পুনশ্চ, ঘর জোড়া এত সব জঞ্জাল জুটিয়েছ কেন? এই এতো এতো কাগজপত্তর বইপত্তর–লেখাপত্তরজমা করে ঘর নোঙরা করা কেবল? কী হবে এসবে? পড়ে-উড়ে কিসু হয় না। লিখেটিখেও নয়। আমি এককালে লেখক হতে চেয়েছিলাম, সকলেই চায়, গোঁফ গজাবার সাথে সাথেই কবিতা গজায় সবাইকার, তারপর গল্প, তারপর উপন্যাস, তারপর নাটক-ফাটক যাত্রাভিনয়ের পালা আরো কত কী! সে সখ মিটে গেছে আমার। এখন এই ধূপকাঠি বেচি। তোমার সঙ্গে দেখা হল না। তবে যদি তুমি পথে আসো, আমার পথে আসো যদি, এই ধূপকাঠি ধরে দুপয়সা উপায়ের পথ দেখলে–একদিন না একদিন সেই পথেই দেখা হবে আমাদের।
পুন, পুনশ্চ! এই সব জড়ো করা জঞ্জালেরও দাম আছে ভাই। নেহাত ফ্যালনা নয়, তা আমি মানি। রাস্তায় ফেলে দিলে পড়তে পায় না, তাও আমার জানা আছে। থলেওয়ালারা তাদের থলেয় ভড়ে কুড়িয়ে নিয়ে যায় দেখতে না দেখতেই। সেইরকম এক থোলোধরা বন্ধু আছে আমার। এক বস্তিতেই পাশাপাশি বাস করি। তাকে বলব, সে একদিন এসে, তোমার বর্তমানে বা অবর্তমানে তোমার ঘর ঝেটিয়ে সবকিছু কুড়িয়ে-বাড়িয়ে নিয়ে যাবে এক সময়।
নিখরচায় তোমার ঘর পরিষ্কার হবে, তারও জঞ্জাল বেচে দুপয়সা জুটবে এখন।…
আমার নিজের ঠিক তেমনটা না হলেও আমি দেখেছি, আমার প্রতি সর্বজীবের সমদৃষ্টি। সর্বদাই। মহাজীবন বিধানচন্দ্রের থেকে সামান্যজীবী ধূপকাঠিওয়ালার সমান দরদ দেখা গেছে আমার ওপর। মনে হয়েছে যেন এইভাবেই বিধাতা আমায় বারংবার দর্শন দিয়েছেন। এবং দর্শনীও দিয়েছেন–দিয়ে গেছেন–আমাকেই।
তারই নিদর্শন, এই দশ টাকার নোটখানা, বিধানচন্দ্রের মুক্ত হস্তের বরাদ্দর চেয়েও বেশি যেন আমায় অভিভূত করে।…নোটখানাকে বুকে জড়িয়ে ঘুম লাগাই।
সকালে ঘুম ভাঙতেই লোকটার সদুপদেশের কথা মনে পড়ল। কিন্তু ঠিক মনে ধরল না। ভেবেছিলাম একবার যে, বটতলায় গিয়ে ধূপকাঠি নির্মাণ শিক্ষাটা নিয়ে আসি, কিন্তু খটকা বাধলো। ধূপকাঠির ধুমধারাক্কায়, দুষ্ট বা শিষ্ট যাই হোক, এই সাহিত্যসরস্বতী ঘাড় থেকে নামবেন আমার? মনের মধ্যে সাকিম, তাঁকে তো মা মনসার সগোত্র বলেই ধারণা হয়, তাঁর বিষও কিছু কম নয়, ছোবলে জীবনভোর জর্জর করে রাখে। ধুনোর গন্ধে যদি তিনি প্রমিত হয়ে ওঠেন আরো?
বিধানবাবু কদিন বাদে যেতে বলেছিলেন আবার। যেতেই বললেন, বোসো। তোমার জন্যে আমি ভেবেছি। দ্যাখো, এই উঞ্ছবৃত্তি করে কোনো লাভ হবে না। কাজকর্ম করতে হবে তোমাকে। লিখেটিখে কিসু হয় না।
তাঁর মুখে সেই ধূপকাঠিওয়ালার প্রতিধ্বনিই শুনতে পাই আবার।
কেন হবে না? কারো কারো বেশ হয়, আমি দেখেছি।
দেখেছো তুমি? কোথায় দেখলে শুনি?
