ভয়াশ লেগে রয়েছে। দা, মুখ মুছিয়ে দি তোর।
এ আবার কী ধরনের মুখ মোছানো? পকেটে রুমাল ছিল না? হত ছিল না তোমার? মাঝ রাস্তার মধ্যিখানে …এই সব। আপত্তি করল সে।
হাত ছিল তো কী? আমি বলি-ঝগড়াঝাটির বেলায় অবশ্যি হাত থাকতে মুখ কে?
তখন কষে তোমার দু হাত চালাও। কিন্তু তেমন কারো মুখ মোছাতে হলে অন্য কথা। তখন মুখ থাকতে হাত কেন? তাই মুখ দিয়েই মুছে দিলাম।
বেশ করেছে। এবার শুনি তোমার সেই কথাটা। মা দুর্গার কথা।
তোমার মা দুর্গা আবার কিরে! তোরও মা দুর্গা তো, মা দুর্গা তো সবাইকার। বল, আমাদের মা দুর্গা।
ওই হোলো। এখন শুনি তো কথাটা।
মা দুর্গা আছে না? শিব আছেন, দুর্গা আছেন লক্ষ্মী সরস্বতী দেবতারা সবাই রয়েছে।
আছেন তা তো জানি। একবাকে তার সায়।–ত কে না জানে?
কিন্তু আছেন কোথায়? সেই আকাশের মগডালে নয়, আমাদের এই শরীরে–আমাদের মনের মধ্যেই। যেমন তোর শিব আছেন মাথার এইখানটায়, আর মা দুর্গা রয়েছেন তাঁর পায়ের তলায় বসে–এইখানে কপালের মধ্যিখানে। এখানে মন নিয়ে এসে এমনি করে মা দুর্গাকে ডাকতে হয়। আনতে পারিস এখানে তোর মন?
কি করে আনব?
দাঁড়া, আমি দেখিয়ে দিচ্ছি তোকে। আগে আমার এখেনে ডেকে আনি মা দুর্গাকে…বলাটা হয়তো ভুল হলো…আগে আমাকে ডেকে নিয়ে যাই এখানে মা দুর্গার কাছে, তারপর…
তারপর মার আখ্যানের পুরোটাই তার দেহে মনে মঞ্জরিত করতে লাগিযথাবিহিত পুরঃসর আমার অখ্যানমঞ্জরী নিবেদনের পর ওধাই : কি রকম লাগছিল ব তো, আমি যখন…
তুমি যখন ঠোঁট ঠেকিয়ে রেখেছিলে না, সারা গা কেমন শিরশির করছিল আমার।
করবেই তো! কপালটা শিরোভাগ না? তাই করবেই তো শিরশির!
কপাল নয় গো, গাটা শিউরে উঠছিলো যেন।
আহা, ওই শীর্ষদেশ থেকেই তো যতো শিরা উপশিরা আমাদের সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে। মাথার ডাকে সাড়া দিচ্ছিল তারা। নিজের বুদ্ধিমত্ত আমার ব্যাখ্যা করা।
এবার বুঝলাম। বেশ তো, ডাকা গেল না হয় মা দুর্গাকে। কিন্তু কারণে অকারণে নাহক তাঁকে ডাকতে যাব কেন? তাঁকে বিরক্ত করা হবে না?
মা আবার বিরক্ত হয় নাকি ছেলেমেয়ের ওপর? আর অকারণে কেন? কোনো কিছুর দরকার পড়লেই ডাকবি তো। চাইবার জন্যেই ডাকবি, পাবার জন্যেই ডাকবি রে। দেখবি তোর প্রার্থনা পূর্ণ হয় কিনা।
আচ্ছা, আমি কিছু না চাইবার জন্যে ডাকি যদি? সে জানতে চায়।
না চাইবার জন্যে ডাকা? না পাবার জন্যেই সে আবার কী রে? তার কথাটায় আমার ধাঁধা লাগে, বুঝতে পারি না ঠিক।
ধরো, মা তো আমাদের আছে মাসে কলকাতায় নিয়ে যেতে চাইছে। আমি এখান থেকে যেতে চাইনে। আমি যদি এখন দুর্গার কাছে না যাবার জন্যে চাই তাহলে আমাদের যাওয়া হবে তো?
