আরো নানান দিকে লেনদেন হতে লাগল। বাড়তে লাগল এলেম। পিতৃদেবের বিপুল পাঠাগারের দিকেও আমার হাত বাড়ালাম ক্রমশ।
সেখানে থরে থরে যত গ্রন্থাবলী সাজানো ছিল–বসুমতী আর হিতবাদী সংস্করণের। আর মরক্কো বাঁধাই হয়ে কত না মাসিকপত্র। প্রবাসী, ভারতবর্ষ, তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা, সাধনা ইত্যাদি থেকে শারীরতত্ত্বের স্বাস্থ্য সমাচার, এমনকি শিশুদের পত্রিকা সন্দেশ পর্যন্ত। তাছাড়াও কতো রকমের বই যে! ম্যাটসিনি গ্যারিবডির জীবন-চরিত থেকে রেনল্ডসের লন্ডন রহস্যের বঙ্গানুবাদ অব্দি কিছুই বাদ ছিল না।
ছিলো মাসিক সাহিত্য, ভারতী, নব্যভারত। মানসী ও মর্মবাণী, আরো কতো যে পুঁথিপত্তর কী জানি! তন্ত্রমন্ত্রের বই-ই কত না।
সব কিছুই আমার হাতের নাগালে এসে গেল। আর, নাগালে আসইে না গালে। সন্দেশের মতই গোগ্রাসে গিলতে লাগলাম-নির্বিচারে, কোনো বাদবিচার না করে। এদিকে বাবা-মার কাছ থেকে কোনো বাধা ছিল না।
আরব্য উপন্যাস পারস্য উপন্যাস ছাড়াও আরো কত কী উপ-অনুপ-অপ-কথা ছিল আমাদের বাড়িতে। কৃত্তিবাসী রামায়ণ, কাশীদাসী মহাভারতও ছিল, ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল, বিদ্যাসুন্দরের সঙ্গে পদাবলী সাহিত্যও। কালীপ্রসন্ন সিংহের বিরাটকায় মহাভারত, ড্রপ পেল্লায় আকারের সংস্কৃত অভিধান শব্দকল্পদ্রুম-কালক্রমে সবার মধ্যেই অল্পবিস্তর দম্ভফুট করেছিলাম–দাঁত বসাতে পারি আর নাই পারি।
সেই সঙ্গে বটতলা বাজারের যত রাজ্যের অপকথার বই। খুনীকে খুন থেকে শুরু করে হরিদাস আর হরিদাসীর গুপ্তকথা। আর কী চমৎকার সব পাঁচকড়ি দে-র গোয়েন্দা কাহিনী আর প্রিয়নাথ দারোগার দপ্তর।
বাবা কালী সিংহীর মহাভারত পড়তে বলতেন বার বার কিন্তু বারংবার প্রয়াসেও সেই বাড়াবাড়ির মধ্যে নাক গলাতে পারিনি। পড়লে বোধ হয় মানুষ হতাম। অথচ মার মুখে আরব্য রজনীর কুজ দর্জির গল্পটা শুনেই না, না বলতেই আরব্য উপন্যাসের আগাগোড়া পড়ে শেষ করেছি। আরব্য রজনীর থেকে বঙ্কিমের রাজসিংহ, রজনীতে ধীরে ধীরে হলেও এগিয়ে গিয়েছি একাদিক্রমে।
প্রথমে বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়েই পড়েছিলাম-বর্ণপরিচয় হতেই না–দেবী চৌধুরানী শুরু করে দিলাম। বঙ্কিমের ওই বইটির প্রথম, আমার মনে আছে বেশ।
তার কারণ আর কিছুই নয়। ঐ সন্দেশ।
