কবিতা তো এই সব! এঁরাই তো কবি। তা নয় তো কী, তোর ঐ রবিঠাকুর। আর বকিস না পায়রা কবি, খোপের ভিতর থাক ঢাকা/তোর বক বক আর রকম সকম সব কবিত্বের ভাব মাখা। তাও ছাপালি পদ্য হোলো, নগদ মূল্য এক টাকা!!
কবিকে ঠাট্টা করা কাব্যবিশারদের গালভরা গাঁট্টামারা এই ছড়াটা বেশ ফুর্তি করে তিনি আওড়াতেন।
বাবার উপরোধে মাইকেল, নবীন সেন, হেমচন্দ্রে এক-আধটু হাবুডুবু খেয়েছিলাম। মাইকেলে হাঁপিয়ে উঠেছি, হেমচন্দ্রে উঠে হাঁপছাড়া গেছে, নবীন সেন মন্দ লাগেনি নেহাত তবে স্বচ্ছন্দ নিশ্বাস ফেলতে পেরেছি ভারতচন্দ্র পেয়ে। তাঁর কাব্যলোকে পোঁছে-তর অন্নদামঙ্গল আর বিদ্যাসুন্দরে এসে রস পেয়েছি সেই বয়েসেই। আহা, কী ছন্দ! কী বাক্যের ছটা! কী রূপরাগের ঘটা! একেবারে যেন মাতিয়ে দিয়েছিল।
পুরানো সাধনা, আর স্বর্ণকুমারী দেবীর সম্পাদনায় ভারতীতে রবীন্দ্রনাথের রচনার কিছু কিছু স্বাদ পেয়েছিলাম, আর তদানীং কালের প্রবাসীতেও কিছু কিছু-কিন্তু ভূরিভোজ শুরু হোলো সেই ইস্কুলের লাইব্রেরীর নাগাল পেয়ে। রবীন্দ্রনাথের গল্প কবিতা উপন্যাস প্রবন্ধের বইয়ে ঠাসা ছিল গোটা একটা আলমারিই।
পাঠশালার সেই ঝুলনযাত্রার পর যেন শারদীয়া মহাপূজার মহামহোৎসবের মধ্যে এসে পড়লাম।
প্রথম দিনই আমি চারু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পাদিত রবীন্দ্রনাথের চয়নিকা নিয়ে এসেছিলাম। তার প্রথম কবিতাটা ছিল, মনে আছে এখনো, ধূপ আপনারে মিলাইতে চাহে গন্ধে…। ধূপের মতই যেন আমি রবীন্দ্রনাথের কাব্যছন্দে আর ভাবসৌরভে একেবারে মিলিয়ে গেলাম–বিলিয়ে দিলাম আপনাকে।
বইখানা হাতে নিয়ে বাবার সেই নাক সিটকাননা…এখনো যেন আমার চোখে ভাসে। আমার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন বাবা-আমাদের ছেলে-চারু দেখছি বার করেছে বইটা। পৈতে ফেলে দিয়ে ব্রহ্ম হয়ে গেছে চারু।
ঐ পর্যন্ত, আর কিছু নয়।
লেখক হিসেবে চারুদা আমাদের অচেনা ছিলেন না। প্রবাসীতে তার গল্প আমরা মুগ্ধ হয়ে পড়তাম। তাঁর ভাতের জন্মকথা বইটা তিনি আমার ক্লাস ফ্রেন্ড বিঃ সুকুলকে উৎসর্গ করেছিলেন-বিষ্ণুর কাছ থেকে নিয়ে পড়েছিলাম বইটা। এমন ভালো লেগেছিল যে! সে বইটা বোধহয় পাওয়া যায় না এখন আর।
চাঁচোরের রাজার সম্পর্কে কে যেন হতেন চারুদা আমাদের। রাজাকাকার জামাই চারু বলে আরেকজন ছিলেন, তাই বাবা-মা চারুদের কথা উঠলেই ছেলে-চার বলে বোবাতেন। চাঁচোরের পারিবারিক কাহিনী নিয়ে কয়েকখানা উপন্যাসও লিখেছিলেন চারুদা-পরগাছা, আরও যেন কী কী! প্রবাসীতেই বেরিয়েছিল, পড়েছিলাম।
