ভালোই তো বোধ হচ্ছে। তা, তুমি করছে না কেন? অফারটা তত তোমাকেই দিয়েছে। এমন কিছু ভারী কাজ নয়, বাধা কিসের?
মনের বাধা। মন সায় দিচ্ছে না। তবে এমন কাজটা ফসকে যাক, আমি চাইনে। তুমি করলে খুশি হব। পয়লা তারিখে যেতে হবে। কাঁটায় কাঁটায় দশটায় তোমাকে নিয়ে যাব আমি। তুমি রাজী হলে এর ভেতরে সব ঠিকঠাক করে রাখব আমি বলেকয়ে।
কিন্তু তুমি করছে না কেন? তোমার অসুবিধেটা কী হচ্ছে?
মনের সায় নেই। কোনো ধরাবাঁধার মধ্যে আমার মন যেতে চায় না, সময় বাধা রেখে, স্বাধীনতা খুইয়ে টাকা কামানো আমার কর্ম না।
সেভাবে দেখলে, কেবল দুঃখ পাওয়া ছাড়া আর কিছুতেই কারো স্বাধীনতা নেই কোথাও! সবাইইে সময় বাঁধা রাখতে হয়। বাধ্য থাকতে হয় এক সময়—-মনিবের কাছে, পরিবারের কাছে, কারো না কারো কাছে। এড়াবার জো নেই, জানো?
সংসারের ভেতরে থাকলে নেই বটে, কিন্তু যে তার বাইরে থাকে, থাকতে চায়? সত্যি বলতে, জানো দশটা পাঁচটা অফিসের চেয়ারে টান হয়ে বসে থাকা কাজ থাক না থাক, একটানা ঐ এক দশায়, সে-অধ্যাবসায় আমার নেই। টেবিলের সামনে বসলেই আমার পিঠটান দিতে ইচ্ছে করে।
অদ্ভুত তো!
অত কী! সেটাই স্বাভাবিক। শৃঙ্খলাবোধ বাল্যকাল থেকে শিখতে হয়-রেগুলার ইস্কুল কলেজ করে। পড়াশুনা তো নিজের বিছানায় শুয়েও হতে পারে কিন্তু ঐ রেগুলারিটি আর ডিসিপ্লিনের শিক্ষা সেই ইস্কুল কলেজেই হয়ে থাকে। সেখানে সে পাঠ যে নেয়নি এগারোটা-চারটে ইস্কুল করেনি, সে দশটা পাঁচটা অফিস করতে কখনই পারবে না, কিছুতেই না। সর্বদাই আইঢাই করবে। পালাই পালাই করবে সব সময়। ইস্কুলের বেঞ্চে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে মন উড়ু উড়ু করত যেমন।
কিন্তু কাজ তো সবাইকে করতেই হয়। কাজ না করে কি কারো চলে?
তা তো চলে না জানি। আমিও কাজ করতে চাই–মনের কাজ হয় যদি।
সে আবার কোথায় মেলে হে? কাজের মত কাজ হলেই হয়।
আমার হয় না ভাই। মনের মতন কাজ হওয়া চাই আমার। হয়েওছিল একবার। এই লেখালেখিরই কাজ। তবে নিজের বিছানায় শুয়ে বসে গড়িয়ে আরামে অবকাশের মধ্যে করা যেত। আত্মশক্তির সম্পাদকতা করতাম যখন–ডবল ক্রাউনের এক ফর্মা ঘরে বসে লিখে দিলেই চুকে যেত–তারপর মাস গেলেই একশটাকা। বেশ কাজ ছিল সেটা, কিন্তু টিকল না শেষ পর্যন্ত। মনের মতন কিছুই কখনই বেশি দিন থাকে না, আমি দেখছি। মনের মতন মানুষ যারা তারাও চলে যায় শেষটায়।
মনের মতন না হল তো কী! টাকার জন্যই তো কাজ করা। আর, তোমারও যখন টাকার দরকার–এ কাজটা তুমি করবে না কেন?…সব কাজই ইচ্ছে করলে করা যায়, মানিয়ে নিতে হয় কেবল।
তোমার কথাটা মানি। আর মানি ফ্যালনা নয়, তাও মানতে হয়, সে কথাও বটে। কিন্তু আমার ঘটে যদি ক্ষমতা না থাকে, তাহলে তুমিই তার কী করবে, আমিই বা কী করব! কারো নিয়তি কেউ খড়াতে পারে?
