তুমি সিহ? সিংহ তত তোমার কেশর কই গো? সে হাসে: তবে তোমার চুলগুলো প্রায় কেশরের মতই বানিয়েছ বটে! এমন ঝাঁকড়া চুল-ছাঁটো না কেন? ছাঁটবার সময় পাও না নাকি?
নাপিতের কাঁচির সামনে উবু হয়ে ঘাড় হেঁট করে বসে থাকতে আমার এমন বিচ্ছিরি লাগে। কারো খচখচানি আমার সয় না। এমনকি, ওই কাঁচিরও নয়।
ততক্ষণে আমি তাকে কোলে তুলে ফেলেছি।–ই তেমন ভারী মোস তো! হালকা পলকা আছিস। তবে বিয়ের পর শুনছি মেয়েরা নাকি খুব মুটিয়ে যায়। তুইও বেশ মোটা হবি তখন।
বয়স হলে ছেলেরাও মোটা হয়। ভুড়ি হয় তাদের। তুমিও মোটাবে।
সে নেহাৎ মন্দ হবে না–যদি দুজনেই একসঙ্গে মোটাই। ভালোই হবে মোটের ওপর।
মোটামুটি মানিয়ে যাবে বলছ?
হ্যাঁ, দুজনেই যদি মোটামুটি হই-এইতো এসে গেলাম পারে। কই, পড়লি তুই জলে? পর পারে নিয়ে ওকে নামালাম।
কিন্তু নামাবার আগে শরৎচন্দ্রের কথা আমার স্মরণে এল। তাঁর স্বামী বইটা আমার পড়া হয়ে গেছল তার মধ্যেই-কৃজ্ঞরণ সরকারের পাঠাগারের থেকে নিয়ে। দামিনীকে কোলে করে নরেনের সেই নালা পেরুনোর ঘটনাটা আমার অবচেতনের মধ্যে যেন বিদ্যুতের মতই চমকে উঠল অকস্মাৎ। আমাকে নালায়িত করল।
বিশিষ্টরূপে বহন করার মানেই যে বিবাহ, তদ্ধিত প্রত্যয়ের সেই তথ্য বাংলার সারের সৌজন্যে আমার অজানা ছিল না তদ্দিনে। নরেনের মতই তাকে মাটিতে নামাবার আগে আমার স্বামীত্বের স্বাক্ষর তার মুখপত্রে রেখে দিয়েছি।
এটা কী হোলো আবার? ওর দু চোখে দুই সৌদামিনী খেলে যায়।
আমার লায়ন্স শেয়ার। আমি বললাম, মজুরি নিলাম…আমার এতক্ষণ তোকে বয়ে আনতে কষ্ট হল না বুঝি? একটুখানি মিষ্টিমুখ করে সেই কষ্ট লাঘব করা গেল।
হটতে হাঁটতে আমরা সিঙিয়ার আমবাগানের সামনে এসে পড়েছি।
ও বাবা! এই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাব নাকি এখন আমরা? ভেতরটা কী দারুণ অন্ধকার।
জঙ্গল বলছিস? সিঙিয়ার বিখ্যাত আমবাগান-এর নাম। হাজার খানেক আম গাছ আছে বাগানটায়। ভালো ভালো আম যতো। ল্যাংড়া বোষই ফজলি গোপালভোগ হিমসাগর ক্ষীরসাপাতি-কত কী! আমের সময় আমরা ছুরি নিয়ে চলে আসি। গাছতলায় কত পাকা আম পড়ে থাকে যে। কাটি আর খাই। আমি জানাই : অনেক ছেলে আবার গাছে উঠেও খায় বসে বসে।
আমিও খাব, এবার যদি আমের সময় আমাদের থাকা হয় এখানে। রিনি বলে আমি কিন্তু গাছে উঠতে পারব না।
আমিও পারিনা। গাঁয়ের অনেক মেয়ে পারে কিন্তু। গেছো মেয়ে কিনা তারা।
সন্ধ্যা হয়ে গেছে, এই অন্ধকারে বাগান দিয়ে যেতে ভয় করছে আমার। সাপখোপে কামড়ায় যদি?…কতখানি পথ গো?
