পারবে তো?
খুব পারব। এমন কিছু শক্ত কাজ না। বলেন তো কোনো মাসিকপত্রে ছাপাবার ব্যবস্থাও করতে পারি।
কোন্ কাগজে? প্রবাসী, ভারতবর্ষে?
আমি ভেবে দেখি। প্রবাসী কার্যালয়ে এগুতেই আমি সাহস করব না। সেখানে গুরুগম্ভীর চারুদা বিরাজিত। আর ভারতবর্ষে আমি পাত্তাই পাব না বলতে কি! কেননা জলধরবাবুর কাছে প্রস্তাবটা পাড়ব কি, সেটা তাঁর কানে তোলাই এক শক্ত ব্যাপার। আমার কোনো কথাই তাঁর কাছে খাটবে না, তিনি কানে খাটো।
যদি বিচিত্রায় ছাপানো যায়? আমাদের উপেনদার কাগজ। উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। ভালো হয় তাহলে। বিচিত্রা বেশ কাগজ। আমি দেখেছি। তাতে হিন্দুস্থানের বিজ্ঞাপন বেরয়, ভেতরের পৃষ্ঠায়। বিজ্ঞাপনটা আমি ভেতরের পাতার থেকে কভারের চতুর্থ পৃষ্ঠায় আনার ব্যবস্থা করব–অনেক বেশি চার্জ দিয়ে।
তাহলে তো ভালোই হয়। উপেনদাকে বলব সেকথা।
বলতে পারো। লেখাটা ঠিক রবীন্দ্রনাথের স্টাইলে হওয়া চাই, সেই ভাষায়, বুঝেছ? পড়ে যেন লোকে মনে করে লেখাটা আমায় স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ লিখে দিয়েছেন।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথ আপনার নামে লিখেছেন একথা কি কেউ বিশ্বাস করবে মনে করেন?
না করুক। আমি যে আসলে লিখতে পারি, একথাই কি কেউ বিশ্বাস করবে? তাহলেও কতক কতক লোকের ঐ সন্দেহ জাগতে পারে তো! রবীন্দ্রনাথ টাকার জন্য লিখবেন তা কেউ ভাবতে পারবে না, কিন্তু তিনি আমায় স্নেহ করে লিখে দিয়েছেন এটাও তত ভাবতে : পারে কেউ কেউ। ঐ বেনিফিট অব ডাউট-টাই আমার লাভ।
বুঝেছি। আপনার বিতর্কিত অর্থনীতির ব্যাপারে কবিগুরুর সমর্থনীতির সায় আছে এটাই আপনি পরোক্ষে জানাতে চান সবাইকে?
প্রায়। সেটা বোধহয় মন্দ হবে না, কী বলো?—
আমি চুপ করে ভাবি। আমার লেখা কতদূর অর্থনীতিসম্মত হবে তা নিয়ে নয়, কতটা সাহিত্যনীতিসঙ্গত তাই নিয়ে। তারপরে সবদিক খতিয়ে আমার মত এক অদ্যভ্য ধনুগুণের পক্ষে নৈতিক মানের উচ্চ নিরিখ আঁকড়ে থাকা কতটা গুণের হবে, তার ঠাহর না পেয়ে ভাবি যে, এই অর্থনীতির বিতর্ক আমার দ্ব্যর্থনীতির স্টাইলে পড়লে বিষয়টা হয়ত জগাখিচুড়ির মতন ব্যর্থ হয়ে সব দিক বজায় থাকবে শেষ পর্যন্ত।
আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে তিনি শুধান–কেন, রবিবাবুর ধরনে লেখাটা কি তোমার পক্ষে খুব শক্ত হবে?
