তুমি তো আছে। মা থাকতে ছেলের ভয় কি!
আমি কি চিরদিন আছি নাকি? বেঁচে থাকব চিরকাল?
থাকলেও তখনো তুমি থাকবে, আমি জানি। আমার ভাবনা নেই।
তা কি হয় নাকি রে? তুই কি আমায় বেঁধে রাখতে চাস? আমি বাঁধা পড়তে চাই না। কিছুতে না, কারাতে না।
তারপর খানিক কী ভাবলেন তিনি-দাঁড়া, তোর সঙ্গে আসল মা-র পরিচয় করিয়ে দিই। তাহলে আর তোর কিছু ভাবনা থাকবে না। খাওয়া পরার তো নয়ই–কোনো দুখকও পাবিনে জীবনে। দাঁড়া।
দাঁড়িয়েই তো রয়েছি। তোমার সামনেই তো দাঁড়িয়ে।
আমার দুই ভুরুর মধ্যবিন্দুতে আলতো করে তার বাঁ হাতের কড়ে আঙুলটি চুঁইয়ে তিনি বললেন-এইখেনে মন আনতে পারিস? আন দেখি? এই দুই ভুরুর মাঝখানে?
মন?
হ্যাঁ। মন আনতে হবে, এনে স্থির করতে হবে এখানটিতে। সারা দেহময়ই তো তোর মন ছড়িয়ে-তাই না? সেই সবগুলো মনকে কুড়িয়ে বাড়িয়ে এইখেনে নিয়ে এসে জড়ো করতে হবে–মনের মধ্যে মন। সেই মনের মধ্যেই মা দুর্গা থাকেন। সবার মা যিনি, বিশ্বজননী…। এনেছিস মন?
চেষ্টা করছি।
কী মনে হচ্ছে এখন?
কতো কী! কতো কী যে মনে পড়ছে।
মা দুর্গার কথা?
না তো। যত সব আজেবাজে মেয়েদের কথা মনে আসছে কেবল।
তোর মনে আবার মেয়ে কী রে! মা তো শুনে হতবাক।
রিনিটিনিদের কথাই মনে পড়ছে আমার।
তাই বল! শুনে হাসলেন মা-দাঁড়া, আমি তোর মন এনে দিচ্ছি এখেনে। এ বলে তিনি ভ্রুর মধ্যে তাঁর মুখ ছোঁয়ালেন-যতক্ষণ আমি তোকে চুমু খাব ততক্ষণ তোর মন এখেনে থাকবে। তুই মনে মনে মা দুর্গা মা দুর্গা কর–আমিও মাকে ডাকছি মনে মনে। মা আবার আমাদের দুজনকে ডাকছেন। এইখেনে বসে। মিনিট খানেক বাদে মা শুধালেন–এলো মন?
হ্যাঁ।
কি রকমটা বোধ হলো তোর?
শিরশির করছিল গা।
মা দুর্গার আবির্ভাব হলো কিনা, সেই জন্যেই। তারপরে তিনি আমার ব্রহ্মরন্ধ্রে হাত ছুঁইয়ে বললেন-এখানে থাকেন বাবা মহাদেব। পরম শিব। আর, তাঁর পায়ের তলায়, এইখখনে দুই ভুরুর মাঝখানটিতে পার্বতী রয়েছেন। দশভুজা দুর্গা। আর এইখানে, এই কঠদেশে আছেন বাদেবী-মা সরস্বতী। বুকে নারায়ণ, নাভিপরে মা লক্ষী–এমনি সব নানা দেবতা নানান অঙ্গে ছড়িয়ে, বড় হয়ে যখন বই পড়বি, তন্ত্রের বইই পড়বি, তখন টের পাবি। দেহের নানা স্থানে নানান চক্র রয়েছে ভুরুর মাঝখানটিতে আছে আজ্ঞাচক্র। মা দুর্গা এখানে বসে আজ্ঞা করছেন, বলছেন তথাস্তু। তথাস্তু। তাই হোক। তাই হোক। এখানে মন নিয়ে এসে তোর মন দিয়ে যা চাইবি তাই পাবি। পেয়ে যাবি-দেখিস।
তাই পাব? বলছ কি মা?
