বুঝতে পেরেছিলাম ভালোই, আমার ধারণায় সেই থেকেই প্রাতঃস্মরণীয় পঞ্চ প্রবরের ঐ কাজ বরণীয় হয়ে আমার মনের কোথায় গেঁথে গেছল যেন। উর্ব চ্যবন ইত্যাদির উর্বর ক্ষেত্রে পরের ফসল থেকে কুড়িয়ে-বাড়িয়ে নিজের কারবার ফলাও করতে লেগেছিলাম সেই থেকেই নিজের অবচেতনাতেই যদিও।
আমার এই প্রবণীয় পেশায় পরের উর্বর ক্ষেত্রে ফলাও ফসলের ঝরতি-পড়তিতে ভাগ। বসাবার এই আপ্লবৎ আদৌ আমার জন্মকোঠি-বিরুদ্ধ ছিল না।
সেটা বুঝতে পেরে মা তখনই বাধা দিয়েছিলেন আমায় : না, খবরদার না। উবৃত্তির পথে যাসনে। তোর মন যে দিকে টানবে সে দিকে যাবি, মাকে মনে রেখে প্রবৃত্তির পথে এগুবি তুই। যা তার পাবার, যা তার প্রার্থনীয়, সবই তার মিলে যাবে দেখিস।
বাবা প্রতিবাদ করেছিলেন মার কথার। বলেছিলেন, না, প্রবৃত্তি নয় নিবৃত্তি। বলে লম্বা এক শাস্ত্রবাক্যও আউড়ে ছিলেন তিনি-মাংস ভক্ষণে দোষ ন মদ্য/ ন মৈথুনে প্রবৃত্তিরে ডুকনাম নিবৃত্তে মহাফলম
মোদ্দা কথাটা বাবার এই, প্রবৃত্তির পথে সকলেই যায়, যাবেই, কিন্তু যে নাকি নিবৃত্ত হবে মহাফল তারই প্রাপ্য।
মার কথা আমি বাবার কথা-র ওপরে মানতাম, কিন্তু এখন দেখা গেল, তাঁর কথাও নেহাত মিছে নয়। বাবার কথাটাই অভাবিত ভাবে কেমন করে ফলে গেল যেন।
বেঙ্গল ইমিউনিটির পথে নিবৃত্ত হবার পরেই একদিন হঠাৎ সুধীরবাবুর মৌচাক কার্যালয়ে যেতেই তিনি কথাটা তুললেন–মৌচাকের জন্যে লিখুন না! অনেকদিন ধরেই ভাবছি বলব আপনাকে…ছোটখাট একটা গল্প লিখে আনুন!
টাকা দেবেন? বলে ফেলি হঠাৎ।
নিশ্চয়ই। সবাইকেই দিই। সব লেখার জন্যেই দিয়ে থাকি। গল্প কবিতা প্রবন্ধ সবের। তবে গল্পই দিন আপনি। গল্পেরই দরকার।
কতে দেবেন?
যা চাইবেন। তিন-চার পাতার মত লেখা, তার জন্য যা উপযুক্ত মনে করেন।
যদি পনের টাকা চাই?
নিশ্চয়। ইচ্ছে করলে নিতে পারেন এক্ষুনি।
তক্ষুনি তিনি দশ-পাঁচ টাকার দুখানা নোট আমার হাতে ধরে দিলেন। আগাম। ঘোড়ার আগেই লাগাম পেয়ে গেলাম।
পেতেই আমার কেমন হাসি পেল যেন-কেন যে! এতদিন ইয়া বড় বড় গল্প কবিতা প্রবন্ধ, এমন কি নাটক পর্যন্ত লিখেও তেমন কিছু পাইনি, আর এ যে গাছে না উঠতেই এক কাঁদি।
হাসব না কাঁদব? হাসিই পেল আমার।
আর সেই যে আমার হাসি পেল, সেই হাসিই বুঝি পেয়ে বসল আমার সব লেখা তারপর থেকেই।
বাবার প্রণোদিত নিবৃত্তির পথ ধরে মার প্ররোচিত আমার প্রবৃত্তির পথ খুঁজে পেলাম। দুটো পথ আমার জীবনে মিললো এসে এক জায়গায়। দরাজ হাসির রাজপথে।
এক ধারায় এসে মিলে গেল একই মোহনায়, সাগরসঙ্গমের মতই। সেদিন আমার সাগর থেকে ফেরা নয়, সাগরের দিকেই ফেরা-ফেরার হওয়ার দিন।
.
৭৫.
