সুপণ্ডিত শিবরাম বিচক্ষণ কবি।
সপ্তকান্ডে গাহিলেন রামায়ণ সবি।।
আওড়াবার পর মার সে কী হাসি। মার এরকম হাসি, এমন উচ্চস্য এর আগে আমি কখনো শুনিনি।
হাসির চোটে আমি রীতিমতন চোট খাই। ঘাবড়েও যাই বেশ। অপ্রতিভের মতন কই-ভালো লাগল না বুঝি তোমার?
কিসসু হয়নি তোর। কৃত্তিবাসের কথাগুলোই উলটে পালটে বসিয়ে দিয়েছিস–তার লেখাই আরেক রকম করে সাজিয়েছিস। তাঁর পয়ারের ভেতর থেকেই মিল টেনে এনে মিলিয়ে দেওয়া কেবল। এই যেমন তোর শেষ ছত্রটাই ধর না– কৃত্তিবাসের রয়েছে-কৃত্তিবাস পন্ডিত কবিত্বে বিচক্ষণ-সপ্তকান্ডে গাহিলেন গীত রামায়ণ। তুমি বাপু, সেই কথাগুলোই ফের ঘুরিয়ে নিয়ে এসেছ। ফের ফের তাই দেখছি আগাগোড়া।
আমার ফেরেববাজির কথায় আমার প্রাণে লাগে–কিচ্ছু হয়নি তুমি বলছ?
মার কথায় কান্না পায় আমার, বলতে কি! দেখাবো তোমায়?
কি করে হবে? সাধক না হলে কি এসব লেখা যায় রে? কৃত্তিবাস কাশীরাম–এঁরা মহাপুরুষ, মহাসাধক ছিলেন। মহাভক্ত তাঁরা, ভগবানের কৃপাতেই লিখেছেন, লিখতে পেরেছেন। নইলে কি লেখা যায় নাকি? তুই তা লিখবি কি করে?
তাহলে আমি বৈষ্ণব পদাবলীই লিখব না হয়! ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলি-তাও আমার বেশ আসে। আরেকটা খাতায় লিখেছি…দেখাবো তোমায়?
এইরকম তো হবে, তার দরকার নেই, দেখলে আমার হাসি পাবে আরো। না দেখেই হাসতে থাকেন মা : বৈষ্ণব পদাবলী তুই লিখলি কি করে? তোর বাবার পদাবলী সংগ্রহ পড়ে পড়ে?
না পড়লে কি লেখা যায় নাকি? নিজের সাফাই গাই : লেখাপড়া শিখতে হলে যেমন আগে লেখা তার পরে পড়া, আগে হাতেখড়ি অ-আ-ক-খ যতো লিখে লিখে মরি, তার পরে তো বইটই পড়ি? তেমনি লেখক হতে গেলে আগে পড়া তার পরে লেখা। তাই নয় কি? আমার তো তাই মনে হয় মা। আগে পরের লেখা না পড়লে কেমন করে লিখব? কী লিখব, কিরকম করে লিখব টের পাব কি করে?
কিন্তু বৈষ্ণব পদাবলী কি তাই? পড়লেই কি লেখা যায় নাকি?…তুই কি বৈষ্ণব? কৃষ্ণে ভক্ত কি তুই? সাধন ভজন করেছিস কিচ্ছু কখনো? তা না হলে ওসব লেখার অধিকারী তুই নোস। চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস, ঐরা গুণী লোক, যেমন সাধক তেমনি ভক্ত, তাই ওই পদাবলী তাঁরা লিখতে পেরেছিলেন। তাঁদের ভক্তির বাধনে বাঁধা পড়েছিলেন ভগবান… যেমন সাধক তাঁরা তেমনি আবার মরমিয়া কবিও।
মরমিয়ার মর্ম তখন আমার মগজে না ঢুকলেও কথাটা আমার মর্মে লাগল বেশ।-তবে আর লিখে কী হবে! আমি যখন পিরবোই না তুমি বলছ। আমি কিন্তু মা, জয়দেবের মতন সমস্কৃত কবিতাও লিখব এঁচে রেখেছিলাম। মর্মান্তিক কথাটা না বলে পারলাম না।
জয়দেব! অ্যাঁ? বলিস কি রে? জয়দেব পড়েছিস নাকি তুই?