তাছাড়াও ভাতের জন্মকথা বলে চারুদার হোটদের জন্যে লেখা বইখানা বন্ধু বিঃ সুকুলের কাছ থেকে নিয়ে পড়েছিলাম।
বিষ্ঠু সুকুলকে আমি রীতিমত ঈর্ষা করতাম এক কারণে, ঐ বইয়ের উৎসর্গ পৃষ্টায় তার নাম ছাপানো ছিল বলে। বিষ্ণুর ভাতের সময় বইটা তিনি তাকে উপহার দিয়েছিলেন। বিষ্ণুর বাবা গৌরীপ্রসাদ সুকুল চারুদার বাল্যবন্ধু ছিলেন। মার মুখে শুনেছিলাম, গৌরীকে একবেলা না দেখতে পেলে তিনি নাকি ছটফট করতেন।
বিষ্টুর জন্যও আমার সেইরকমটাই হতোবোধ করি মাঝে মাঝে। একদিন কেলাসে গিয়ে নিজের পাশেই তাকে না পেলে সেই ছটফটানিই হতো বুঝি। যেদিন সে অপর কোন ছেলের পাশটিতে বসত এমন খারাপ লাগত আমার যে কী বলব! পাঠ্য পুস্তকের আড়ালে গল্পের বই পড়তেও মন লাগত না তখন আমার।
বিষ্টুকে আমি বলতাম, তুই একজন বড় রাইটারের একখানা বই পেয়েছিস তো! আরেকখানাও পাবি তুই এক সময়। আমিই দেব তোকে। আমার একখানা বই উৎসর্গ করব তোর নামে। বড় হয়ে আমিও বই লিখব তো?
আরেকজন বড় রাইটার? চোখ বড় বড় করে সে তাকাত।
তা ঠিক বলতে পারি না, তবে রাইটার হব আমি ঠিকই। বড় হয়ে বই লিখব আমি। তুই দেখে নিস।
আমাকে নিয়েও একটা গল্প লিখিস তাহলে। কেমন, লিখবি তো? নিশ্চয়।
লিখব বইকি।
বই তো তারপর লিখেছি বিস্তর, কিন্তু একখানাও ওর নজরে পড়েছে কিনা কে জানে!
অনেকদিন আগে শুনেছিলাম, বিহার মুলুকের কোথায় যেন সে মাস্টারি করছে, তারপর আর কোনো খবর পাইনি তার, কোথায় যে সে থাকে। আমারও কোনো খবর রাখেনি সে তারপর। আমারও ঠিকঠিকানা তার জানা নেই বোধহয়।
আমার নিখরচায় জলযোগ বইটা আমার বাল্যকালের প্রাণের বন্ধু সেই বিষ্ণু প্ৰসাদ সুকুলের নামে উৎসগীত। আর অদ্বিতীয় পুরস্কার বইয়ের নাম-গল্পটাই তার কীর্তিকাহিনী নিয়ে। কিন্তু দুখানার একখানিও তার কাছে আমি পৌঁছাতে পারিনি। কোনো সুত্রে সে পেয়েছে বা পড়েছে কিনা জানি না।
ছেলেবেলার বন্ধুরা মেয়েদের ভালোবাসার মতই কোথায় যে হারিয়ে যায়! ভাবতে অবাক লাগে একেক সময়। মনে হয় যে, বুঝি একরকম ভালোই। তাদের নির্মেদ দেহ আর নির্মেঘ মন নিয়ে কৈশোরের নিবিড় মাধুর্যে মিশিয়ে নিটোল মুক্তোর মতই চিরদিনের স্মৃতির মধ্যে অক্ষয় থেকে যায় তারা–পরে যে কখনো আর ফিরে দেখা দেয় না তাতে জীবনের মতই সুমধুর থাকে, পলে পলে দন্ডে দন্ডে অবক্ষয়ে টাল খায় না, ক্ষয় পায় না।
নইলে পরে যদি তারা ভূরি ভূরি কামিয়ে আর বিপুল ভূঁড়িভার নিয়ে ফিরে এসে দেখা দিত আবার, তাহলে সংসারের ত্রিতাপদগ্ধ পোড়াকাঠের মত তাদের দেহমন আর পেনসনপ্রাপ্ত অখন্ড অবকাশ আমাদের জীবনে কী দুর্বিষহই না হতো যে!
