় রাজকৃষ্ণ রায় নিয়ে বুঝতে বসলাম।
পড়ে দেখলাম চমৎকার লেখা। বিচিত্র ছন্দে রচিত, আশ্চর্য কবিতা সব। নতুন ধরনের মিল দিয়ে, আনকোরা লেখাই। কৃত্তিবাসের ধার-কাছ দিয়েও যায় না, আলাদা রকমের
লেখা, তাঁর চেয়ে আরো ভালো বলেই মনে হেলো, কিন্তু এমন করে লিখেও কিনা…এই। দশাএ-বই কেউ পড়ে না আজকাল? চলে না বাজারে?
কৃত্তিবাসী রামায়ণের পরে এসে লিখতে বসে রাজকৃষ্ণের অমন কীর্তি যদি বাসী হয়ে গিয়ে থাকে তো আমার এই অনাসৃষ্টির দশা কেমনটা দাঁড়াবে তাহলে?
ঘাবড়ে গেলাম বেশ। রাম জন্মাবার ষাট বছর আগে যেমন বাল্মীকির রামচরিত রচিত হয়েছিল, আমার বেলায় সব দিক খতিয়ে দেখে জন্মাবার আগেই আমার রামায়ণ খতম!
.
১৪.
সেই সাংবাদিক ভদ্রলোককে অনেকদিন পরে ফের দেখা গেল আমার ঘরের দোরগোড়ায়।
আইয়ে জনাব! আইয়ে! আসুন, আস্তাজ্ঞে হোক। বহুদিনের বাদ এলেন। তারপর তো আর দেখা পাইনি আপনার…
তাঁকে দেখে একটু সচকিতই হয়েছিলাম বলতে কি!
তাঁকেও যেন একটু চমকিতই দেখলাম-ওমা? একি! খেতে বসেছেন এই সাত সকালে?
সাত-সকাল কোথায়? এখন তো সাড়ে আট সকাল! একটু আগেই ঘুম থেকে উঠেছি। প্রাতঃকৃত্যাদি সেরে সবে এসে বসেছি এই বিছানায়–ভাত দিয়ে গেল এক্ষুনি।
এক্ষুনি ভাত? এখন তো আপিসের বাবুরা ভাত খায়, খেয়ে আপিস যায় সব। আপনার তো আর আপিস-টাপিস নেই মশাই।
তা নেই, কিন্তু খিদে আছে। রাতভোর মোটেই কিছু খাইনি তো! সেই রাত নটায় যা খেয়েটেয়ে শুয়েছি…তার পরে এতক্ষণ ধরে তো একটানা উপোস। খিদে পাবে তার দোষ কি!…তাছাড়া…।
তাছাড়া?
তাছাড়া, এই মেসবাড়ির রান্না গরম গরম থাকতেই খেয়ে নেওয়া ভালো। নইলে সে আর মুখে উঠতে চায় না। সেই শুকনো ঠাণ্ডা কড়কড়ে ভাত খেতে হলেই হয়েছে।
তা বটে। কিন্তু এই শোবার বিছানার ওপরেই খেতে বসেছেন?
ক্ষতি কী? কাজ তো আমার দুই, খাই আর শুই। এক জায়গাতেই হওয়াটা ভালো নয় কি? এইখানেই খেলাম, খেয়েটেয়ে শুয়ে পড়লাম এইখানেই… নিশ্চিন্তি।
খেয়েই শুয়ে পড়বেন নাকি? এইখেনেই? এখনই?
তাই তো করি মশাই! সারা রাত ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে এমন ক্লান্ত হয়ে পড়ি যে কহতব্য নয়। ঘুম থেকে উঠে শরীরে বলাধানের হেতু একটুখানি খেতে হয়–কী আর খাব? তাই এই ভাত খাই। কিন্তু এই খাবার ব্যাপারটা! এও এমন পরিশ্রমসাধ্য কাজ যে আবার ক্লান্ত হয়ে পড়তে হয় তাইতেই। সেই ক্লান্তি দূর করতেই আবার ঘুম। ঘুমোতে হয় আমায়। শুয়ে পড়ি ফের তার পরেই।
খেয়েই শোয়া? তার চেয়ে শুয়ে শুয়ে খাওয়াটা সারলেই পারেন!
না ঘুমোলে ক্লান্তি যায় না। আর, খেয়েই এমন ঘুম পায় যে… আমি জানাই–এই খেয়ে নিয়ে একটুখানি ঘুমিয়ে সেই দুপুরবেলায় উঠব…
সেই ক্লান্ত হয়ে উঠবেন তো আবার? ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ক্লান্ত হয়ে?