আমার সামনেই। এই তো আপনি, একটু আগেই একজনকে এক লাইন লিখে দিয়ে পঞ্চাশ টাকা কুড়িয়ে নিলেন এক্ষুনি।
সে তো প্রেসকৃপসন লিখে হে! আমার কথায় তিনি হাসলেন-এটা কি আবার লেখা নাকি? সত্যিকার লেখা লিখলে কতো পাওয়া যায় বলো?
তা আমি জানিনে। বলতে পারব না। আমি পাঁচ শো লাইন লিখেও এক টাকা পাইনে। সত্যিকার লেখা লিখতে পারিনে বলেই বোধ হয়।
তা হতে পারে। লেখাটেখার আমিও কিছু জানিনে। বঙ্কিমবাবু অনেক টাকা কামিয়ে গেছেন তাঁর উপন্যাসগুলোর থেকে। শরৎচন্দ্রও বিস্তর টাকা পান শুনেছি। কিন্তু তাঁদের মতন লেখা কজন পারে লিখতে? এ দেশের বেশির ভাগ লেখকই তো খেতে পায় না, না খেয়ে মারা যায়, যাচ্ছেও এখন… তুমি কবি গোবিন্দদাসের নাম শুনেছ?
কেন শুনব না? পড়েছিও তো কত! বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, গোবিন্দদাস…
আহা, সে গোবিন্দদাস নয়। তাঁরা তো কবেই গত হয়েছেন। একালের কবি গোবিন্দদাস, তাঁর কথাই বলছি আমি–যিনি লিখে গেছেন-ও ভাই বঙ্গবাসী, আমি মলে তোমরা আমার চিতায় দেবে মঠ। কিন্তু আজ যে আমি খিদেয় করি ছটফট…
জানি জানি। তাঁর কতো স্বদেশী গান তত শোভাযাত্রা করে গেয়ে গেয়ে ঘুরেছি আমরা।–স্বদেশ স্বদেশ করিস কারে এ দেশ তোদের নয়/এই যমুনা গঙ্গানদী/এদেশ তোদের হোত যদি/পরের পণ্যে গোরা সৈন্যে জাহাজ কেন বয়…।
তা হবে। তবে দেশবন্ধুর মুখে শুনেছিলাম, পূর্ববঙ্গে কোথায় যেন কোন কর্ম উপলক্ষে গিয়ে সকালে উঠে দাড়ি কামাবার সময় ক্ষুর মোছর কাগজটায় গোবিন্দদাসের খবর তিনি দেখতে পান-আকস্মিক ঘটনাই। কবি অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী, অত্যন্ত দৈন্যদশায়, দেখাশোনার কেউ নেই–এইসব লেখা ছিল সেই কাগজের টুকরোটায়। দেখে দাড়ি কামিয়ে উঠেই তিনি ছুটে গেলেন কবির শয্যাপাশে, তাঁর বিধিমত চিকিৎসার, খাওয়া-থাকায় বন্দোবস্ত করে দিলেন সব। কিন্তু দেশবন্ধুর মতন মানুষ কজন হয়? দেশের কজনাই বা তার নজরে পড়ে, কজনকেই বা তিনি দেখতে পান? দেখতে পারেন?
তা বটে। আমাকেও তিনি দেখেছিলেন একসময়-যদিও আমি কবি-টবি কিছুই নই…
সে কথা যাক। তোমাকে কিছু কাজটাজ করতে হবে এখন। ঐ লেখাটের লাইনেই না হয়?… নাকি তুমি আমার মতন এক লাইন লিখে পঞ্চাশ টাকা রোজগার করতে চাও? ডাক্তার হতে চাও নাকি? তা যদি চাও তো বলল, তোমাকে আমি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করে দেব, পড়াটড়ার খরচ সব আমার। কেমন, পড়বে? হবে ডাক্তার?
আমার এক বোন…বোন না বলে বন্ধু বলা উচিত…সেও চেয়েছিল আমি ডাক্তার হই। ডাক্তারের মেয়েছিলো কিনা সে। কিন্তু তা আর হয় না স্যার, সেই এক লাইনের লাইন কবেই আমি ছেড়ে এসেছি। অন্য লাইনে চলে এসেছি এখন… আমার দীর্ঘ নিঃশ্বাস পড়ে বুঝি।–সে লাইনে যাওয়া যায় না আর। ডিরেলমেন্ট হয়ে গেছে আমার।
