অবশ্যি, তখনো হাইস্কুল হয়েছিল দেশ পাড়াগাঁয়। চাঁচোরের রানী সিদ্ধেশ্বরী ইনস্টিটিউশন ছিল কাছেপিঠেই। এবং ইনফ্যান্ট ক্লাসও নিশ্চয়ই ছিল সেখানে, কিন্তু রামনাথ পণ্ডিতের কাছে নামতার পাঠ না নিয়ে এক পা-ও সেখানে এগুনো যেত না। যুগপৎ গলায় আর চোখে ধারাপাত ঘটিয়ে, সমবেত কণ্ঠে শোরগোল করে গড় আউড়ে গড়াতে গড়াতে তবেই ছিল সেই ধারাবাহিক শিক্ষায়তনের পথে পা বাড়ানো।
প্রথম ভাগের হাতেখড়ি মার কাছে হলেও শিক্ষালাভের প্রথম ভাগ্য আমার রামনাথ পণ্ডিতের কাছেই। গ্রামের সেই পাঠশালার পড়ুয়া হয়েই সেকালের প্রায় সবার মতই আমারও পাঠ্যাবস্থার শুরু।
আর, পাঠশালায় যেতে এমন খারাপ লাগত আমার যে…
একটা যাওয়াই ছিল বটে সেটা। রাজোচিত সমারোহে যাওয়া। পালকি চেপে নয়, পালকি সেজে। পালকির মত দুলকি চালে হেলে দুলে হেইয়ো হেইয়ো করে হট্টগোলের মধ্যে পণ্ডিতমশায়ের আটচালায় আমার প্রবেশলাভ। বলতে গেলে প্রায় প্রত্যহই।
পাঠশালার সময়টা প্রায় প্রতিদিনই খুঁজে পাওয়া দায় ছিল আমাকে। এ ঘরে ও ঘরে, ছাদের ওপরে চিলেকোঠায় কি পায়খানায়, কোথাও আমায় খুঁজে পাওয়া যেত না। শেষটায় পাঠশালার সর্দার পোড়োরা এসে আশ্চর্য অনুসন্ধিৎসায় খাটের তলার থেকে ঠিক খুঁজে বার করতে আমাকে–তারপর সগৌরবে, আমি পায় পায় এগুতে চাইলেও নাছোড়বান্দা তারা আমায় পদস্থ হতে দিত না, অপদস্থ করে সবাই মিলে আমার চার হাত পা পাকড়ে চ্যাং দোলায় দুলিয়ে নিয়ে যেত। অসহায়ভাবে আমতা আমতা করতে করতে ঝুলে ঝুলে যেতে হতো আমায় নামতার ইস্কুলে।
সেই পঠদ্দশার কথা স্মরণে এলে পাঁঠার দশার কথাই মনে পড়ে আমার। মাঠের থেকে বাড়ি ফিরতে অনিচ্ছুক পাঠাকে গায়ের চ্যাংড়ারা যেমন করে চার পা ধরে দখিন হাওয়ার মতই দোদুল দোলায় দুলিয়ে নিয়ে যেত, ব্যা-ব্যা- করা সেই পাঠার মতই তেমনি হত পা ছুঁড়ে প্রাত্যহিক দোলযাত্রার মহোৎসবের মধ্য দিয়ে পাঠশালার পৈঠা পেরিয়ে একদা ইস্কুলের আলাদা ব্যাকরণে গিয়ে পড়লাম।
তবে ঐ সিদ্ধেশ্বরী ইস্কুলে সিদ্ধিলাভের পথে এগিয়ে যেতে কেবল পা ছোঁড়াই নয়, আমার হাত সাফাইও একটু ছিল। তারই সাফল্য আমার হাতে হাতে ফললো।
নামতা ওগড়াতে একদিন একটু গড়বড় করায় পণ্ডিতমশাই কষে কান মলে দিয়েছিলেন। আমিও দ্বিরুক্তি না করে, হাত বাড়িয়ে তক্ষুনি তাঁর কান মলে দিয়েছি। কানের ব্যথার চেয়েও অপমানে আমার বেশি লেগেছিল।
ছিপ্টিখানা নিয়ে আয় তো! হুকুম দিলেন তিনি একটি ছেলেকে।
ছিটিহস্তে পণ্ডিতমশায়ের সেই রুদ্রমূর্তি কদাচ আমি ভুলব না। এখন আমার দুঃস্বপ্নের মধ্যে কখনো কখনো সেই চেহারা ভেসে ওঠে। ছিপটি দিয়ে অকাতরে ছেলেদের পিঠের ছাল ছাড়াতে কোনোদিন আমি তাঁর কোনো কসুর দেখিনি, কিন্তু কেন জানি না, আমার পিঠকে তাঁর সামনে অনাবৃত পেয়েও পিটতে গিয়ে তিনি হাত গুটিয়ে নিলেন হঠাৎ।
