বন্ধুত্বের সেই পরাকাষ্ঠায় বৃযোৎসর্গের মই আত্মাহুতি দিতে হতো আমাদের।
জীবন মন্থনের প্রথম ভাগেই তাই যত না অমৃত, তার পরে যা ভাগ্যে ওঠে তা নিতান্তই হলাহল। তখন কার ভেলকিতে কেমন করে কে জানে, আগের সব অমিয়ই গরল আর ভেল হয়ে গেছে!
জীবনভোর জীবন-যন্ত্রণাই বাকী আছে কেবল।
চাঁচোরের কাছাকাছি নামডাকওয়ালা এক গ্রাম ছিল–বেশ বধিষ্ণু-কলিগ্রাম। চাঁচোর থেকে পাকা সড়কে পুল পেরিয়ে যাওয়া যেত কলিগাঁয়, আবার আমাদের ইস্কুলের পাশের চাষের খেতের মধ্যে দিয়েও সোজাসুজি যেতে পারতাম সেখানে। কলিগাঁর ছেলেরা চাঁচোরের ইস্কুলে পড়তে আসত। তাদের অনেকের সঙ্গে ভাব হয়েছিল আমার।
কলিগ্রাম যেমন মালদা জেলার এক নামকরা গ্রাম, তেমনি কলিগ্রামের বিখ্যাত নাম কৃষ্ণচরণ সরকার। একজন জমিদার বা মহাজন সেখানকার; একদা স্বদেশী যুগের পাড়া। ছিলেন, পরে অসহযোগ আন্দোলনেও যোগ দিয়েছিলেন তিনি। স্বনামধন্য বিনয় সরকারের সহযোগে মালদহের বিখ্যাত সংস্কৃতিপত্র গম্ভীরা-র তিনি ছিলেন প্রকাশক সম্পাদক। তাঁর এক বিরাট গ্রন্থাগার রয়েছে খবর পেলাম কলিগাঁর ছেলেদের কাছে। পত্রপাঠ গেলাম তার বাড়ি।
তাঁর ব্যক্তিগত লাইব্রেরীর বই কাউকে বড় একটা তিনি নিতে দিতেন না, এইরকম শুনেছিলাম। এই কারণেই বোধহয় বইগুলো টিকে ছিল।
বাবার নাম করতেই সমাদরে তার বইয়ের ঘরে তিনি নিয়ে গেলেন আমাকে। আলমারিতে আলমারিতে সাজানো থরে থরে সব বই। তদানীন্তন লেখকদের বই যত। কত বই যে! ইতিহাস প্রবন্ধ গবেষণামূলক বইও কত! রাখালদাসবন্দ্যোপাধ্যায় যদুনাথ সরকারের বই। শরৎচন্দ্রের বইয়ের সঙ্গেও পরিচয় হয়েছিল আমার সেইখানেই। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের নাটক আর কবিতার বইও পেয়েছিলাম। আরো কতোরকমের বই–মনে নেই এখন।
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায়ের প্রকাশিত তাবৎ বই ছিল তাঁর। তার থেকে ইচ্ছেমত কয়েকখানা তিনি বেছে নিতে বললেন। আর বললেন যে, পড়ে-উড়ে ফিরিয়ে এনে দিলে আবার পাব। এমনি করে সেকালের আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ পরিচয় ঘটল।
সকালে উঠে একখানা বই পড়ে শেষ করি। একখানা দুপুরে পড়ার জন্যে ইস্কুলে নিয়ে যাই। আবার রাত্রে বিছানায় শুয়ে শুয়ে আরেকটা পার করতে লাগি। দুদিন বাদ বাদ নিয়ে আসি গিয়ে।
বাবা বলতেন, গ্রন্থঃ ভবতি পতিত। যারা গ্রন্থ নিয়ে পড়ে থাকে তারাই পতিত হয়।
মানে, তুমি বলছ যে লাইব্রেরীয়ানরাই? যারা কিনা বই নিয়েই ব্যস্ত থাকে সব সময়?
না, সেভাবে পড়ে থাকা নয়, গ্রন্থ নিয়ে পড়া-সেই কথাই বলছি রে। বই পড়েই বিদ্যা আয়ত্ত করতে হয়।
মা, বাবা কী বলছে জানো? মাকে গিয়ে বললাম, গ্রন্থঃ ভবতি পন্ডিতঃ। কথাটা সত্যি নাকি? মানে কী ওর?
