কয়েক দশকেই এই যুগান্তকর কান্ড–ধারণাই করা যায় না। এর গোড়ায় সুধীর সরকার। ধুরন্ধর লেখকরা এর জন্যে কলম ধরেছিলেন সে ঠিক, কিন্তু একালের যুগন্ধর ঐ সুধীরচন্দ্রই। তিনি না এলে তাঁরা আসতেন কিনা, অদ্ভুত এভাবে এই শিশু সাহিত্যে নামতেন কি না সন্দেহ আছে। তিনিই এদের–বড়দের এই বিখ্যাত লিখিয়েদের কিশোর সাহিত্য রচনায় নামিয়েছেন তাঁর মৌচাকে। আর বড় লেখকরা এসেছিলেন বলেই শিশুসাহিত্য বড় হল-বড় দরের হয়ে দাঁড়াল।
প্রতিভা স্বতঃস্ফূর্ত স্বতঃপ্রকাশ সত্যই। চন্দ্র সূর্য জ্যোতিষ্করা স্বপ্ৰকাশ, নিজের আলোতেই প্রকাশিত, সন্দেহ নেই। কিন্তু জ্যোতির্ময় সূর্যকেও আকাশের অপেক্ষা রাখতে হয়– আত্মপ্রকাশের জন্য। তাই আকাশের ভূমিকা সূর্যের চেয়ে বড়ো, আকাশ না থাকলে সূর্যরা ঠাঁই পায় কোথায়? তাদের প্রকাশ করে কে? লেখকের চেয়ে প্রকাশক অনেক বড়ো–এই কারণেই। আকাশ নহিলে তোমারে ধরিবে কে বা? লেখক শুধু নিজেকেই প্রকাশ করেন, প্রকাশক করেন অনেককে।
সুধীর সরকারের ছিল সেই আকাশী ভূমিকা। যে ভূমিকা কম নয়।
এমনকি, শরৎচন্দ্রের প্রথম প্রকাশক সুধীরবাবুই। তাঁর মননশীল প্রবন্ধগুচ্ছ নারীর মূল্য তিনিই বার করেন। তাঁর দুঃসাহসিক বই-পথের দাবী, (প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে রাজদ্রোহ প্রচারের দায়ে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত) কয়েক হাজার টাকা দিয়ে নিয়ে রেখেছিলেন কিন্তু পরে শরৎচন্দ্র সেটি উমাপ্রসাদবাবুকে ছাপতে দেবার জন্য চাইতেই, অমনিই তাঁকে ফিরিয়ে দেন তক্ষুনি–কিছু না নিয়েই। এই ঔদার্য তাঁর ছিল।
সব লেখকের বেলাতেই এটা দেখেছি। কোনো লেখক দরকারে পড়ে এসে চাইলেই তিনি অকৃপণ ভাবে দিনে, লেখকের লেখা দিয়েই যা পরিশোেধ হয়ে যাবার। কিন্তু লেখকেরও ঐ লেখা দেবার কথা মনে থাকত না, আর তিনিও চাইতে ভুলে যেতেন-না লেখা না টাকা।
নাট্যকার শচীন সেনগুপ্ত একখানা উপন্যাস লিখে বেকায়দায় পড়েছিলেন একবার। তাঁর বইয়ের কোনো প্রকাশক পাচ্ছিলেন না। নাট্যকারের উপন্যাসের প্রকাশক পাওয়া সেকালে মুশকিল ছিল। অথচ, তাঁর টাকার বিশেষ দরকার তখন। রাস্তায় দেখা হতে বললেন আমাকে, বইটা কাকে দেওয়া যায় বল তো হে? এক্ষুনি টাকা দিয়ে কে নিতে পারে আমার উপন্যাস?
