রামসীতা রাজবাড়ির ঠাকুর। আর সিংহবাহিনী তাদের কুলদেবতা। সোনার প্রতিমা-ছোট্ট একটুখানি। দূর থেকে দেখা যায় না। খুব কাছে গেলে তবেই দেখা যায়, দেখিনি কখনো। পুজোর সময় পাহাড়পুরে রাজবাড়ির মহাপুজায় বিরাট দুর্গা প্রতিমার পাশেই নাকি সোনার সিংহাসনে সিংহবাহিনীকে রাখা হয়–মা দুর্গার সঙ্গে তাঁরও পূজা হয়ে থাকে তখন। মা দেখেছেন সে ঠাকুর, আমার চোখে কিন্তু পড়েনি।
দুথালা প্রসাদ, একটা শ্বেত পাথরের থালায়, আরেকটা থালা রূপোর।
দুথালা কেন গো? দুরকমের দুটো থালা যে।
রূপোর থালায় মা সিংহবাহিনীর প্রসাদ, আর শ্বেতপাথরে সীতারামের।
প্রসাদ রেখে দিয়ে থালা নিয়ে যাবে তত তোমরা? লোকগুলোকে শুধোলাম।
না। না। থালা এখানেই থাকবে। থালাসমেত রেখে যেতে বলেছেন রাজাবাহাদুর।
রাজবাড়ির ব্যাপার। রাজরাজড়ার চালচলন। তাদের কান্ডকারখানাই আলাদা।
এর আগে আর কখনো আমাদের বাড়ি বৈকালীর পালা পড়েনি। আসেনি কখনো আর। সেই প্রথম এল।
আর, সেই প্রথম আমার ঈশ্বরের প্রসাদলাভ…মার আশীর্বাদে।
১. নিমগাছের ছায়া
১১.
সেদিন সারা বিকেলটা নিমগাছের ছায়ায় শুয়ে শুয়ে প্রাণপণে মা দুর্গাকে ডাকাডাকি করলাম কিন্তু কোথায় কী! সেই বৈকালী আর এলো না। কপালগুণটা বাজিয়ে দেখতে রোজ রোজ আসতের বাবা বস্তুর ঘন ঘর সবার খুলবে এইরকম। কালী একটু গিয়ে মাঝখান থেকে খিদে বেড়ে গেল আরো।
বৈকালীর বদলে রিনি এল-বেরুবে না আজকে? বেড়াতে যাবে না?
যাব বইকি। মাঠের পারে কি পুকুর ধারে নয়, নতুন জায়গায় বেড়াতে যাব আজ, দাঁড়া, আগে কিছু খাবার ব্যবস্থা করি। রিনিকে নিয়ে মার কাছে গেলাম। মা, কিছু খেতে দাও না আমাদের। ভারী খিদে পেয়েছে।
সেই কখন খেয়েচিস। খিদে পাবে তার আশ্চর্য কী। কি ছিলি এতক্ষণ?
নিমগাছের ছায়ায় ছাদে শুয়ে তোমার মা দুর্গাকে ফাঁদে ফেলবার তালে ছিলাম। কিন্তু এত করে চাইলাম, বৈকালী তো বই এল না আজ?
রোজ রোজ আসবে না কি? একেকদিন একেকজনের পালা যে? পালা মরে সবার বাড়িতেই যাবে তো। তোর বাবা বয়সে আর মানে সবার চাইতে বড়ো বলে প্রথমদিনের পালাটা তারই পড়েছিল। বামুন পাড়ার ঘ. ঘর সবার বাড়ি যাবে, তারপর বড় বড় আমলাদারদের বাড়িতেও। সারা বোশেখ মাস ভোরই তো চলবে এইরকম।
তা যাই বলল না মা, চাইলেই পাওয়া যায় না সব সময়। তোমার মা কালী একটু খামখেয়ালী আছে।
তা আছে। তবে চাইলেই পাবি-পাবি যে, সেটা নিশ্চয়। কখনো তক্ষুনি, কখনো বা কিছু পরে। পেতেই হবে, না পেয়ে যাবিনে কক্ষনো। কখনো চেয়ে পাবি, কখনো বা গেয়ে চাইবি-কখনো বা না চাইতেই পেয়ে যাবি-এমন ধরা চলতে থাকবে সারা জীবন, পরখ করে দেখিস।
পরখ করে দেখলাম তো এতক্ষণ। আমার দু র শোনা গেল।
আবার চাইবার আগেই পেয়ে যাবি একেক সময়–বললুম না? দেখবি যে না চাইতেই কখন দিয়ে বসে আছেন মা। মা বলেন।
তাই নাকি?