ঠিকই বলেছে তোর বাবা। যারা বই মুখে করে পড়ে থাকে সব সময়, তারা পন্ডিত না। হয়ে আর যায় না। বই ছাড়া চোখের সুমুখে কিছুই তাদের পড়ে না তো আর তাই সবটাই পন্ড হয় তাদের। তার মানেই হোলো গিয়ে পন্ডিত।
তুমি কী বলছ মা? পন্ডিত মানে কি তাই? একেবারে পণ্ড হয়ে যাওয়া?
গ্রন্থি কথাটার আরেকটা মানেও আছে আবার। তার মানে গেরো। কপালে গেরো না থাকলে কি কারো পন্ড হয়? কেউ পতিত হয় নাকি? এ হোলো গে ওই বইয়ের গেরো।
গেরোও বলা যায় আবার গেরোনও বলা যায়, তাই না মা?
বলতে পারিস। বই থেকে কী জানা যায় কিছু? মন থেকেই তো জানা যায় সব। সেই জানাটাই আসল। মনের জানাটা বই দেখে মিলিয়ে নেয়া যেতে পারে কেবল, সত্যিকার জানা তোর ঐ মনেই। মনের মধ্যেই তোর সব রে।
বাবা যে ব্রহ্মগ্রহি দেয় পৈতেয়? সেটা তাহলে? সেটাও কি–?
ঐ গেরোই। ধরতে গেলে, সেই গেরোই একরকমের। ব্রহ্মও একটা গেরো ছাড়া কী? গেরোনও বলতে পারিস। যার কপালে ঐ গেরো আছে, যার বরাতে ঐ গ্রহণ লাগে, মানে যাকে তিনি গ্রহণ করেন, তার কি আর নিস্তার আছে নাকি? ইহকাল পরকাল সব ঝরঝরে।
ভগবানের খর্পরে পড়া তাহলে ভালোই নয় বলছ তুমি?
না, আমি কিছু বলছি না। কারো খর্পরে পড়াটাই বুঝি ভালো নয়। তুই পৈতের ব্রহ্মগ্রন্থির কথা বলছিলিস না? সেটা হচ্ছে গিয়ে উপনয়ন সংস্থার। ভগবানের সঙ্গে জোট পাকিয়ে নতুন করে জন্মানো-ভগবান আর তুই দুজনে মিলে একজোটে দ্বিজত্ব লাভ, বুঝলি?
একদম না।
উপনয়ন মানে উপনীত হওয়া, ব্রহ্মের মুখোমুখি গিয়ে পৌঁছনো। ব্রক্ষ সাক্ষাৎ। উপনয়ন মানে তৃতীয় নেত্রও বোঝায় আবার। তার মানে, যা আমি বলছিলাম, তোর ঐ মনের চোখ। মনের চোখ খুলে যাওয়া। যার মনের চোখ খুলে যায় সে পৃথিবীর সব কিছুই যথার্থরূপে দেখতে পায়। আর তাই হল গিয়ে সর্বত্র ব্রহ্মসাক্ষাৎ।
মনের সেই চোখ কি করে খোলে মা?
মার ইচ্ছে হলেই খোলে। এই জন্মেই খোলে, কারো-কারো আবার সাত জন্ম লেগে যায় খুলতে। আবার এই দভেই খুলে যায় কারো কারো। সবই মার ইচ্ছে।
মানে, তোমার ইচ্ছে!
আমার ইচ্ছে? আমি কে? বলছি না মার ইচ্ছে? আমার মা, তোর মা, সবার মাসেই বিশ্বজননী।
তুমিই তো সেই মা। সেই বিশ্বজননী। তুমিই তো! ভৈরবী বলেছিল আমায়।
দূর পাগলা। মা হাসতে লাগলেন আমার কথায়।–মাথা খারাপ করে দিসনে! আমি শুধু ভাবছি তুই খাবি কি করে রে? পড়ার বই ঠুনে একদম-রাতদিন নভেল নিয়ে পড়ে থাকিস। পাসটাস করতে পারবিনে–চাকরি-টাকরিও জুটবে না তোর কপালে। লেখাপড়া শিখলিনে, মুখ হয়ে থাকলি। কী হবে রে তোর? খাবি কি করে?