না, মারব না আমি তোমায়। তোমার বাবাকে বলে মার খাওয়াবো। রাজবাড়ির ছেলে বলেই তুমি বেঁচে গেলে আজকে। নইলে তোমার পিঠের ছাল আমি ছাড়িয়ে নিতুম। তোমার বাবাও সেইরকম করতে বলে দিয়েছিলেন আমায়।
হ্যাঁ, বলেছিলেন বটে বাবা। পাঠশালায় ভর্তি করার সময় বলে দিয়েছিলেন, পণ্ডিতমশায়, আমার ছেলের মাংস আপনার, হাড় আমার। আর সব ছেলের মতই বিধিমত আপনি একে পড়াবেন। কোনো কার্পণ্য করবেন না।
না, কার্পণ্য তিনি করতেন না। ছেলেদের পিঠে ছিপটি প্রয়োগে তাঁর কিপটেপনা কখনো আমি দেখিনি, আগাপাশতলা পিটিয়ে রক্ত বার করে ছাড়তেন। পণ্ডিত হলে রামনাথ মাত্রই বুনো হয় কি না কে জানে, কিন্তু পণ্ডিতের মধ্যে বন্যতায় তিনি ছিলেন অনন্য।
তবুও আমার বেলায় তাঁর এই অন্যথার মূলে বোধ হয় আমাদের সেই পুরনো পোড় বাড়িটা। সেই ভাঙ্গা রাজবাড়িটাই বদাচরণের বদলে তাঁর এই বদান্যতার কারণ হয়েছিল, নইলে বাবার কথাই ছিল তাই, পণ্ডিতমশাই যা বলেছেন, আমার মাংস তাঁর আর হাড় আমার বাবার। মানে, বিদ্যালাভের খাতিরে মারের চোটে আমার দেহের চামড়া খানিকটা ছিঁড়ে গেলেও ক্ষতি নেই, মাংস যায় যাক্, নামমাত্র হাড় কখানা বজায় রেখে প্রাণে প্রাণে নিজের ছেলেকে ফিরে পেলেই তিনি খুশী।
শেলেট বই সেখানেই ফেলে দিয়ে হাড়ে হাড়ে শিক্ষা নিয়ে, কিংবা না নিয়েই, আমি ফিরলাম।
আর কখনো আমায় যেতে হয়নি সেই পাঠশালায়।
আমার ভাইকেও আর পা বাড়াতে হয়নি সে পথে।
সেদিনকার কুরুক্ষেত্রে আমার কর্ণবধের পর্ব পণ্ডিতমশায়ের কাছে শুনেও বা কিছু বলেননি আমায়। বাড়িতেও তুলকালাম কিছু হয়নি। মা বলেছিলেন, পাঠশালায় গিয়ে আর কাজ নেই ওদের। আমার কাছেই পড়বে ওরা। ভারী তো পড়ানো।
বাবাও সায় দিয়েছিলেন তাঁর কথায়-বেশ, তোর মার কাছেই পড়বি তোরা দু ভাই এবার থেকে বাড়িতেই তোদের ইস্কুল।
ভালোই হলো আমার। এতদিনের যেন অকূল জ্ঞানসমুদ্রের কিনারা পেলাম। পড়াশোনার ইস্কুল পেলাম বাড়িতেই।
জীবদ্দশার প্রথম ভাগটাই পঠদ্দশা। অবশ্য, যতদিন বাঁচি ততদিন শিখি, কখনো হাতী কখনো মশা হয়ে মানুষের দশ দশার মধ্যে শিক্ষণীয় দিকটা তো থাকেই। যেমন প্রথম ভাগেরই হাতে খড়ি হয়েছিল মার কাছেই–দ্বিতীয় ভাগ্যও খুলল আমার মার হাতে। অ আ ক খ-র অক্ষর পরিচয়ের মতন ফাস্ট বুকের বর্ণজ্ঞানও পেলাম মার কাছে। বি এ ডি ব্যাড, সি এ ডি ক্যাড, ডি এ ডি ড্যাড পেরিয়ে শনৈঃ শনৈঃ ওয়ান মরু আই মেট এ লেম ম্যান ইন এ লেন পর্যন্ত অবলীলায় উতরে গেলাম।
