কিন্তু এ-যাত্রা কি কোনোদিন শেষ হবার?…পালাবদলে পা চালানো বইতো নয়।
.
১০.
বাবাকে একদিন আমি শুধিয়েছিলাম–এত এত বই যে বাবা! কেন তুমি এনেছিলে? এনে এমন করে সাজিয়ে রেখেছিলে কেন?
তুই আসবি বলে–এসে পড়বি বলেই! তোদের জন্যেই তো! বলেছিলেন তিনি।
কেমন করে তুমি টের পেলে বাবা যে, আমরা আসব? তখনও তো কেউ আসিনি আমরা? জানলে তুমি কি করে?
জানা যায়।
নির্লিপ্তের ন্যায় এক কথায় সেরে দিয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু এখন আমি জানি তাঁর কথাটা সত্যি কতখানি। সত্যিই জানা যায়–আর কারো না তাঁরই খেলা এসব। অমিয়-চরিত কথায়, যেমন, যিনি মেলাবার তিনিই মেলান, যথাসময়ে যথাযথ মিলিয়ে থাকেন। যা মিলবার আপনার থেকেই অঙ্ক আর কবিতার মতই কেমন করে, কি করে যেন মিলে যায়-অসম্ভব মিলন কাণ্ডের পাণ্ডা সেই তিনিই তো!
একদা আমার মতন অর্বাচীন এক বালকের সঙ্গে মেলার জন্যেই এই বইয়ের মেলা! এত মেলাই বই!
তিনি জানতেন, সারা জীবন নিজের লেখার মোট ফেলতে আর মজুরি কুড়োতেই আমার দিনরাত কাটবে, পড়ার ফুরসৎ আর হবে না কোনদিন, লেখাপড়া অদৃষ্টে নেই আমার–তাই কৈশোরকালের এই ফাঁকতালে তাক মাফিক এক-আধটু আমার পড়াশোনার এহেন ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন।
মোটামুটি যা কিছু জানবার শেখবার তখনই আমি শিখেছি ও জেনেছি। বাবার ঐসব বই পড়েই।
পণ্ডিত হবার পক্ষে এমন কিছু না হলেও একজন মেহনতি মজদুরের পক্ষে, আমার ধারণায়, এই যথেষ্ট। এর বেশি পড়াশোনার দরকার করে না।
মা অবশ্যি বলতেন, বই পড়ে কিছুই জানা যায় না, মন দিয়ে জানতে হয়। চোখে দেখে, পরখ করে তবেই আমরা টের পাই। এর ভেতর ওই মনটাই আসল। মন না দিলে কিছুই ঠিক দেখা যায় না বোঝা যায় না। এমন কি ওই বইও যদি মন দিয়ে না পড়ি তো ওর মর্ম মেলে না আদপেই।
তবে ছেলেরা যে এত পড়ে-পড়ে পড়ে মুখস্থ করে মনে রাখে, তার মানে কী মা? আমি শুধিয়েছি। কত বড় বড় লোককেও তো বই মুখে পড়ে থাকতে দেখেছি আমি দিনরাত। পড়ে যায়, খালি পড়ে যায়।
না বুঝে পড়ার সবটাই বোঝা হয়ে থাকে তাদের মাথায়, বলেছেন মা : কখনই মনের সঙ্গে মিলিয়ে যায় না। জীবনের সঙ্গে মেশে না। জীবনের সঙ্গে মেলে না। সে পড়া শুধু ভার হয়ে থাকে ঘাড়ের ওপর, কাজে লাগানো যায় না কখনো, খাটানো যায় না নিজের জীবনে। যে বিদ্যা জীবন হয়ে ওঠে না, জীবন্ত হয় না, সে আবার কী বিদ্যা রে?