বইটার প্রথম লাইনেই, পি-পি-প্রফুল্ল মুখপুড়ি বলে ডেকে নয়ান বউ না কে, তার সতীনের পোড়ারমুখে যখন মিষ্টি খুঁজে দিল, এমন মিঠে লাগল যে গল্পটা! বউয়ের পা টেপার ব্রজ-র সেই পদব্রজের অংশটাও মন্দ লাগেনি। বারবার ঐ পরিচ্ছেদ দুটো পড়া আমার সারা শৈশবেই। তারপর রাজসিংহ, দুর্গেশনন্দিনী, বিষবৃক্ষ পার হয়ে গেল, ন্দ্রশেখর, কৃষ্ণকান্তের উইল পাঠ করলাম, কমলাকান্তের দপ্তরও বাদ গেল না। বাবার নির্দেশে কৃষ্ণচ্চরিত্রও পড়ে ফেললাম, মন্দ লাগেনি। আনন্দমঠ পড়ে দস্তুর মতন আনন্দ পেয়েছি। তবে আমার সবচেয়ে মধুর লেগেছে কমলাকান্তের দপ্তর বাদে লোকরহস্য আর মুচিরাম গুড়। এমন মিঠে আর হয় না। প্রায় পাটালি গুড়ের মতই-হ্যাঁ।
আমি তো প্রথম ভাগ খতম করে দ্বিতীয় ভাগের শেষে বঙ্কিমবাবুর গ্রন্থাবলী নিয়ে পড়েছিলাম, আমার ভাই সত্য আবার আমার চাইতেও সরেস। সে অক্ষর পরিচয় সেরেই রমেশচন্দ্রের গ্রন্থাবলী নিয়ে পড়ল, মহারাষ্ট্র জীবনপ্রভাত থেকে রাজপুত জীবনসন্ধ্যা পর্যন্ত কেটে গেল তার দেখতে না দেখতেই। তারপরে আমরা দু ভাই পাল্লা দিয়ে বাবার পাঠাগার ফাঁক করতে লাগলাম।
লোকরহস্য থেকে লন্ডনরহস্য হয়ে দীনেন্দ্রকুমার রায়ের রহস্যলহরী অব্দি কোনো কিছুরই রহস্যভেদের বাকী রইল না আমার।
যখন আমাদের অক্ষরপরিচয় হয়নি, মা আমাদের সন্দেশের গল্প আর ছড়া পড়ে শোনাতেন। পুরানো সন্দেশের একটি ছড়ায় তিনি হেসে গড়ানে কতত বার যে।–ওগো রাঁধুনি, শোনো গো শোনন, তোমায় রান্না বলে দি শোনো। সুখলতা রাওয়ের লেখাই হবে বোধ করি ছড়াটা-আস্ত মুড়োটা ভাতে-তে ছেড়েছি, মন্দ হয় নি জেনো-রাঁধুনীর এই মজাদার জবাবটি পর্যন্ত তিনি হাসতে হাসতে গড়িয়ে যেতেন। ওটা আউড়ে তিনি যেমন মজা পেনে, শুনে তেমনি আমোদ লাগত আমাদেরও।
আর মজা পেতাম অঙ্গদরায়রারে। মা যখন সুর করে কৃত্তিবাসী রামায়ণের সাতকাণ্ডের সবচেয়ে চমৎকার ঐ ল্যাজের কাণ্ডটি পড়তেন কী ফুতিই যে হতো না।
রাবণের রাজ্যে গিয়ে বালীনন্দন অঙ্গদ, রাজসভায় রাজপুত্রের উপযুক্ত অভ্যর্থনা আসন না পেয়ে নিজের লেজের কুণ্ডলী করে পাকিয়ে তার ওপরে বসেছে, তার পরে সেই উচ্চাসনে বসে রাজ্যির রাবণের মুখোমুখি হয়ে কোটি যে সত্যিকার রাবণ তার ঠাওর পাচ্ছে না, আর রাবণের ছেলে ইন্দ্রজিতকে তার আসল বাপটকে চিনিয়ে দেবার জন্য সাধছে–
শোন্ রে ইন্দ্রজিতা,
এত বাপের মধ্যে রে তোর কোনটি আসল পিতা?…
বলতে পারিস কে যে?
মোর বাপ তোর কোন বাপেরে বেঁধেছিল লেজে?
তখন অঙ্গদের তেজস্বিতা আর বালির লেজস্বিতায় আমরা দু ভাই চমৎকৃত হয়ে যেতাম যুগপৎ।
রামায়ণ সন্দেশের ওই ছড়াছড়িতে আকৃষ্ট হয়েই আমরা অক্ষর পরিচয়ের প্রথম পাঠে প্রলুব্ধ হয়েছিলাম, আর প্রথম ভাগ দ্বিতীয় ভাগ কষ্টেসৃষ্টে পার হয়েই একেবারে বাংলা সাহিত্যের উপাখ্যান ভাগে এগিয়ে গেলাম-বটতলার থেকে শুরু করে বসুমতীর তাবৎ বইয়ের হরিহরছত্রে ভিড়ে বিদ্যাসাগরের বর্ণবোধ ক্রমে নানান বোধের আস্বাদ নিয়ে একদিন বিদ্যাসুন্দরের গভীরে গিয়ে পড়ল। সাগরযাত্রা শেষ হলো মহবোধির-সুন্দর বিদ্যার সাগরসঙ্গমে।
