তা হলে, এই লেখার লাইনেরই অন্য কোনো কাজ নাও। সহকারী সম্পাদক-টম্পাদক হতে পারো না? প্রুফ দেখার কাজ জানো? প্রবাসীর সম্পাদক রামানন্দবাবুকে আমি বলে দিতে পারি…
সেখানে আমার এক কাজিন কাজ করেন। চারুদা। চারু বন্দ্যোপাধ্যায়।
চিনি তাঁকে। আমাদের ব্রাহ্ম সমাজেরই গণ্যমান্য একজন। তা হলে তুমিই গিয়ে তাঁকে ধরো না কেন? সহজেই তো ধরতে পারো।
না চারুদার কাছে যেতে আমার ভয় করে। কী দারুণ গম্ভীর যে…
তা হলে কোনো জায়গায় প্রচার-সচিবের কাজ নাও না হয়। পাবলিসিটি অফিসার বা তার সহকারীর কাজ–পারবে না করতে? তোমার এই লেখাটেখার লাইনেই তো। বিজ্ঞাপন ইত্যাদি লেখার কাজ হবে বোধ হয়। পারবে না?
পারতে পারি। চেষ্টা করে দেখতে হয়।
বেশ, আমি চিঠি লিখে দিচ্ছি-ক্যাপটেন দত্তকে। বেঙ্গল ইমিউনিটির ক্যাপটেন নরেন দত্ত। এই পাশেই তো তাঁদের আপিস। আর, হিন্দুস্থানের নলিনী সরকারকেও লিখছি। দুজনের কাছেই যাও–দ্যাখো গিয়ে কী হয়। লেগে যাবে আমার বিশ্বাস। ফোন করেও পরে বলব আমি তাঁদের।
সেদিন কোনো অর্থসাহায্য না করে দুখানি শুষ্ক পত্র দিয়েই তিনি আমায় বিদায় করলেন।
বাসায় ফিরে আমার মুখ শুকনো হলো আরো। দরজায় তালা লাগিয়ে গেছলাম, তবে চাবিটা পকেটে নেই। হারিয়েছে কখন।
কী সর্বনাশ! অনভ্যাসের তিলক, কপাল চড়চড় করে। অনভ্যাসীর লক তার চাবিকাঠি হারায়।
সেদিনকার সেই ঘরোয়া উপদ্রবের পরেই দরজায় তালা মেরেছিলাম। কোনো চোর ছ্যাঁচোরের পরোয়ায় নয়। সেই ধূপকাঠিওয়ালা যে শাসিয়ে গেছে আমায়, তার থোলাবরদার কাকে যেন পাঠিয়ে দেবে আমার ঘরদোর সব সাফ করার জন্য। সেই ভয়েই আমার এই তালা দেওয়া।
দরজায় তালা লাগাতে গিয়ে আজ ঘরটাকেই তালাক দিতে হল দেখছি।
ঘরের জঞ্জাল গেলে আমার ঘরের আর থাকবে কী! এইসব জঞ্জালের মধ্যেই তো আমার মনের মাধুরী মিশায়ে করেছি যা আমি রচনা…সেইসব।
জীবনের জঞ্জাল সব মিটে গেলে তার আওতায় যত কাঁকড়াবিছে, নেংটি ইঁদুর জড়ো বলেই তো এই ঘরে অন্য কারো আসার উৎসাহ হয় না। নিশ্চন্ত নির্ধান্দায় একলাটি থাকতে পাই–খেয়ে না খেয়ে স্বচ্ছন্দ আরামেই।
এক একটি সুন্দর মেয়েও যেমন দেখা যায়, দাঁত মাজতে চায় না–তেমনি আমার ঘরের এই আবর্জনা আমাকে সব সময় রক্ষা করে, বাঁচিয়ে চলে।
আমার জানা এক অম্লান কিশোরীকে জানি, অবাঞ্ছিত আক্রমণের দায় এড়াতে কখনই সে নিজের দাঁত মাজতো না। শুধালে বলতো, তোমাদের জ্বালাতেই, আবার কেন?