পড়ব না, কী মিষ্টি যে! বাবার আলমারিতেই তো রয়েছে-কুমারসম্ভব, শকুন্তলার সঙ্গে। পড়েছিও, বুঝেছিও। সমস্কৃত হলেও বোঝা যায় বেশ, বাংলার মতন সোজাই তো।
তাহলেই বোঝ। বুঝে দ্যাখ তাহলে। কত বড় ভক্ত হলে তবেই না অত বড় কবি হওয়া যায়। তাঁর ভক্তির টানে ভগবান নিজে এসে তাঁর কবিতায় অসমাপ্ত পদ স্বয়ং লিখে সম্পূর্ণ করে দিয়ে গেছলেন, জানিস তো?
জানি বই কি। স্বরগরলখণ্ডনম মম শিরসি মণ্ডনম দেহি পদপল্লব মুদারম্!
আহা! আহা! মার আহাকার-ধ্বনি শোনা যায়।
রাধার মতন অমন আহামরি মেয়ে হলে তেমন পদপল্লবমুদারম করতে সকলেই পারে মা। এমন কি আমিও পারি। সত্যি কথা বলতে কি…
বলতে গিয়ে আমি চেপে যাই। রিনির পদপল্লব নিয়ে নিজের মাথায় না ধরলেও প্রায় তার কাছাকাছি এনে সেই উদারতা আমিও যে দেখেয়েছি সে কথা আর কই না। সে কথা ফাঁস করে নিজের ফাঁসির দড়ি কি কেউ গলায় পরে সাধ করে?
বড্ড পেকে গেছিস তুই! এই বয়সেই। তোর বাবাই তোর মাথাটা খেল-একটুও শাসন করে না তোকে। এমন অনাসক্ত সন্ন্যাসী মানুষকে নিয়ে কি সংসার করা পোয়!
তাহলে আর কী হবে? আমি তো কবি কি লেখক কিছুই হতে পারব না আর। আমার দীর্ঘনিশ্বাস পড়ে।
পারবি না কেন? তবে কিনা, পরের নকল করে তা হতে পারবিনে। পরের মত করে লিখলে কি হবে? তাহলে চলবে না, নিজের মত করে লিখতে হবে যে। পরের থেকে নিয়ে নয়, নিজের থেকেই হতে হবে তোকে। এই যেমন… মা আমার জিজ্ঞাসু দৃষ্টির সামনে এক দৃষ্টান্ত নিয়ে আসেন-এই কবি রাজকৃষ্ণ রায়। রাজকৃষ্ণ রায়ের গ্রন্থাবলী পড়েছিস তুই? আছে তো আমাদের। তোর বাবার ঐ আলমারিতেই রয়েছে।
না, পড়িনি তো। এখনো পড়িনি। পড়ে দ্যাখ তো। বাল্মিকীর অনুসরণে তিনিও রামায়ণ লিখেছেন, নানা ছন্দের কবিতায় কিন্তু একেবারে নিজের মতন করে। সাত কাণ্ডের কোনোখানেও কবি কৃত্তিবাসের কোন
অনুকরণ করেননি। যদিও কৃত্তিবাস তাঁর ঢের আগেকার।
করেননি তিনি?
না। করলে তাঁর লেখা কিছুই হত না একেবারে। কিন্তু লিখেও যে কিছু হয়েছে তা নয়! হয়নি কেন জানিস? রামায়ণ বলে কথা! রামের ভজনা না করে শুধু বিদ্যাবুদ্ধির জোরে কি তা লেখা যায়? ভগবানের সাধক না হলে ভগবানের চরিত গাথা গাইবার ক্ষমতা হয় না, রচনাও করা যায় না। তুলসীদাস, কৃত্তিবাস শ্রীরামের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন-তাঁর কৃপাতেই ওই মহাকাব্য লিখতে পেরেছেন। কিন্তু রাজকৃষ্ণ রায় ভক্ত সাধক ছিলেন না তো; লিখলেন বটে রামায়ণ, ভালোই লিখলেন বটে, কিন্তু লিখেও কিছু হল না। তাঁর বই লোকসমাজে চালুই হল না মোটে। অথচ ভারতের ঘরে ঘরে রামচরিতমানস, কৃত্তিবাসী রামায়ণ। এতেই বুঝবি।
