ঠাকুরের কথাটা হোলো…
তোমার ঠাকুর যাই বলুন না মা, তাঁর কথায় আমি বাধা দিই-ঠাকুরের বিবেকানন্দ কিন্তু কোনোখানেও ভগবানকে ভালোবাসার কথা বলেননি, মানুষকেই ভালোবাসতে বলেছেন। পড়লাম তো কতো বই-ই তাঁর, কিন্তু কোথাও না। ভগবানকে ভালোবাসবার কথাই নেই।
বলেননি তিনি কোথাও?
কোথায়! তিনি তো বলেছেন, জীবে প্রেম করে যেই জন, বলে আমি তকনি বিবেকানন্দ আওড়াতে যাই।
কোথায় পেলি বিবেকানন্দের বই? পড়লি কবে?
আমার জীব বার করার আগেই মার বাধা পাই। নিজীবের ন্যায় বলি-কলিগায়। কোনা-দার ভারতীভবন লাইব্রেরীর থেকে নিয়ে। তাঁর পাঠাগারে কতো রকমের বই আছে যে! বিবেকানন্দের বই, অশ্বিনী দত্তের ভক্তিযোগ, এমনি সব ভালো ভালো বই। যতো কর্মবীরদের জীবনী। মানে সেই সব বই যা পড়লে নাকি মানুষ হওয়া যায়…গল্পের বই নয়, প্রবন্ধের বই যতো। সেখান থেকেই নিয়ে পড়েছি আমি।
বিবেকানন্দের কথাটা তুই বুঝিসনি ঠিক। ভগবানকে না ভালোবাসলে মানুষকে ঠিক ভালোবাসা যায় না।
ভগবানকে তো ভালোই বাসা যায় না মা!…..ভগবানকে ভালোবেসে কোনো সুখ নেই।
সুখ নেই? বলিস কি রে তুই? ভগবানকে ভালোবাসলে তোর মানুষের ভালোবাসার চাইতে সহস্রগুণে সুখ, তা জানিস? ঠাকুর বলেছেন …
তোমার ঠাকুর যাই বলুন না মা, তাঁর কথায় আর কাজে কোন মিল নেই–আমি বলব। ভগবানকে ভালোবেসেই যদি এত সুখ তবে তিনি শুধু তাই নিয়ে না থেকে মানুষকে ভালোবাসতে গেলেন কেন আবার? তিনি তো মা কালীকে দেখেছিলেন, পেয়েছিলেনও হমুদ্দ, তবে তিনি তাঁর ভালোবাসাতেই তৃপ্ত না হয়ে বিবেকানন্দকে নিয়ে মত্ত হতে গেলেন কেন? মা কালীতেই না মশগুল থেকে তাঁর কাছে নরেনকে এনে দাও, নরেনকে এনে দাও বলে কান্নাকাটি লাগিয়েছিলেন কেন? নরেনতো একটা বাচ্চা ছেলেই তখন। প্রায় আমার মতই হবে। আমি জানাই : মা কালীতেও তাঁর আশ মিটলো না। তাই তাকে পাবার পরেও একটা ছেলের জন্যে তিনি পাগল হলেন শেষটায়।
মা কালীর জন্যেও কি তিনি বালিতে মুখ ঘষেননি একদিন?