অদ্ভুত লোক ছিলেন মৌচাকের মক্ষিরাজ এই সুধীর সরকার। মধু আর মধুলুব্ধদের জন্যে তাঁর মৌ-ভান্ডার সর্বদা উন্মুক্ত থাকত। দরাজ হাতে নির্বিচারে তিনি বিলিয়ে দিতেন সবাইকে।
মহারাজ বিক্রমাদিত্যের মতন তারও ছিল নবরত্ন সভা। সেকালের সাহিত্য জগতের দিপালেরা তাঁকে ঘিরে মৌচাকের আসরে এসে জমত। কবি সত্যেন দত্ত, মণীন্দ্রলাল গঙ্গোপাধ্যায়, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, হেমেন্দ্রকুমার রায়, সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়, নরেন দেব, প্রভাত গাঙ্গুলি, কেদার চাটুজ্যে (ইনি জগন্নাথ পন্ডিতের ছন্মনামে অনেক চমৎকার গল্প লিখেছেন মৌচাকে ১, হিতেন বসু শিল্পী চারু রায় প্রভৃতি তো ছিলেনই, (সকলের নাম মনে আসছে না এখন) নবরত্নের পরেও তিনি নব নব রত্নদের নিয়ে এসেছেন। আমাদের কালে নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ, অন্নদাশঙ্কর, অচিন্ত্যকুমার, মোহলাল, প্রেমেন্দ্র মিত্র, ধীরেন ধর, খগেন মিত্র, কামাক্ষীপ্রসাদ, সুকুমার দে সরকার, মানিক বন্দ্যো, বিমল দত্ত, শৈলজানন্দ, বিভূতি বন্দ্যোকেও এনেছিলেন মৌচাকে, এমনকি রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, সুবোধ ঘোষকে পর্যন্ত টেনেছিলেন।
বিক্রমাদিত্যের চেয়েও পরাক্রমে তিনি বড় ছিলেন, পরকেও তিনি ক্রমে ক্রমে আপনার করে নিতে জানতেন। তাঁর মৌচাক-রাজ্যে রথী-মহারথীর থেকে আমার ন্যায় সামান্য পদাতিক পর্যন্ত এসে জুটেছে, আর সবার সাহায্যে শিশু সাহিত্য বড় হয়ে উঠেছে। বয়সে বেড়েছে না কেবল, দৃষ্টিভঙ্গী প্রকাশভঙ্গীও বদলে গেছে, রূপ বৈচিত্র্যে অপরূপ হয়েছে দিনের পর দিন। শিশু সাহিত্যের রাজ্য বিস্তারে মহারথদের নিয়ে নিজের সারথ্যে বার বার তিনি সীমান্ত পার হয়েছেন, চার ধারে ছড়িয়ে সীমানা ছাড়িয়ে গেছে কবেই, আজ আর তার সীমা পরিসীমা নেই।
সন্দেশের থেকে কোন্ দেশে আমরা এসে গেলাম! সন্দেশের অবশ্য জোড়া তুলনা হয় না, উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার রায় জন্মাবেন না আর, যোগীন সরকার, কুলদারঞ্জনের মতন কাউকে আর পাব না আমরা, দক্ষিণারঞ্জনের অপরূপ রূপকথার জগতও চিরদিনের মত হারিয়ে গেছে। বাঙালীর শৈশব থেকে হারায়নি যদিও, কোনোকালেই হারাবার নয়, কেননা প্রথম অক্ষর পরিচয়ের পর এঁদের বই আমাদের পড়তে হবেই, সাহিত্য রসাস্বাদনের গোড়াপত্তন ওসবের থেকেই কিন্তু বাংলার কিশোরদের কৌতূহলের স্বাদ এনে দিলেন হেমেন্দ্রকুমার–তাঁর অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী যখের ধন-এই সব প্রথম। মৌচাক আর সুধীর সরকার নইলে কি তা সম্ভব হত? সুধীরবাবুই তাঁর সমকালীন লেখকবন্ধুদের সাহায্যে শৈশবের রাজ্যে কৈশোর নিয়ে এসেছেন–শিশুসাহিত্যে নয়া জোয়ানির বান ডাকিয়েছেন! যেন যাদুকাঠির ছোঁয়ায় নিমেষের মধ্যে শিশুকে তারুণ্যে পৌঁছে দিয়েছেন–যেখানে দুনিয়ার দিগ্বিদিক তার সামনে খোলা, বিশ্বের বহুবিচিত্র বিস্ময় নিয়ে। হেমেন্দ্রকুমারের যখের ধন আর মণীন্দ্রলালের কায়াহীনের কাহিনীর লাটুর ঘূর্ণীতে শুরু হয়ে কল্লোলিনী সুরধুনীর ন্যায় বাঁক ঘুরে বহুৎ ঘুরপাক খেয়ে সুবোধ ঘোষের পুতুলের চিঠি পেরিয়ে, আজকের সত্যজিৎ আর প্রেমেন মিত্তিরের বিজ্ঞাননির্ভর রহস্য-কাহিনীর কিনারায় এসে সৌছানো–ভাবলে অবাক হতে হয় বই কি। দক্ষিণারঞ্জনের রূপকথার কল্পনোক থেকে এখনকার বস্তুনিষ্ঠ গল্পলোকে এই-পরমাশ্চর্য উত্তরণ!
