সিংহাসনে বসব ঐরকম। তুই সীতা হয়ে আমার পাশে বসবি, আর আমার ভাই সত্য লক্ষণ হয়ে ছাতা ধরে থাকবে আমার মাথায়। আর হরিটা হনুমান হবে।
হরি আবার কে?
আমাদের ছোট ভাই। মামার বাড়ি থাকে কলকাতায়। দিদিমার ন্যাওটা কিনা। দিদিমা ভারী ভাললাবাসেন তাকে। তাঁর কাছেই থাকে। আমি জানাই–সে হনুমানের মত হাত জোড় করে থাকবে আমাদের সামনে।
হনুমানের মতন ল্যাজ আছে ওর?
নেই, তবে ল্যাজ হবে-হয়ে যাবে ল্যাজ।–তুই দেখে নিস।
যা, তারও ল্যাজ হয়েছে আর আমিও সীতা হয়েছি! রিনি হাসতে থাকে।
.
১২.
আরতি দেখে ফিরতে একটু রাতু হল। মা বললেন, কি রে, এত দেরি করলি যে। খাবার সময় হয়ে গেল, পড়তে বসবি কখন? সামনে তোর পরীক্ষা না?
পরীক্ষা কিসের মা। প্রমোশন তো সামনে।
পাশ করেছিস?
কবে! পরীক্ষার ফল জানা হয়েছে, এক অঙ্ক ছাড়া আর সব বিষয়েই ভালো মতন পাশ। জানালাম : বাংলায় তো ফার্স্ট হলাম।
বলিস কি রে! পড়লি না টড়লি না, বাজে বই পড়ে সময় কাটালি, পড়ার বই ছুঁলি না পর্যন্ত। পাশ করে গেলি! মা হতবাক।
তোমার আশীর্বাদে। আমি জানাই : তুমি যে প্যাঁচ শিখিয়ে দিয়েছ না, তাই কষেই তো তরে গেলুম এ যাত্রা। বরাবর এই করেই তরব আশা করছি…কোশ্চেন সব আউট করলাম যে।
সে কি রে! কোশ্চেন আউট করলি কি? অ্যাঁ? মা হতবুদ্ধি-আমি আবার কী প্যাঁচ শেখালুম তোকে।
ঐ যে! ভুরুর মধ্যেখানে মন এনে মা দুর্গাকে ডাকতে–পরীক্ষাতেও সেই ভুরকুটি দেখিয়েছি। ঐ করে কোশ্চেন সব বার করেছি। তাই আমাকে আর কষ্ট করে পড়তে হয়নি, পরীক্ষা পাশ করতে হয়নি, এমনি করেই পরীক্ষার পাশ কাটালাম। পরীক্ষাই আমায় পাশ করে গেল এবার।
শুনি তত ব্যাপারটা। মার আগ্রহ দেখা যায়।
এইরকম আর কি, আমি বিশদ ব্যাখ্যা করে দিই, চোখ বুজে ঐ সন্ধিস্থলে, নাকি সন্ধিক্ষণে- মন নিয়ে আসি আর মা দুর্গার নাম করে একটা বইয়ের একটা করে জায়গা বার করি–এমনি করে পাঁচবার করার পর সেই সব জায়গার দুদিকের পাতার, মোট দশ পৃষ্টার সবখানি দুরস্ত করে রাখি, তার পরে দেখা গেল ঐ দশ পৃষ্টার ভেতর থেকেই বেশির ভাগ প্রশ্ন এসে গেছে। পাশ করার মতন নম্বর পেয়ে গেছি তাইতেই।
এই করে পাশ করেছিস তুই? মার মুখে রা সরে না।
হ্যাঁ। এই করে ইংরেজি বাংলা ভূগোল ইতিহাস সব, শুধু অঙ্কটাতেই সুবিধে হল না মা। পইত্রিশ পেয়ে টায়েটুয়ে কোনোরকমে পাশ।
মোটে পঁইত্রিশ?
হ্যাঁ, সব অঙ্ক জানা ছিল না তো। একটা বড় যোগ বিয়োগ গুণ ভাগের অঙ্ক, একটা ডেসিমেলের, ফ্র্যাকশনের আক একটা,আর ঐ সিঁড়ি ভাঙা একখানা কষতে পেরেছি কেবল। জিয়োমট্রির একটা থিয়োরেমও করেছিলাম কিন্তু তার জন্য মাত্র আদ্ধেক দিয়েছে।
আদ্ধেক কেন?