তা, আধ মাইলটাক হবে। ইস্কুল যাবার সময় এই বাগান দিয়েই তো আমরা শর্টকাট করি। রাজবাড়ির ডান দিকে রামসীতার মন্দির, আর তার পাশেই আমাদের ইস্কুলটা। সাপের ছোবলের ভয় কছিস? তাহলে, কোলে করে নিয়ে যাই তোকে?
আর ই বলে… আর কিছু সে বলে না। তার চোখের কানিতেই কথাটা বলা হয়ে যায়।–বুঝেছি।
খেতে খেতে যাব আর যেতে যেতে খাব এই কথাই বলছিস তো? বাবা বলেন, মুখের অন্ন সম্মুখের অন্ন ছাড়তে নেই। তা যখন অন্নপূর্ণাই বয়ে নিয়ে যাচ্ছি…
অত অন্ন খাওয়া ভালো নয় মশাই। গরহজম হয়।
তা যা বলিস। আমার জবাব : কিন্তু যতই খাই না কেন, তোর মাথা খেতে পারব না। তোর মাথা অলরেডি খাওনা। মামা বলে, কলকাতায় মাথা না খাওয়া মেয়ে নাকি একটাও নেই–তারাও নাকি আবার জোর মাথাখোর। আমার মামার অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করি-আর, তুইও তো কলকাতার মেয়ে। তার ওপর এমন সুন্দর। তোর মাথা কি না-খাওয়া আছে এখনও?
কে খেল শুনি?
কে খেয়েছে কে জানে। কেউ না কেউ খেয়েছেই।
না বাপু, তুমি সড়ক ধরেই চলল। পথ দেখে দেখে যাব আমরা। পথের দুপাশে দেখবার কিছু নেই কি।
অগত্যা তিলকুট আর চিড়ের নাড়ু চিবুতে চিবুতে সড়ক ধরেই চললাম আমরা।
এতখানি পথ! ইস্কুলে যাবার সময় কতটাই না মনে হয়। কিন্তু এখন যেন দেখতে না দেখতে ফুরিয়ে গেল। পকেটের রসদ ফুরোতে না ফুরোতেই পথ খতম।
ও বাবা! কত বড়ো একখানা বাড়ি গো। এই বুঝি তোমাদের সেই রাজবাড়ি? চাঁচোরের রাজার?
হ্যাঁ, নতুন রাজবাড়ি। ওর ডান দিকে রামসীতার মন্দির ই। আর তাঁর পাশেই আমাদের হাই স্কুল।
কলকাতায় এত বড় বাড়ি দেখিনি। রিনি অবাক হয়ে দ্যাখে। তবে কলকাতার কতটুকুই বা দেখেছি।
ভেতরে আবার আরও কত বড়ো। যতখানি চওড়া দেখছিস সামনেটা, ততটাই ডান দিকে, বাঁ দিকেও ততখানি, পেছনেও আবার তাই। কতো কতো ঘর যে কতো বড়ো
একখানা হাদ। ফুটবল খেলা যায়। ছাদে আবার কল আছে–খুললেই জল পড়ে।
কলকাতার মই নাকি? বলল কি গো?
তা হবে। কলকাতার কল দেখিনি তো আমি। …কাসর ঘন্টা বাজছে শোন! আরতি এরু হয়ে গেছে এখন।
আমরা মন্দিরের চত্বরে গিয়ে দাঁড়াই। আরতি দেখি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।
বাঃ, বেশ ঠাকুর তো। রাম সীতা লক্ষন হনুমান… রিনি গড় হয়ে প্রণাম করে। আমিও। তোমার সিংহবাহিনী কই গো? দেখছি না তো।
এরই মধ্যে আছে কোনোখানে। এতদূর থেকে ভালো দেখা যায় না। এইটুকুন ঠাকুর তো। আমি বলি : সিংহবাহিনী তো দুর্গাই। মা দুর্গারই একটা নাম সিংহবাহিনী। আমি এখানে মন নিয়ে এসে মার কাছে কি প্রার্থনা করলাম এখন জানিস।
কী?
আমি যেন রামের মতন রাজা হই।
রাজা হবে? রাজা হবে তুমি? রাজা হয়ে কী করবে?