আমি বলেছিলাম, দাঁত মাজ তুই। আমি তোর ত্রিসীমানায় আসব না, কথা দিচ্ছি, তোকে চুমু দিতে হবে না। দাঁত মাজলে ঝকঝকে দাঁতে তোকে আরো ঢের ভালো দেখাবে। দূর থেকেই খুশি থাকব না-হয়।
শুধু তুমিই নাকি গো? দাদার আর বন্ধুরা নেই? বলেছিল সে।
এইভাবে হাতে হাতে নিজেকে বাঁচিয়ে, অপরকে সামান্য সুখদানে কার্পণ্য করে বিয়ের আগে দাঁত ফ্রেম্প করতে গিয়ে এমন দুঃখ পেয়েছিল বেচারা! ভাবলে দুঃখ হয়।
দাঁতকুঠির চেয়ারে বসে অঝোর ধারায় ভেসে যাচ্ছিল সে।
আমার এই অমার্জিত ঘর সেই রূপসী কিশোরীকেই মনে করিয়ে দেয়। তার কোনো ছবি আমার ঘরে নেই, আমার এই ঘরটাই যেন তার প্রতিচ্ছবি।
.
৭৪.
বিধানবাবুর নির্দেশমত প্রথম আমি নলিনী সরকারের কাছে গেলাম।
হিন্দুস্থান ইনস্যুরেন্স কোম্পানির মুখ্য অফিস ছিল এখনকার সুরেন বাঁড়ুজ্যে স্ট্রীটে, রাস্তাটার তখন অন্য কী এক নাম ছিল যেন। এখনকার এলিট সিনেমার মুখোমুখি, আমিনিয়া হোটেলের পাশাপাশি বাড়িটা।
রবিবারে গেছি, সেদিন তাঁকে অবকাশের মধ্যে পাবার আশায়। সকালের দিকটায়। লিফটম্যানকে বলতে সে আমায় সোজা তিনতলায় নিয়ে গেল। একটা ঘরে ডিভানে শুয়ে তিনি বিশ্রাম করছিলেন, নার্স-জাতীয় একটি মেয়ে ফলমূল কেটে ছাড়িয়ে প্লেটে সাজিয়ে রাখছিল তাঁর সামনে।
খেতে খেতেই তিনি চোখ তুলে তাকালেন, তোমাকে আমি দাশমশায়ের বাড়িতে দেখেছি না?
আমি ঘাড় নেড়ে বিধানবাবুর চিঠিটা তাঁর হাতে দিলাম, চোখ বুলিয়ে তিনি বললেন ফোনেও তিনি বলেছেন আমাকে। কিন্তু আমাদের তো পাবলিসিটি অফিসার রয়েছে। ভালো লোকই আছেন। সাবিত্রীপ্রসন্ন চ্যাটার্জি। বেশ নামকরা লেখক।
কবি সাবিত্রীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়। জানি আমি তাঁকে।…আমাদের সাবিত্রীদা।
তুমি কেমন লেখো আমি জানি না। তোমার লেখাটেখা কিছু পড়িনি। প্রবন্ধ লিখতে পারো?
পারব।
পারতে পারো। সুভাষের সাপ্তাহিকপত্রটা তুমি সম্পাদনা করতে শুনেছি। অর্থনীতি বিষয়ক প্রবন্ধ লিখতে হবে। অর্থনীতির জানো কিছু?
আমি কোনো জবাব দিতে পারি না।
পাউণ্ডের সঙ্গে টাকার বিনিময় হার নিয়ে দারুণ বিতর্ক চলছে এখন তা জানো?
খবরের কাগজে দেখেছি বটে–কিন্তু একটু কিন্তু কিন্তু করে বলি-ওসব কিন্তু আমার মগজে ঢোকে না।
সমস্ত জিনিসটা তোমাকে আমি বুঝিয়ে দেব। পয়েন্টগুলোও বাতলে দেব। তাই নিয়ে তুমি একটা প্রবন্ধ লিখে আনবে। পারবে না?
আপনি পয়েন্টগুলো বলে দিন।
জলের মত সরল করে জিনিসটা তিনি বুঝিয়ে দিলেন আমায়। কোন্ কোন্ পয়েন্টে জোর দিয়ে লিখতে হবে, তাও।
তাঁর কথার ধাঁচে গোড়ায় আমার ধারণা হয়েছিল যে, তাঁর অর্থনীতিবিষয়ক একটা রচনার ভাষাটাষা শুধরে বানান-টানানগুলো ঠিকঠাক করে দিতে হবে আমায়, এখন আঁচ পেলাম এতক্ষণে যে না, তা নয়, বানানের দায় নয় কেবল লেখাটা বানাতেও হবে আমাকেই।