নিশ্চয়। চেয়ে দ্যাখ না তুই।
চাইব বইকি। আজই চাইব। আমার কিন্তু মোটেই বিশ্বাস হচ্ছে না মা।
বিশ্বাস না হলেও হবে। অবিশ্বাস করে চাইলেও পাবি-শুধু মার কাছে এসে চাইতে হবে…এইখেনে মন নিয়ে এসে…
বিশ্বাস না হলেও?
অবিশ্বাসে কী আসে যায়? মা কি আর মা থাকে না তাহলে? অবিশ্বাস করে আগুনে হাত দিলে কি হাত পুড়বে না তোর? মা তো আগুন রে।
তবে যে মামা বলেন, বিশ্বাসে মিলয়ে কৃষ্ণ তর্কে বহুদূর…!
সে কথা কৃষ্ণের বেলা খাটতে পারে, মার বেলা নয়। মা তো তার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে সব সময় মিলে রয়েছেন। যাই গে, আমার কাজ পড়ে রয়েছে।
চলে গেলেন মা। আমিও চলে এলাম আমাদের বাড়ির দক্ষিণ দিকের খোলা ছাদের নিমগাছের ছায়ায়। আমার মোয়ার, শুয়ে শুয়ে বই পড়ার প্রিয় জায়গা ছিল সেইটা। খোলা হাওয়ায় খোলা ছাদে গা গড়িয়ে ভুরুর মাঝখানে মা দুর্গাকে নিয়ে টানাটানি করতে লাগলাম শুয়ে শুয়ে।
বিকেল গড়িয়ে এসেছিল, খিদে পেয়েছিল বেশ। সেই কখন সন্ধ্যে হবে, লুচি ভাজবে, খেতে বসব আমরা। এর মধ্যে যদি কিছু খেতে পাওয়া যায়, কী ভালই না হয় তাহলে। মনে মনে মা দুর্গার কাছে খাওয়ার দাবি জানাতে লাগলাম।
মা দুর্গাকে ছেড়ে কখন ফের রিনিদের কথা ভাবতে লেগেছি টের পাইনি। এদিকে বড় বারকোস নিয়ে দোতালার সিঁড়ি দিয়ে উঠছিল কজনা। সামনের ছাদে আমায় শুয়ে থাকতে দেখে ইশারায় অরা ডাকলো আমাকে।
কী ব্যাপার? না, মা সিংহবাহিনী আর রামসীতার শীতল ভোগের মহাপ্রসাদ-বৈশাখ মাসের বৈকালী। সারা বোশেখ মাসটা ধরেই প্রতিদিন বিকেলে এমনি ধারা বৈকালিক ভোগ দেয়া হবে তাঁদের, আর সেই প্রসাদ পালা করে বিলোনো হবে একেক জনকে একেক দিন।
আজ প্রথম দিনটিতেই রাজাবাহাদুরের হুকুমে আমাদের পালা পড়েছিল।
প্রকান্ড রূপোর আর শ্বেত পাথরের দু থালায় সাজানো মাখন ছানা ক্ষীর সর বাদাম কিসমিস আখরোট আঙুর খেজুর ভিজে ছোলা শসা কলা ইত্যাদি যাবতীয় ফলটল আর সেই সঙ্গে সন্দেশ-টশে আরো কত কী!
সীতারাম সিংহবাহিনীর শীতল ভোগের মহাপ্রসাদ।
নয়া রাজবাড়ির দক্ষিণ দিকে রামসীতার প্রকান্ড মন্দির। দেখেছিলাম আমি। তার পাশেই সিপাহিদের বকেয়া ব্যারাকে আমাদের হাইস্কুল বসতো।
রোজ সন্ধ্যায় রামসীতার পূজারতি হয় খুব ঘটা করে তাও শুনেছি। কোনো দিন তা দেখা হয়নি। কী করে দেখব? ইচ্ছে থাকলেও অত দূরে সন্ধ্যেবেলায় একলাটি কি আমায় যেতে দেয়? আমাদের এই পুরনো রাজবাড়ি থেকে নয়া রাজবাড়ি তো কমখানি পথ না।
রামসীতার দিনের বেলার পূজার্চনাও দেখিনি কখনো। দুপুরে যে রাজভোগ হয় শত শতলোক তার প্রসাদ পায় নাকি। আর রাত্রির গোয় সন্ধ্যারতি–তা নাকি একটা দেখবার মই। দেখতে হবে একদিন। রিনিকে নিয়ে দেখে আসব না হয়।
