তা কি করে হবে? পড়াশুনা না করে-পাঠ্যবইদের বিলকুল ফাঁকি দিয়ে? তা কি হয় নাকি রে? মা বলেন, যে ছেলেরা রীতিমতন খেটেখুটে পড়ছে তাদের ভেতর থেকেই ফার্স্ট হবে, তুই শুধু কোনোরকমে পাশ করে যাবি কেবল।
তা কেন মা?
সাধনা না করলে কি সিদ্ধি হয় রে? যে ছেলেটা খেটে পড়ছে সে যদি মা দুর্গাকে নাও ডাকে তবুও সেই ফাস্ট হবে–তার ঐ খাটুনিটাই তো আসলে ভগবানকে ডাকা। আর যদি খাটেও আবার সেই সঙ্গে সঙ্গে ডাকেও–তাহলে সে কোথায় গিয়ে উঠবে বলাই যায় না। উন্নতির চূড়ান্ত হবে তার আর এইভাবে ফাঁকি দিয়ে তরতে গিয়ে তোর তলিয়ে যাওয়াই উচিত ছিল, কিন্তু যেহেতু ঐ মাকে ডেকেছিস, তাই তুই ডুবে যাবিনে একেবারে, শুধু ভেসে থাকবি কোনোগতিকে। সারাজীবন এইভাবে ভেসে ভেসেই কাটবে তোর।
ভাসা ভাসা জীবন হবে? তুমি বলছ?
আমি কিছু বলছি না। সেটা মার ইচ্ছে। তবে জেনে রাখিস্ সাধনা না করলে কোনই সিদ্ধি হয় না। যেমন তোর ওই অঙ্কের মতন। কী অঞ্চগুলো আসবে জানতে পারলেও কষতে পারলিনি–স্টেপ বরাবর এগুসনি বলে। ওই স্টেপ বাই স্টেপ এগিয়ে যাওয়াটাই হচ্ছে সাধনা। ফাঁকতালে কিছুই মেলে না রে, অমনি করে এগিয়ে গিয়েই পেতে হয় সব।
অঙ্ক যে আমার একদম ভালো লাগে না মা।
তাহলে কি করে হবে রে। তবে কি করে এখান থেকে উৎরে বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকোঠ ডিঙোবি? আর তা না হলে…তের বাবা যে তোকে বিলেত পাঠাতে চায় রে। সেখান থেকে আই-সি-এস পাশ করে আসবি তুই। জজ ম্যাজিস্ট্রেট হবি। তোকে সিভিলিয়ান দেখার স্বপ্ন যে তাঁর অনেক কালের। খেয়ে না খেয়ে টাকা জমাচ্ছেন সেই জন্যে।
আমি চাই না জজ ম্যাজিষ্ট্রেট হতে। ওসব হতে ভাল লাগে না আমার। কী হয় ওসব হয়ে? ওই তোমাদের এক বিচ্ছিরি শখ মা। ছেলেদের সব সিভিলিয়ান করার মতলব। বামুনপাড়ার আদ্ধেক ছেলে মাথায় হাত দিয়ে বসেছে-বসে বসে পড়তে লেগেছে সবাই। তাদের বাবাদের শখ সিভিলিয়ান করার। হকিম মুনসেফ উকীল ব্যারিস্টার ডাক্তার সাবরেজিস্টার হবে। বাবার শখ মেটাতে উঠে পড়ে লেগেছে তারা।
সেটা কি খারাপ? মা বলেন : ভালোই তো। তাদের নিজেদের পক্ষেই তো ভালো।
ভালো না ছাই! ওসব হতে চাই না আমি। আমি চাই আমি হতে। তা কী করে হওয়া যায় যে…!
ভেবে কোন কূল পাচ্ছিসনে তার?
পেয়েছিলাম তোত একটা কূল-তোমার কথায়। এখেনে মন এনে মা-দুর্গার কাছে চেয়ে চেয়ে আমার কাজ বাগাতে। তুমি তো বলছ যে কেবল তাতে হবে না। শর্টকাট করলে চলবে না, সারা পথটা হাঁটতে হবে–হেঁটে হেঁটে সারা হতে হবে আমায়। কিন্তু তা কি করে হয়? অমনতর হটবার আমার ক্ষমতা নেই। ইচ্ছেও করে না আমার।
তাহলে আর কি করে হবে। মা সান্ত্বনা দেন-তবে খুব বড় হলেও কিছু একটা হবি। কিছু কিছু হবে তোর। ভিকে-শিকে করে যা হয়। ভিক্ষায়াং নৈব নৈব চ-বলেছে না? ভগবানের কাছে ভিক্ষে চাইলেও প্রায় সেই কথাই। তবে এরই মধ্যে একটুখানি ইর বিশেষ–এই যা।
কেবল প্রার্থনা করে মেলে না কি মা?