মার কথার মানে সেদিন আমি বুঝিনি, এখনো যে তার অর্থ ঠিক ঠাওর হয় তা আমি বলতে পারি না। এখন আমার মাঝে মধ্যে দীর্ঘনিশ্বাস পড়ে, কেন আমি বিধিমত লেখাপড়া শিখিনি। আমার বন্ধুদের কত কত পড়াশোনা, বিশ্বসাহিত্যের কত অলিগলিতে যাতায়াত, কী না তাঁরা জানেন? কী না পড়েছেন–কোনো কিছুই তাঁদের অজানা নেই। আর এক কণাও তার পড়া হয়নি আমার। পৃথিবীর কত মহৎ সৃষ্টি আমার অগোচর অপঠিত থেকে গেল, আমার স্বদেশেরই কি সব জানতে পারলাম! মহাকাব্যের কখানা পড়েছি, পুরাতত্ত্বেরই বা কী! বাবার অত অত বলাতেও বাল্মীকি বেদব্যাসের রামায়ণ মহাভারত দুটো আমার পড়া হল না। বিদেশী মহৎ স্রষ্টাদের প্রায় সবাই তো অমনি অচেনা রয়ে গেলেন! বিশ্বের নিত্য নবীন সাহিত্য সৃষ্টির সাথেই বা যোগ রাখলাম কোথায়! সর্বাধুনিক রচনাই বা কী পরিচয় পেলাম। অভয়ঙ্করের বিদেশী সাহিত্যের সমালোচনা পড়েই আমার যা এই ভয়ঙ্কর বিদ্যে।
অবশ্যি উপেনদা (অগ্নিযুগের উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তখন বিজলীর সম্পাদন-প্রকাশনায় বিজড়িত ) একদিন সান্ত্বনাছলেই বুঝি আমায় বলেছিলেন, বাঁধাধরা লেখাপড়া তেমনটা তুই শিখিসনি যে তা এক পক্ষে ভালোই হয়েছে, শাপে বর হয়ে গেছে তোর। তোর ওপর অপর কারো প্রভাব পড়েনি, পড়তেই পায়নি একদম। তুই যা হবি আপনার থেকেই হবি, যা লিখবি নিজের মনের থেকেই লিখবি। কারো দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে নিজের মতন হওয়াই তো ভালো রে! তোর লেখায় আর কারো প্রভাব পড়বে না। অবশ্যি তোর রচনায় কোনো ঐতিহ্যসূত্র থাকবে না তা বটে, তাতে কি? তা না থাকলেও তুই-ই নিজেই একটা ইতিহাস হতে পারিস হয়ত বা!
বাবার পাঠাগারে নানা ধরনের গাদা গাদা বই থাকলেও রবীন্দ্রনাথের রচনা ছিল না একখানাও। রবীন্দ্রনাথের পরিচয় পেয়েছিলাম ইস্কুলে ভর্তি হবার পর। বছর কয়েক মার কাছে ঘরে বসে পড়ে বাংলা ইংরাজির কিছুটা রপ্ত করে সাহিত্য ব্যাকরণ গ্রামার ট্রানশ্লেশন একটুখানি দুরস্ত হয়ে পরীক্ষা দিয়ে ইস্কুলে গিয়ে ভর্তি হয়েছিলাম সটান ক্লাস সেভেন-এ। আর আমার ভাই এক ক্লাস নীচেয়। সেইকালে ইস্কুলের লাইব্রেরীতে রবীন্দ্রনাথের খবর মিলল। আর পেলাম বাংলার সার-এর কাছে। তখন আমার এমন বিস্ময় জাগল, বঙ্গদর্শন থেকে নব্য ভারত, তত্ত্ববোধনী পত্রিকা থেকে সমাজপতির সাহিত্য, ভারতবর্ষ, প্রবাসী, তা ছাড়া আরো কত পত্রপত্রিকা, এমন কি গৃহস্থ গম্ভীরা মানসী মর্মবাণী, স্বাস্থ্য সমাচার এত ছিল, কিন্তু বাবার ভাঁড়ারে কবিগুরুর বই ছিল না একখানাও!
রবি ঠাকুরের ওপর কেন জানি না, হাড়ে হাড়ে চটা ছিলেন বাবা।
কবি বলতে তার কাছে মাইকেল মধুসূদন, হেমচন্দ্র আর মবীন সেন! তাঁদের কবিতা তাঁর মুখস্থ–আওড়াতেন মুখে মুখে। সম্মুখ সমরে পড়ি বীর চূড়ামণির থেকে শুরু করে হুররে হুররে হুররে করি গর্জিল ইংরাজ! নবাবের সৈন্যগণ ভয়ে ভঙ্গ দিল রণ, পলাতে লাগিল সবে নাহি সহে ব্যাজ। আর, বাজ রে শিঙা বাজ ঘোর রবেসবাই স্বাধীন এ বিপুল ভবে/সবাই জাগ্রত মানের গৌরবে/ভারত শুধুই ঘুমায়ে রয়! আর সেই সাথে, হেমচন্দ্রের হায় হায়! ঐ যায় বাঙালীর মেয়ে!