তা ঘষেছিলেন। কিন্তু বালিবধের পর হনুমানকে নিয়েই মজে গেলেন তো সেই। সুরেশ সমাজপতির মতন তাঁর সমালোচনা আমার। তার আগের জন্মে যেমনটা ঘটেছিল প্রায় তেমনটাই।
আগের জন্মের…হনুমানকে নিয়ে মজলেন। মা ঠাওর পান না ঠিক।
মজলেন না? যিনি রাম যিনি কৃষ্ণ তিনিই তো সেই রামকৃষ্ণ? তাহলে যিনিই বিবেকানন্দ তিনিই সেই হনুমান। আমার অনুমান ব্যক্ত করি, অবশ্যি আমার মতন হনুমান না, আমাকে তুমি যে হনুমান বলল সে হনুমান নয়, আমার ন্যায় দুর্বল নয়, হনুমানের মহাবীর সংস্করণ। মানে, বলছিলাম কি, আমার ব্যাখ্যা প্রকাশ করি-হনুমান যেমন সমুদ্রমন করেছিলেন, বিবেকানন্দও তেমনি কি সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে একালের স্বর্ণলঙ্কা আমেরিকায় গিয়ে সেখানকার রাক্ষসদের তাক লাগিয়ে দেননি? হনুমান যেমন শ্রীরামের বাহ্ন, বিবেকানন্দও তেমনি শ্রীরামকৃষ্ণের বাহন তো? তাঁর ভাবধারা বহন করে নিয়ে গেছলেন সেখানে। আসলে এটাকে–এই ক্রিশ্চান মুলুকে গিয়ে তোলপাড় করাটাকে আমি তাঁর লঙ্কাকান্ড বানোই বলব মা। তোমার ঠাকুর যেমন কুরুক্ষেত্র কান্ড বাধিয়েছিলেন তাঁর আগের জন্মে কৃষ্ণষ্ঠাকুর হয়ে…যিনি রাম যিনি কৃষ্ণ তিনিই শ্রী…
তোর কথা শুনলে আমার মাথা ধরে। গোঁজামিলের কথা রাখ তো। এলোমেলো কথা যত তোর। এসব কথা থাক, তোর বইখাতা নিয়ে আয় দেখি। পড়াশোনাটা কেমন হচ্ছে দেখা যাক একবার।
খাতাপত্তর নিয়ে আসি সব। উলটে-পালটে দেখে মা বলেন-অঙ্কের খাতাটা কই? দেখছি না তো এর ভেতরে।
বলেছি না তোমায়? মাতৃ অঙ্ক ছাড়া আর অন্য কিছু আমি জানি না। অঙ্কট একদম আসে না আমার।
তাহলেও খাতা একটা থাকবে তো? গেল কোথায়?
কাবিলের কাছে আছে। বলেছি না, আমার বন্ধু মহম্মদ কাবিল হোসেন আমার খাতায় প্রতিদিনের আঁকগুলো সব উতরে দেয়, তাই সে খাতাটা ইস্কুল থেকে নিয়ে যায়, পরদিন আবার নিয়ে আসে ইস্কুলে ঠিকঠাক করে। আমার আকে খাতার মোকাবিলা সে-ই করে।
দেখি তোর কম্পোজিশনের খাতা তবে। ট্রান্সলেশনের খাতাটা দেখি।
ওই তো আছে। তোমার সামনেই তো।
এসব কী লিখে রেখেছিস খায়?
দ্যাখো না।
গদ্যপদ্যের ছড়াছড়ি দেখছি। এসব কী আবার? কিসের মহাভারত?
মহাভারত নয়, রামায়ণ।
রামায়ণ! মা যেন আকাশ থেকে আছাড় খান।
পড়ে দ্যাখো না, কেমন আমি রামায়ণ লিখলাম।
রামপেসাদী কাভ বাধিয়েছিস যে? তিনি যেমন হিসেবের খাতায় মায়ের গান ফেদে ছিলেন, দে মা আমায় তবিলদারি-র গান বেঁধে রেখেছিলেন, তুইও তাই করেছিস দেখছি।
শিবপ্রসাদের ছেলে হয়ে সেটা কি খুব বেহিসেবী হয়েছে মা? বাবা তো পদ্যটদ্য লেখেন, বইও ছাপিয়েছেন সেই সব নিয়ে, আমিও প কৃত্তিবাসের তহবিল তছরূপ করেছি মা। কৃত্তিবাসের মতন আমিও রামায়ণ লিখছি একখানা।
দেখি তোর কান্ডটা। পাতাগুলোর ভেতর দিয়ে ওপর ওপর চোখ বুলিয়ে যান মা।
একটা কান্ড হয়নি এখনো। আমি জানাই : সাতকার সবটাই বাকী। মাঝে মাঝে লিখে গেছি খানিক খানিক। যখন যেখানটা আমার মনে ধরেছে লিখে রেখেছি। আরো আমি বিশদ করি- তবে সপ্ত কাভের শেষ কথাটি আমি লিখে রেখেছি আগেভাগেই।…এই যে! এই পাতাটায় দ্যাখো না!
মা দেখলেন, তার পরে শুরু করলেন সুর করে :