চাইতেও হবে, চেষ্টাও করতে হবে–তবেই হবে ষোল আনা। চাই কি, তার চেয়েও বেশি হতে পারে। চেয়ে চেয়ে এগুতে হবে–এগিয়ে গিয়ে আগাবার পর চাইতে হবে–তবেই হবে পথ চলা। পথ চলাটাই তে আসল রে। গন্তব্যস্থল কোথাও নেই।
কী মুশকিল। কী মুশকিল।
মুশকিলটা আবার কোনখানে?
আমি ভেবেছিলাম তোমার সিদ্ধি আমার কাজে লাগাব। তোমার ঐ প্যাঁচটা কষে যা হবার হতে পারব–যা যা চাইবার, যা পাবার পেয়ে যাব সব-এখন দেখছি…
আমার আবার সিদ্ধি কি রে? মা একটু বিস্মিতই।
তুমি তো সিদ্ধিলাভ করে বসে আছ, ভৈরবী বলছিল আমায়।
ভৈরবী তো সব জানে! হাসতে থাকেন মা : ওই সব আজেবাজে কথায় কান দিস তুই! বিশ্বাস করিস?
বা রে। ফল পেয়েছি যে! না পড়ে পাশ করে গেলাম কি করে তাহলে?
ও কিছু নয়। এক-আধবার ওরকম হয়ে যায়। কখনো আবার হয়ও না। কেন যে হয়, কেন যে আবার হয় না তা আমি জানি না। মনে হয়, তুই যে একবার বলেছিলি না? মা কালী একটুখানি খামখেয়ালী, তাই হয়ত এর কারণ হবে।পরমহংসদেবের কথামৃত পড়তে দিয়েছিলাম যে তোকে? পড়েছিলিস?
পাঁচ খন্ডই। কবে শেষ করেছি।
কী বলেছেন তাতে ঠাকুর? এরকমটা হলেও এটা হওয়াতে নেই। এটা একটা ছোটখাট সিদ্ধাই-বুঝেছিস? ঠাকু সিদ্ধাইয়ের বিরুদ্ধে, সেটা টের পাসনি?
পেয়েছি। কিন্তু তিনিই তো আবার বলেছেন যে গুরুকেও বাজিয়ে নিতে হবে? বলেননি? বাজিয়ে না দেখলে সিদ্ধাই কিনা বুঝব কি করে?
তাই কি তুই ই সিদ্ধাইটা বাজিয়ে দেখছিস নাকি?
যদি বলি তোমাকেই। তোমাকেই বাজিয়ে দেখছি আমি। মার চেয়ে বড়ো গুরু তো নেই আর, ভৈরবীর কথা। তুমি তো আমার পরম গুরু।–তাই তোমাকেই তার মানে, তোমার কথাটাকেই বাজাতে লাগলাম। তোমার ওই সিদ্ধাইটাকেই
আমার আবার সিদ্ধাই কিসের।
সিদ্ধাই না বলে যোগ যদি বলি? তোমার যোগবল?
আমি আবার যোগ করলুম কবে রে?
যোগ না করলে তুমি এই কৌশলটা জানলে কি করে তবে? বাবা যে বলেন, যোগ কর্মসু কৌশলম, মানে যে, যোগ হচ্ছে গিয়ে কাজ করার কৌশল, সেটা কি মিথ্যে?
না না, মিথ্যে কেন হবে? শাস্ত্রবাক্যই।
আমি কেবল সেই কৌশলটাই কাজে লাগাচ্ছি তো। ছলে বলে কৌশলে কার্যোদ্ধার করতে হয় না? তাই এই কৌশলেই কাজ হাসিল করছি আমার।
শুনে মা গুম হয়ে যান-কিসের ভাবনায় যেন তাকে কাতর করে : মনে হচ্ছে আমিই তোর সর্বনাশ করলুম বুঝি। তোকে এই প্যাঁচটা শিখিয়ে দিয়ে…যা মা-ই তোকে বাঁচকেন শেষ পর্যন্ত। তাঁর পায়েই তো ফেলে দিয়েছি তোকে।