কে আবার? ঐ সুধীর সরকার। আমি নির্দ্বিধায় জবাব দিয়েছি।
সুধীরবাবুর কাছে তাঁকে নিয়ে যেতে, শোনা মাত্রই পাণ্ডুলিপিটা ড্রয়ারের মধ্যে রেখে কয়েক শটাকা তাঁকে দিলেন তিনি তক্ষুনি-কোনো লেখাপড়া চুক্তিপত্রাদি না করেই। আবার কিছুদিন বাদে, সেই বইটি অপর কোনো প্রকাশককে দেবার জন্য শচীনদা এসে চাইতেই সেই ড্রয়ারের ভেতর থেকেই পান্ডুলিপিটা বার করে তাঁর হাতে ফিরিয়ে দিয়েছেন তৎক্ষণাৎ। বিনা বাক্যব্যয়ে–তাঁকে দেওয়া টাকাকড়ির নামগন্ধ না করেই।
লেখকদের প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে তিনি অকৃপণ হাতে দিয়ে গেছেন। বিনিময় প্রাপ্তির আশা না করে–ফিরে পাওয়ার দাবী না রেখেই এই আমিই কি তাঁকে ভুলিয়ে ভালিয়ে আমার সময়ে অসময়ে কম নিয়েছি তাঁর কাছ থেকে? কিন্তু তাঁকে ভোলাবার বুঝি কোনো দরকার ছিল না। নিজ গুণেই তিনি ভুলে যেতেন। দেয়ার পরেই দানের কথাটা তাঁর আর মনে থাকত না। দেওয়া আর ভুলে যাওয়া যেন তাঁর মজ্জাগত বদভ্যাস ছিল।
এমনি অমায়িক ছিলেন সুধীর সরকার–কেবল ব্যবহারেই নয়, টাকার দিক দিয়েও। টাকায় তাঁর কোনো মায়া ছিল না যেন। একবার বুদ্ধদেব মৌচাকের দরজায় ঝাঁটানোনা জঞ্জলের মধ্যে একটা একশ টাকার নোট দেখে কুড়িয়ে নিয়ে সুধীরবাবুকে দিতেও তাঁর কোনো বৈলক্ষণ্য দেখা যায়নি। তাই নাকি? পড়েছিল ওখানে? বলে নির্লিপ্তভাবে তুলে রেখেছিলেন ড্রয়ারের ভেতর। বুদ্ধদেব তাঁর এক বিখ্যাত কবিতায় ঘটনাটা অবিস্মরণীয় করে রেখেছেন।
পরের দুরবস্থায় মুক্তহস্ত হওয়া এটা বোধ করি সরকারদের স্বভাবসিদ্ধ। সার এন এন. থেকে সুধীরবাবু পর্যন্ত এই ধারাটা আমি লক্ষ্য করেছি। এমনকি তার পরে…তারও পরে…তার পরেও আরো।
এমন কি পলিটিক্যালি বুনো, (ঝানু লোক বলতে পারি না তাঁকে) আমাদের হেমন্তদা, হেমন্তকুমার সরকার পর্যন্ত, নাট্যনিকেতনের ফায়ার ইনস্যুরেন্স-এর কমিশনের বাবদে তাঁর পাওনার পুরো টাকাটাই অম্লানবদনে আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। টাকাটা নেহাত কম ছিল না। এক হাজারেরও ওপর বটেই।
ঘোষ বংশ বড় বংশ, বোস বংশ দাতা-প্রবাদে কয়। কথাটা মিথ্যে নয়। শরৎ বোস, সুভাষ বোস থেকে যতীন বোস পর্যন্ত তার পরিচয় আমার এই সামান্য জীবনেই প্রচুর বোসদের সৌজন্যেই আমি দাঁড়িয়েছি বলতে বাধা নেই। কিন্তু তাহলেও বলব, বদান্যতায় সরকার বংশও তার অন্যথা নয়।
সুধীরবাবু জীবদ্দশায় কারণে অকারণে আমায় অনেক তত দিয়েছিলেন, এমনকি, দেহরক্ষার পরেও দেবার তাঁর কোনো কসুর হয়নি। তাঁর স্মারক বইয়ের জন্য আমি একটা কবিত লিখেছিলাম, উদ্ধৃত করছি এখানে
রূপকাহিনীর রূপপার কাঠির ছোঁয়া ঘুম ঘুম দেশটাকে…ছিলো যতো শিশু স্বপ্নমায়ায় কল্পপুরীর মই ধরে…/শিশুসাহিত্য হতবিহ্বল শৈশবসুখে সেই অকে/জাগিয়েছ তুমি/ডেকেছ যে তুমি/নিয়ে এসেছ যে ঐ ভোরে/সেই সাথে যততা শিশু সাহিত্য-মহারথীদের হাত ধরে/সুধীরচন্দ্র! তোমার মিষ্টি মৌচাকে। শিশুসাহিত্য এবং শিশু রাতারাতি বুঝি সেই ডাকে/শৈশবমায়া পেরিয়ে সহসা পা দিয়েছে এসে কৈশোরে…। সাহিত্য রাজপথেই এসেছে সেইদিকে হৈ হৈ করে! সুধীরচন্দ্র! তোমার মিষ্টি মৌচাকে।