আমি এখানে মন নিয়ে এসে মনগড়াভাবে সেটাকে মিলিয়ে দিয়েছিলাম কি না। অঙ্কের স্যর বললেন যে আমি যেভাবে প্রুভ করেছি তাও হতে পারে বটে, তবে বইয়ের মতনটাই ফলো করতে হবে আমাদের। সেই কারণে তার জন্যে পুরো নম্বর দেননি।
বাকী অঙ্কগুলো তোর জানা ছিল না কেন? ঐখেনে মন নিয়ে এসে চেষ্টা করিসনি কেন জাবার?
করেছিলাম। বের করেছিলাম দশটা পাতা, তার ভেতরের আঁকও এসেছে হয়ত বা, এসেছে কি না তাও জানি না, আসতে পারে হয়ত–কিন্তু ঐ অঙ্কগুলো তো আমার জানা ছিল না, কষিনি তো আগে।
কেন, কষিসনি কেন? আর জেনে তখন-তখনি বা কষে নিলি না কেন–ঐ অঙ্কগুলো?
কী করে করব? আগের অঙ্ক না জানা থাকলে, কষে না রাখলে পরের অঙ্ক কি করা যায় নাকি? এ তো আর তোমার মুখস্থ করা নয় যে মুখস্থ করে রাখলেই হবে-স্টেপ বাই স্টেপ এগিয়ে যাবার ব্যাপার। আগের অঙ্কগুলোই করিনি যে।
অঙ্কের মাস্টার ক্লাসে হোম টাস্ক দেন না তোদের? দেখাতে হয় না প্রত্যেক দিন?
হয় বইকি। সে আমি ম্যানেজ করি। আমি বলি, কাবিল হোসেন আমাদের ক্লাসের ফাস্ট বয়, আমার খুব বন্ধু। হোমটাসূকের অকগুলো আমার খাতায় কষে দেয় সে রোজ রোজ-তাই আমি সেকেন্ড মাস্টারকে দেখিয়ে দিই। প্রতিদানে কাবিলকে আমি মাঝে মাঝে রসগোল্লা খাওয়াই বাণিজ্যার দোকানে।
তাই নাকি রে?
হ্যাঁ। তবে সেও খাওয়ায় মা আমায়। তাদের হোটেলে মুর্গি-টুর্গি হলে ডেকে নিয়ে খাওয়ায়।. মুগি খাওয়া কি খারাপ মা? মুসলমানের খেলে কি জাত যায় আমাদের?
পাগল। হিন্দু মুসলমান আবার কী? জাত বলে কিছু নেই রে! তবে গোরু টোরগুলো প্রাসনে যেন কখনো।
না, তারাও খায় না। আমরা মনে কষ্ট পাব বলে কাটেও না তারা। মাকে আমি ভরসা দিই–আমি তাকে তোমার ওই মা দুর্গার প্যাঁচটা শেখাতে গেছলাম, সে বললে যে, তাদের ওটা করতে নেই। আল্লা ছাড়া আর কোনো দেবতাকে ডাকলে তাদের গুণা হয়। সে বললে বিসমিল্লার কাছে প্রার্থনা করলেও সেই ফলই পাওয়া যাবে–বিসমিল্লা হের রহমানে রহিম-এই মন্তর বলে চাইতে হয় নাকি। তা কি হতে পারে মা?
কেন হবে না? এই তো সব। সব তো একই। সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে সেই ভগবান-সেই কেন্দ্রস্থলে মন নিয়ে যেতে হয় কেবল, তাহলেই হলো। এখন, যে মন্তরে, যা বলে ডেকে সেখানে তুমি যাও না কেন! আসলে সেই একই জিনিস–এক ভগবান। বিসমিল্লা আর দুর্গা এক–সেই এক বিন্দুবাসিনী।
বিসমিল্লা হের রহমানে রহিম আর মা দুর্গা এক? কথার হেরফের কেবল? আচ্ছা, যেমন করে এখানে মন এনে কোশ্চেন জেনে পাশ করলাম তেমনি করেই তো ফাস্টও হতে পারি আমি?