পয়লা তারিখের আগের দিন ক্যাপটেন দত্তকে গিয়ে জানালাম-আপনার কাজটার জন্য আমার চেয়েও ভালোলোক ঠিক করেছি। প্রেমেন মিত্তির। নাম শুনেছেন নিশ্চয়? আমার চেয়ে ঢের ঢের বড় লেখক–এমনকি, একালের আমাদের সবার অগ্রগণ্য বলেই তাঁকে আমার মনে হয়। তাঁকেই আমি নিয়ে আসব কালকে।
তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাজী হয়ে গেলেন। প্রেমেন পরদিন থেকেই লেগে গেল কাজটায়।
আত্মশক্তি কাগজটা সে সময় নবশক্তির রূপ ধরে ক্যাপটেন দত্তের তত্ত্বাবধানে ছিল, তিতাস একটি নদীর নাম-এর বিখ্যাত লেখক অদ্বৈত মল্লবর্মণের সম্পাদনায়। প্রতি সপ্তাহে কাগজের শেষের দিকে প্রেমেনের এক পাতা করে লেখা থাকত-বেংগল ইমিউনিটির তৈরি ওষুধগুলির প্রচার বিজ্ঞাপনী হয়ে। একাধারে বৈজ্ঞানিক আর বৈজ্ঞাপনিক কলাসম্মত প্রচারনার সেই রম্যরচনাগুলি–তার সংক্ষিপ্তসার কুড়িয়ে বাড়িয়ে বার করতে পারলে একটা আদর্শ স্বাস্থ্যশিক্ষার বই হতে পারত, আমার ধারণা। প্রেমেনের এখনকার যতো বিজ্ঞাননির্ভর গল্পকাহিনীর গোড়ার কথা বলে আমার মনে হয়।
মনের মত ঠিক না হলেও, কাজের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। কাজটা না করলেও প্রেমেনের এই কথাটা আমি মেনেছিলাম।
মনের মতন কাজের আশায় যে বসে থাকে, তার তেমন কিছু কোনদিনই হয় না।
মনের মত কাজ নয়, কাজের মতন মন করতে হয়। যারা তা পারে, যাদের তা হয়, তারাই কাজের লোক হয়। সেই কেজো লোকরাই কালে কৃতী, স্বীয় কৃতিত্বে স্বকীয় কীর্তি রেখে যায়। তারাই কমবীর; আর সবাই তাঁদের মতন না হয়ে আমোহ দাশ-এর বদলে আলাভোলা হয়ে বাউন্ডুলে জীবন কাটায়। উঞ্ছবৃত্তির জীবদ্দশায় দিন কাটে তাদের।
বাবা বলতেন, উঞ্ছবৃত্তি কিছু খারাপ নয়। একদা ব্রাহ্মণদের-যারা নাকি আদর্শ ব্রাহ্মণ, তাদের কাজ ছিল তাই করা। কারো দাস্যবৃত্তি না, বৈশ্য বৃত্তি নয়, ক্ষাত্রবৃত্তি তো নয়ই–ঐ উঞ্ছবৃত্তি।
মা বলতেন, উঞ্ছবৃত্তি আর ভিক্ষাবৃত্তি এক। দুটোই দৈন্যদশার।
মোটেই তা নয় বাবা বলতেন আমায়, আমরা যাদের বংশধর-উর্ব সবন ভার্গব জামদগ্ন্য আগবৎ-এই পঞ্চ প্রবর আমাদের পূর্বপুরুষ-ঐ উবৃত্তিই ছিল তাঁদের কাজ। শাস্ত্রচর্চা, ধ্যান-ধারণা এসব নিয়েই তাঁরা থাকতেন, কিন্তু জীবিকা নির্বাহ হত তাঁদের ঐ উঞ্ছবৃত্তিতেই। উঞ্ছবৃত্তি কাকে বলে জানিস? কৃষকরা মাঠের থেকে তাদের ফসল কেটে বাড়ি নিয়ে যাবার কালে তাদের বোঝার থেকে যে সব শস্যশা মাটিতে পড়ত, সেই সব কুড়িয়ে এনে সেদ্ধ করে খেতেন তাঁরা। বাকী সময়টা কাটাতেন ব্রহ্মচিন্তায়। বুঝেছিস? :