সেই সময় আমার ভাগ্নে রুটি, মাছ, তরকারি ইত্যাদি নিয়ে আসবে তাদের বাড়ি থেকে খেয়েই শুয়ে পড়ব আবার।
আবার ঘুমোবেন?
না, আর ঘুমোব না। তখন একটু কাজটাজ-এই কাগজটাগজ পড়ব। অল্পবিস্তর কাজ করতে হয় সময় সময়। এই সময়টাই তাই করি।
তারপরে কী করেন?
বিকেলে আবার খাবার ব্যবস্থা। কী খাওয়া যায় তার ধান্দা দেখি। কাজু-টাজু বিস্কুট বিস্কুট, ভালোমন্দ যা নাগালে পাই, এই গালে দিই–
দিন-রাত যদি এমনি খালি খান আর ঘুমোন তাহলে লেখেন কখন? লেখেন-লেখেন কখন?
কেন, পরের দিন? আমার সপ্রশ্ন জবাব : পরের দিন তো পড়েই আছে। নেই কি, বলুন?
সে তো চিরদিনই পড়ে থাকে। কোনোদিনই তো আর সে আসে না।
আমার সবই পরের ভরসা মশাই। পরদিনের, পর জনের মানে, ঐ পরি জনের… পরাৎপরের।
পরকাল আপনার ঝরঝরে। হাসতে থাকেন ভদ্রলোক।
ধরেছেন ঠিক। একি, দাঁড়িয়ে রইলেন যে! বসুন। এই বিছানাতেই বসুন-ওপাশটায়। দেখছেন তো অতিথি অভ্যাগতর জন্যে আমার ঘরে কোনো টেবিল চেয়ার কিছু নেই।
সেবারেই দেখে গেছি। এর মধ্যে কোনো শ্রীবৃদ্ধি হয়নি দেখছি ঘরখানার।
বরং কিছু বিশ্রী বৃদ্ধি হয়েছে। জঞ্জাল-টঞ্জাল বেড়েছে আরো একটুখানি। যা গে-এখন বলুন তো কী খবর আপনার। নতুন খবরটবর কিছু আছে?
খবর তো আজকের কাগজে। সে তত আপনি বিছানায় পেতে ভাতের থালা রেখেছেন তার ওপর। দেখেননি কাগজ?
কই দেখলাম। দেখব দুপুরে। তবে এক কাজ করলে হোতো, খাবারটা থালায় না নিয়ে কাগজের ওপর খেলে হোতো-খাওয়াও চলত কাগজও পড়া চলত এক সঙ্গে। খবর আর খাবার একাধারে।
মন্দ হতো না। খেয়েদেয়ে আবার শুয়ে পড়তেন তার ওপরেই।
শুয়ে শুয়ে পড়াও চলত তার ওপর। …বলুন, এখন কী বার্তা নিয়ে এসেছেন এবার?
বলছি দাঁড়ান। কিন্তু তার আগে জানতে চাই আপনি সেবার আমায় ধোঁকা দিয়েছিলেন কেন মশাই?
ধোঁকা?
ধোঁকাই তো। আপনি বলেছিলেন যে ইস্কুল-কলেজের চৌকাঠ আপনি মাড়াননি। অথচ, আপনার এক প্রকাশকের কাছে আপনার খবর নিতে গিয়ে জানলাম আপনি নাকি দস্তুর মতন এম-এ পাশ!
এম-এ পাশ! কী সর্বনাশ! আকাশ থেকে পড়তে হয় আমায়-এমন তথ্য কে প্রকাশ করলেন? কিনি সেই প্রকাশক?
অভ্যুদয় প্রকাশ মন্দিরের অমিয় চক্কোত্তি। এম-এ পাশ, তাও আবার ইংরেজিতে। লীলা মজুমদার আর আপনি এক বছরেই পাশ করেছেন, গেজেটে একসঙ্গে ছাপা রয়েছে আপনার নাম। অমিয়বাবু স্বচক্ষে দেখেছেন।
বটে?…কার লীলা কে জানে! আমি তো জানি ও-খেলা আমি কোনোদিন খেলিনি। ওই পরীক্ষা পরীক্ষা খেলা। ওদের মায়াপাশে না জড়িয়ে পাশ কাটিয়ে এসেছি চিরটা কাল। বলে একটু থেমে যোগ করি : সত্যি বলতে, আপনাকে বেশ ভয় করছে আমার। আপনি যখন আমার এম-এ আবিষ্কার করেছেন, কোনদিন হয়ত আবার আমার মেয়েও বার করে বসবেন।