না, শক্ত কিসের। ছোটবেলার থেকে রবীন্দ্রনাথ পড়ছি আমরা, হজম করছি। আর, তাঁর লেখা পড়ার বিপদ কী জানেন? অজান্তে প্রায় তাঁর মতই হয়ে যেতে হয়। রবীন্দ্রনাথকে যে যতটা হজম করে, বুঝেছেন, রবীন্দ্রনাথও তাঁকে ততটাই হজম করে থামে। রবীন্দ্রনাথ আমাদের অস্থিমজ্জায়, তাঁকে হাতের কজ্জায় নিয়ে আসা শক্তটা কী! তাঁর স্টাইল কাটিয়ে লিখতে পারাটাই কঠিন ব্যাপার। কবিতা লেখায় অন্তত।
বেশ। লিখে এনো তাহলে।…আমাদের পাবলিসিটির যা কিছু কাজ সাবিত্রীবাবুই করেন, সেখানে তো কোনো ভ্যাকান্সি নেই। তুমি বরং মাঝে মাঝে আমার এই প্রবন্ধ-ট্রবন্ধ লিখে ছাপিয়োনা হয়, দুচারশো টাকা পেয়ে যাবে সঙ্গে সঙ্গে।
সেই ভালো বলে আমি হাঁপ ছেড়ে চলে এলাম। চাকরির খর্পরে পড়তে হলে না দেখে বেঁচে গেলাম যেন।
আমার সেই একমাত্র অর্থনীতিমূলক প্রবন্ধ নলিনীরঞ্জন সরকারের নামে যথাসময়ে বিচিত্রায় বেরিয়েছিল, তাতে অর্থনীতির কতদূর শাস্তি হয়েছিল জানিনে, কিন্তু মূলক যে বেশ হয়েছিল তাতে সন্দেহ নাস্তি।
সেই প্রথম আর সেই শেষ। তারপরে অর্থনীতির কোনো মূলোৎপাটন করতে হয়নি অনায়…তাঁর কাছ থেকেও কোনো ডাক আসেনি আর, আমিও নিজের থেকে গরজ করে যাইনি তাঁর কাছে কখনো আবার। স্বরাজ্যদলের এই ভদ্রলোকটিকে কেন জানি না, আমার ভাল লাগত না কেমন যেন। তাঁর সম্পর্কে বিশেষ উৎসাহ বোধ করতাম না। কেমন যেন বৈষয়িক মানুষ বলে বোধ হোতো।
অবশ্যি, তার পরেও এই ধরনের প্রচারমূলক লেখা আরেকবার লিখতে হয়েছে,–ঘিয়ের কারবার নিয়ে লিখেছিলাম সেটা, শ্রীঘূতের বিষয়ে। সেটা আমার নামেই প্ৰকাশলাভ করেছিল–ওই বিচিত্রাতেই। তার জন্য টাকা পেয়েছিলাম মোটারকম অশোক রক্ষিত মশায়ের কাছ থেকে।
বিধানবাবুর কথাটা রাখতে তারপর ক্যাপটেন দত্তর কাছেও গেলাম একদিন।
চিঠিটা পড়ে তিনি বললেন, বেশ। আমাদের পাবলিসিটি অফিসার কাজে ইস্তফা দিয়ে চলে গেছেন দিনকতক আগে। সেই পদেই আপনি বহাল হবেন। ডাঃ রায় যখন রেকমেন্ড করে পাঠিয়েছেন, তার ওপরে আর কথা নেই। আমাদের পে-স্কেল ভালোই। পয়লা তারিখে আসবেন আপনি, আপনার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার রেডি থাকবে।
কখন আসব?
অফিসটাইমে। কাঁটায় কাঁটায় দশটায়। দশটা পাঁচটা কাজ, তার বেশি নয়। মাঝখানে টিফিন আছে।…এর আগে কোনো আপিসে কাজ করেছেন? আর কোনো প্রচার দপ্তরে?
কোথাও না। এই প্রথম। তবে করতে করতে হয়ে যাবে।
তা হবে। বিশেষ আপনি লেখক যখন, এই লেখালেখিরই কাজ তো! তবে একটা কথা, লেখকরা একটু ঢিলেঢালা টাইপের হয়, আপিসে কাজ করতে গেলে তা চলবে না। আপিসের একটা রীতিনীতি নিয়ম-শৃঙ্খলা রয়েছে…বুঝেছেন? সময়ানুবর্তিতা, শৃঙ্খলাবোধ এসব দরকার।
জানি, বলে বেরিয়ে আসি। তার পরে সোজা প্রেমেনের কাছে চলে যাই। চাকরির কশ্যটাও বলি গিয়ে।
বেশ ভালো কাজ, মোটা মাইনের পাবলিসিটি অফিসারের কাজ। করো না তুমি। তাকে সাধি।
