তুমি কি ব্রহ্মকে জেনেছ মা? আমার আচমকা জিজ্ঞাসা। শুনে মা যেন মকে যান–ব্ৰক্ষ? ব্রহ্মকে কি জানা যায় নাকি? জানতে পারে কেউ?
তুমি জেনেছ।
পাগল! জানলেও কি কেউ কাউকে তা জানাতে পারে? ব্ৰক্ষকে কেউ মুখের থেকে বের করতে পেরেছে কখনো? ব্রঙ্ক অনুচ্ছিষ্ট বলেননি ঠাকুর? কী পড়লি তবে সেই কথামৃতে? ব্রহ্মকে মুখের থেকে বার করা যায় না, নিজে তার স্বাদ পেলেও অমৃততুল্য সে সোয়াদ ভার কাউকে দিতে পারে না কেউ কখনো…
হ্যাঁ পারে। ব্রহ্ম কী তা জানিনে, তবে তার সোয়াদ অপরকে দেওয়া যায় জানি। রিনি একদিন দিয়েছিল আমাকে।
রিনি? তাই নাকি? কী রকমের ব্রহ্ম শুনি তত একবার? কেমন তার সোয়াদ?
সন্দেশ। আমি জানাই। রিনির মুখের থেকে বের করা অমৃত অংশটুকু উহ্য রেখে, ব্রহ্মস্বাদের পনের আনাই বাদ দিয়ে মুখ্য খববের, না, খাবাবের এক আনাটাক ব্যক্ত করি।
সন্দেশ! সন্দেশই বুঝি তোর কাছে ব্ৰহ্ম রে? ব্রহ্মস্বাদ সহোদর ঐ সন্দেশ? বটে বটে? হাসতে থাকেন মা–তবে সেই সন্দেশ নিজে না খেয়ে পিঁপড়েদের খাওয়াতে যাস কেন? তাদের গর্তে-গর্তে রেখে আসিস যে?
সব ভালো জিনিসই সবাইকে দিয়ে খেতে হয়, তুমিই তো বলেছ মা! বিলিয়ে না দিলে ভগবান মিলিয়ে দেন না। এমন কি, তোমার এই প্যাঁচটাকেও আমি অনেক ছেলেকে শিখিয়ে দিয়েছি। সবাই মিলে মা দুর্গাকে জব্দ করুক না। আমি একাই কেন মজা লুটি! তারাও ভগবানের সাহায্যে উৎরে যাক–কার্যোদ্ধার করুক। তোমার ঠাকুর বলেছেন না?…
কী বলেছেন ঠাকুর?
বলেছেন গুরুর মত হাঁড়ি কলসিকেও বাজাতে হবে, নাকি, আঁড়ি কলসির মত গুরুকেও বাজিয়ে নিতে হবে? ভগবানের চেয়ে তো গুরুতর আর কিছু নেই। তাই হাঁড়ি কলসির মতই ভগবানকেও আমি বাজাতে লেগেছি। চাই কি, ভগবানের এই হাঁড়ি হাটেও একদিন
আমি ভাঙতে পারি হয়ত।
সে কি রে।
তাই। ভগবানকে আমি কাজে লাগাতে চাই না। যে ভগবান আমাদের নিত্যকার কাজে লাগবে না, সে-ভগবানে আমাদের কী কাজ মা?
.
১৩.
ভগবানকে কাজে লাগাবি কি রে! ভগবানের কাজে লাগবি তো। আমার কথায় মা হতভম্ব হন। ভগবানের কাজের জন্যেই আমরা এসেছি তো…তার সেবার জন্যেই।
ভগবানের সেবার জন্যেই সবাই? আমি শুধাই: তাঁর সেবা করা ছাড়া আর আমাদের নিজেদের কোনো কাজ নেই?
আবার কী কাজ? তাঁর সেবা তাঁর উপাসনা করাটাই তো মস্ত কাজ। তা ছাড়া আর সমস্ত কাজ? সেবা করাটা আবার কি রকম? উপাসনা কাকে বলে?
উপাসনা মানে তাঁর কাছে বসে থাকা, তাঁর কাছে বসে তাঁর কথা শোনা, তাঁর নামগান। করে তাকে শোনানো।
আর সেবা মানে তো গিয়ে ভোগ দেওয়া? তাই না মা? আমাদের নিজেদেরকেই কি ভোগ দেব তাকে? নাকি, নিজেদের যত ভোগ…? যত না কর্মভোগ…?