হ্যাঁ, জীবনের কোন জিনিসই তো এখনো তোর টেস্ট করা হয়নি। তাই আগে মা একটুখানি করে তাদের বাদ দেবেন। স্বাদ দিয়ে তোর সাধ জাগাবেন। আর, তোর সাধ মেটাকেন চাইলে পরেই তারপর। মেটাতে মেটাতে যাবেন তিনি জীবনভোর বরাবর।
একেই বুঝি সাধনা বলে থাকে? তাই না মা?
তাও বলতে পারিস। তবে সাধনা দুতরফেই-মার পুত্রসাধনা আর ছেলের মাতৃসাধনা। দুজনের দুজনকে নিয়ে সাধ আহ্রদ।
বাঃ বেশ তো! শুনে আমার বেজায় ফুর্তি হয়। হাতে যেন স্বর্গ পেয়ে যাই তক্ষুনি।
যেমন চাইবার আগেই পেয়ে গেছিস আজকে। পরে তুই চাইতে পারিস বলে তার আঁচ পেয়ে আগের থেকেই যুগিয়ে রেখেছেন মা।
কোথায় পেলাম। মার কথায় আমার অবাক লাগে।
আজ সকালেই পৌঁছে গেছে তোদর বিকেলের জলখাবার।
বলোনি তো তুমি? কখন এল? কী এসেছে?
তোরা তো তখন ইলেছিলি–বলব কখন? আজ সকালে তোর বাবা পাহাড়পুরে তোর জ্যাঠাইমাদের বাড়ি গেছলেন না? বড়মা তোদর জন্যে ক্ষীরের ছাঁচ সরের নাড়ু চন্দ্রপুলি তিলকোটা চিড়েমুড়ির মোয়া পাঠিয়ে দিয়েছেন সব।
দাও দাও। বলেনি কেন এতক্ষণ। আমি ব্যস্ত হয়ে উঠি।
বস। বসে খা। রিনি আর আমাকে আসনপিড়ি হয়ে বসতে বলেন মা।
বসে বসে খায় নাকি মানুষ? রাস্তায় খাব আমরা। বেড়াতে যাচ্ছি না এখন? রিনিকে আমি রাম-সীতার মন্দির দেখাতে নিয়ে যাচ্ছি আজ। আরতি দেখে ফিরব। যেতে যেতে খাব আর খেতে খেতে যাব। বড়মার অবদানে আমার দুপকেট বোঝাই করে বেরুলাম।
বেশি রাত করিসনে যেন। পই পই করে বলে দিলেন মা।–সামনে ক্লাস পরীক্ষা রয়েছে তোর। এসেই পড়তে বসবি, বুঝেছিস? বেশি রাত জেগে, কি মাঝ রাত্তিরে উঠে আমি পড়তে দেব না।
ঘাড় নেড়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম।
তোমার মা আবার কোন মায়ের কথা বলছিলেন গো! যিনি সব জুগিয়ে থাকেন? তোমার পাহাড়পুরের বড়মা?
না না, অন্য মা। আরেক মা। তোর মা, আমার মা, মার মা, বড়আরও মা-সবার মা, যিনি বিশ্বজননী, মা দুর্গা। তার কথাই বলছিলেন মা।
মা দুর্গা?
হ্যাঁ, তিনিই খাবার পাঠিয়েছেন আমাদের–খেতে চাইবার আগেই। রিনির বড় বধু চোখ আরো বড় হয়ে উঠল যেন।–তাই নাকি?
হ্যাঁ, চল না। যেতে যেতে বলছি তোকে সব। আগে কিছু খেয়ে নেয়া যাক। খিদে পেটে তত্ত্বকথায় মন যায় না।
পুলির তত্ত্ব নেবার পর রিনির চাঁদ মুখের তত্ত্ব নিলাম।- তোর মুখে নারকেল নাড়ু