না চাওয়ার জন্য চাওয়া যায় কিনা তা আমি জানি না। ওর কথায় আমি ভাবনায় পড়ি–জিগ্যেস করতে হবে মাকে। তারপরে তোকে বলব।
না পাওয়ার জন্য চাওয়াটা কী আবার? ওর কথাটা আমার অদ্ভুত লাগে–সত্যি, তোরা মেয়েরা যেন কেমনধারা। আমরা ছেলেরা চাইবার জন্যেই চাই, পাবার জন্যেই চেয়ে থাকি-পাই আর না পাই। কিন্তু এই তোরা-মেয়েরা! তোরা না চাইবার জন্যেও চাস আবার না পাবার জন্যও চেষ্টা করিস। আশ্চর্য!
চাইলে যদি পাওয়া যায়, না চাইলে তবে না পাওয়া যাবে কেন? তার জিজ্ঞাসা।
কে জানে। তোরা মেয়েরাই তা জানিস। আমরা ছেলেরা যা চাই তাই শুধু চাই, তেরা মেয়েরা তার ওপর আবার না চাইতেও,চাইতে পারিস দেখছি। মামা যে বলেন কথাটা মিথ্যে নয় তাহলে, মামা বলতেন বটে, কিন্তু আমি তার মানে বুঝতাম না তখন।
কী বললে তোমার মামা?
মেয়েরা ভারী নাচাইতে পারে।
তুমি ভারী বোকা! সেটা ঐ না চাওয়া নয় মশাই, তা হচ্ছে গিয়ে তোমায় বাঁদর নাচানো।
তোরাই জানিস। তোরাই নাচাস তো।
বেড়াতে বেড়াতে আমরা মহানন্দার তীরে গিয়ে দাঁড়িয়েছি।
আমরা যাচ্ছি কোথায় বল তো? সে শুধায়।
রামসীতার আরতি দেখতে যাচ্ছি না। নদীটা পেরিয়ে যেতে হবে।
জল আছে যে নদীতে।
ও হাঁটুখানেক জল। অক্লেশে হেঁটে পেয়োনো যায়। বর্ষাকালে বান ডাকে। তখন ফেলে ওঠে এখানকার মহানন্দা। অন্য সময় বেচারী মহাবিষণ্ণ হয়ে পড়ে থাকে ওর একটুখানি জল নিয়ে।
ঐ তো দূরে পুল দেখা যাচ্ছে, সাঁকোর ওপর দিয়ে গেলে হয় না?
তাহলে এই ফুটবলের মাঠ ক্রস করে এলাম কেন? সাঁকো দিয়ে পেরিয়ে পাকা সড়ক ধরে গেলে অনেক দূর পড়বে, দেরি হবে বাড়ি ফিরতে। সোজাসুজি নদী পার হয়ে সিঙিয়ার আমবাগানের ভিতর দিয়ে শর্টকাট করব আমরা।
হাঁটুর বেশি জল হয় যদি? আমার ফ্রক ভিজে যাবে কিন্তু।
কোলে তুলে নিয়ে যাব তোকে? কি, পিঠে করে?
পারবে? জলে ফেলে দেবে না তো?।
তোর কী মনে হয়?…জলেই তোকে বিসর্জন দেব?
রামসীতা ছাড়া আরো কী যেন ঠাকুর আছে বলছিলে-যা দেখতে যাচ্ছি আমরা। আর কী ঠাকুর?
সিংহবাহিনী। এইটুকুন ঠাকুর কিন্তু আগাগোড়া সোনা দিয়ে গড়া।
তাই নাকি?
কিংবা সোনা দিয়ে মোড়াও হতে পারে। জানি না ঠিক।
দেখেছ তুমি?
দেখিনিও বলা যায় আবার দেখেছিও বলা যায় আবার। চোখের সামনেই দেখছি তো এখন। তোর সোনার প্রতিমা দেখছি না?
হয়েছে। খুব হয়েছে।
তুই আমার কাছে সিংহবাহিনী। আর আমি যদি তোকে বয়ে নিয়ে যাই তবে আমি তোর বাহ্ন হব তো? আমি হব গিয়ে তাহলে তোর সিংহ। বুঝেছিস?