সেবা বল পূজা বল ভালোবাসা বল–তাঁকে ভালোবাসার জন্যই আমাদের জন্মানো। তিনি যে ভালোবাসার ধন।
ভগবানকে ভালোবাসব কী মা? তাঁর কথায় আমিও কম অবাক হইনে : ভগবানকে কি ভালোবাসা যায়? যার ধারণাই করতে পারিনে তাকে আমরা ভালোবাসব কি করে?
ভালবাসা যায় না ভগবানকে?
একটা পিঁপড়ে কি একটা হাতিকে ভালোবাসতে পারে? হাতী যে কী, তা তো সে টের পায় না কোনদিন। তার গায়ে হেঁটে চলে বেড়ালেও, তার পায়ের তলায় চাপা পড়লেও নয়। হাতি ও পিঁপড়ের ঠাওর পায় কি না কে জানে!
পায় না? তুই বলছিস?
হাতীর পক্ষেও একটা পিঁপড়েকে ভালোবাসা অসম্ভব। আর পিপত্রে ভালোবাসা পেতে হলে, কি পিঁপড়েকে ভালোবাসতে হলে তোমার হাতাঁকে ওই পিঁপড়ে হয়েই জন্মাতে হবে আমার মনে হয়।
তাই তো জন্মায় রে। ভগবান মানুষ হয়ে জন্মান তো সেই জন্যেই। তাঁর অবতার হওয়া তো সেই হেতুই।
তাই কল মা। তিনি মানুষ হয়ে জন্মেছেন…জন্মাচ্ছেন…আমাদের ভালোবাসা পাবার লালসায়। আমি তো সেই কথাই কইছি মা। …ভগবানকে ভালোবাসাই যায় না। মানুষকেই কেবল ভালোবাসা যায়, কারণ মানুষকে আমরা বুঝতে পারি, তার ভালোবাসাও টের পাই আমরা।
একই কথা। মানুষকে ভালোবাসাও সেই ভগবানকেই ভালোবাসা।
আর, মানুষের ভালোবাসাও সেই ভগবানেরই ভালোবাসা–তাই বলছ তো? আমি হাঁফ ছাড়ি : আর রিনির ভালোবাসা আমার কাছে তাই ভগবানের ভালোবাসাই।
কী বললি? মা চকিত হন।–কার ভালোবাসা বললি?
বলছিলাম যে এই জন্যেই আমরা ভগবানের ভালোবাসার কাছে ঋণী। মানুষের এই ভালোবাসার জন্যেই। এবং তাঁরও এত কষ্ট করে মানুষ হয়ে জন্মে মানুষের মারফতে অন্য মানুষকে ভলোবাসার জন্যে এমন দুঃখ পোহানো–এই ত্যাগস্বীকার–তার জন্য আমরা ঋণী নই কি?
ঋণী বই কি। আর তিনিও তো আমাদের ভলোবাসার স্বাদ পাবার জন্যেই মানুষ হয়ে জন্মান। এই কারণেই তো তাঁর অবতার হওয়া।
অবতার না হয়েও তো তিনি তার মানুষ হয়ে জন্মেছেন–জন্মাচ্ছেন এখনো, যত খুশি তোমরা ভালোবাসো না! যাকে খুশি তাকে। তাই না মা? আমি বলি-কিন্তু আমরা মানুষকে না ভালোবেসে তাঁকে ভালোবাসতে গিয়ে তাঁর সেই স্বাদে বাদ সাধছি কেবল। তাই নয় কি মা?
মানুষকে ভালোবাসলেও সেই তাঁকেই ভালোবাসা হয় রে। মা বলেন, আর ভগবানকে ভালোবাসাও … .ঠাকুর বলেছেন …
অত ঘুরে আমার নাক দেখতে যাব কেন মা? নাকের সামনেই তো মানুষ। সোজাসুজি মানুষকেই ভালোবাসব …মানে রিনিকেই মানে কিনা, যার ভালোবাসায় আমি ঋণী…যার কাছে ভালোবাসার স্বাদ পেলাম প্রথম, সেই মানুষকেই।
